IQNA

ঘরবাড়ির আগে বিদ্যালয় চায় সিরিয়ানরা

8:15 - July 04, 2025
সংবাদ: 3477648
ইকনা- দীর্ঘদিন গৃহযুদ্ধ শেষে সিরিয়ার মানুষ ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া ঘর, বাড়ি, অবকাঠামোগুলো পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেছে তারা। যেসব গ্রাম ও শহর বছরের পর বছর পরিত্যক্ত ছিল সেখানেও পদচিহ্ন পড়ছে মানুষের। তবে সিরিয়ানরা সবার আগে সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে চায়।
তারা চায় নিজের ধসে যাওয়া বাড়ির আগে ঠিক হোক এলাকার ধ্বংস হওয়া বিদ্যালয়টি। ২০১১ সালে বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর থেকে সিরিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। হাজার হাজার বিদ্যালয় ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র অথবা সামরিক ঘাঁটি।
ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বহু শিশুর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে। সম্প্রতি সিরিয়ার নাগরিকরা স্থানীয় উদ্যোগে বিদ্যালয়গগুলো পুনর্নির্মাণ করছে। যেন শিশুরা এখনই তাদের লেখাপড়া শুরু করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনে সিরিয়ার নাগরিকরা সর্বাত্মক সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে।
নগদ অর্থের পাশাপাশি তারা পুরনো বই, ইউনিফর্ম, দরজা, পর্দা পর্যন্ত দান করছে।
ঘরের আগে বিদ্যালয় 
মারাত আল-নোমানের পূর্বে অবস্থিত তালমেনেস গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দারা ছয় বছরের নির্বাসন শেষে ফিরে এসেছে। তারা দেখেছে গ্রামের বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে আছেন পাঁচ সন্তানের মা রোয়া কাসেম।
তিনি বলেন, ‘আমরা আগে তাঁবুতে থাকতাম, এখন ফিরে এসে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাস করছি, কিন্তু আমাদের শিশুদের শিক্ষার প্রয়োজন, এটা ঘরবাড়ি পুনর্নিমাণের আগেই করতে হবে।’ এটা শুধু রোয়া কাসেমের বক্তব্য নয়, বরং তালমেনেস ও আশপাশের অন্যান্য গ্রামের অধিবাসীরাও একমত যে যদিও তাদের ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও পরিষেবাগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তবু তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা হচ্ছে শিক্ষা। তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ যুদ্ধের বলি হতে দেবে না। ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রোয়া কাসেম বলেন, ‘আমরা আমাদের হাতেই আমাদের বিদ্যালয় পুনর্নিমাণ করতে প্রস্তুত, যাতে আমাদের সন্তানরা শিক্ষা পেতে পারে। আমরা চাই না, তারা আমাদের চেয়েও বেশি কিছু হারাক।’
শিক্ষকদের আত্মত্যাগ
আলেপ্পো ও হামার প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থানীয়রা কাদামাটি ও পাথর দিয়ে বিদ্যালয় গড়ছে। বিদ্যুৎ, সিমেন্ট বা পানির অভাব তাদের থামাতে পারেনি। অনেক শিক্ষক বিনা বেতনে ক্লাস নিচ্ছেন, অনেক সময় ব্ল্যাকবোর্ডের পরিবর্তে বড় কার্ডবোর্ডে পাঠ লিখে পড়াচ্ছেন। অনেক শিক্ষক নির্মাণকাজেও অংশ নিচ্ছেন। মোরেক শহরের শিক্ষক খালেদ শেহাদা বলেন, ‘আমাদের কাছে বই নেই, বেতন নেই, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের ছেড়ে যেতে পারি না।’ তাঁর মতে, এই শিশুদের মুখে উচ্চারিত অক্ষরগুলোই একদিন গড়ে তুলবে নতুন সমাজ। তবে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জও কম নয়; পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, নেই নিরাপদ ভবন, জল কিংবা বিদ্যুৎ। তবু শিশুদের কণ্ঠে আবার ঘুরে আসছে জীবন, ফিরে আসছে বিদ্যালয়ের চেনা শব্দ।
বিদ্যালয় শুধু ভবন নয়, একটি জাতির আশা।
আলেপ্পোর পাশের গ্রাম আঞ্জারায় দেখা যাচ্ছে যেখানে একসময় শুধু ধ্বংসাবশেষ ছিল, আজ সেখানে আবার স্কুলের ঘণ্টা বেজে উঠছে। যদিও বিদ্যালয়ে এখনো দরজা-জানালা, স্যানিটেশন সুবিধা নেই, তবু প্রতিদিন সকালবেলা শিশুরা হাজির হচ্ছে শিক্ষার আশায়।
গ্রামের বৃদ্ধ মাজেন সাত্তুফ বলেন, ‘একটি বাড়ি শরীরকে আশ্রয় দেয়, কিন্তু বিদ্যালয় মনকে আশ্রয় দেয়।’ তাঁর মতে, শিক্ষা বিলাসিতা নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এটি হচ্ছে টিকে থাকার একমাত্র পথ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উচিত সিরিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনে অগ্রাধিকার দেওয়া। নতুন ভবন, শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহই হতে হবে মানবিক সাহায্যের মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, সিরিয়ায় প্রায় ২৪ লাখ শিশু এখনো স্কুলের বাইরে এবং সাত হাজারের বেশি স্কুল আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবু এই সংকটের মধ্যেই মানুষ নিজেরাই বিদ্যালয় গড়ছে, পাঠ নিচ্ছে, স্বপ্ন দেখছে। তারা জানে, অজ্ঞতা আমাদের শত্রু আর শিক্ষা, এটাই জীবন।
সিরিয়ার যুদ্ধ কেবল ভবন ও রাস্তা ধ্বংস করেনি, এটি একটি প্রজন্মের ভবিষ্যেক থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ধ্বংসের মধ্যেই আজ যারা আশার বীজ বুনছে, তারা জানে, শিক্ষা না থাকলে ঘরবাড়ি থাকার কোনো মূল্য নেই। শিশুরা যদি না শেখে, তবে এই ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্তি হবে।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে
 
captcha