ইকনার প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তথ্যকেন্দ্রের বরাতে বলা হয়েছে, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বাঞ্চলীয় শহর স্রেব্রেনিৎসায় মুসলমানদের গণহত্যা ছিল হলোকাস্ট-পরবর্তী ইউরোপের সবচেয়ে বড় গণহত্যা এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর শুরু হওয়া বলকান যুদ্ধের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।
১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৮১৯ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী স্রেব্রেনিৎসাকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করা হলেও পরবর্তীতে বসনিয়ান সার্ব বাহিনী শহরটি দখল করে নেয়।
গণহত্যার সময় বহু মানুষ নিকটবর্তী পোটোচারিতে অবস্থিত জাতিসংঘ কমপাউন্ডে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, হত্যা করা হয় এবং গণকবরে দাফন করা হয়।
স্রেব্রেনিৎসার পতনের সময়, ১১ জুলাই ১৯৯৫ সালে, হাসান হাসনোভিচ ছিলেন মাত্র ১৯ বছর বয়সী। তিনি তাঁর বাবা ও যমজ ভাই হুসেইনের সঙ্গে বনপথে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা পুরুষ ও কিশোরদের একটি দলে যোগ দেন।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দিনের পর দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, আতঙ্কের মধ্যে, হামলা ও গোলাবর্ষণ এড়িয়ে তিনি একাই পথ চলতে থাকেন।
বর্তমানে স্রেব্রেনিৎসা স্মারক কেন্দ্রের মৌখিক ইতিহাস কর্মসূচির প্রধান হিসেবে কর্মরত হাসনোভিচ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন:
“শুধু ভয়ই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।”
তিনি আরও বলেন: “বহু বছর পরে গণকবর থেকে উদ্ধার করা আমার বাবা ও যমজ ভাইয়ের মরদেহ আমি নিজ হাতে দাফন করেছি। সেই মুহূর্তের জন্য কোনো কিছুই আমাকে প্রস্তুত করতে পারেনি।”
এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘ ১১ জুলাইকে ‘১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিফলনের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালন করছে।
জাতিসংঘের গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা চালোকা বেজানি বলেন, “স্রেব্রেনিৎসার এই গণহত্যা আন্তর্জাতিক সমাজ, জাতিসংঘ এবং সমসাময়িক বিশ্বের ইতিহাসের সম্মিলিত বিবেকের ওপর চিরস্থায়ী এক ভার হয়ে থাকবে।”
তিনি নিহতদের স্মরণে এবং গণহত্যার পর জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও নির্যাতিত নারী ও কন্যাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের দুটি আন্তর্জাতিক আদালত—আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং সাবেক যুগোস্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICTY)—রায় দিয়েছে যে স্রেব্রেনিৎসায় সংঘটিত অপরাধগুলো গণহত্যার শামিল।
জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে পাঠ করা এক বার্তায় বলা হয়, “আমরা দেখছি ঘৃণামূলক বক্তব্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বৈষম্য, চরমপন্থা ও বিভক্তিকে উসকে দিচ্ছে। এমনকি যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদেরও অনেক ক্ষেত্রে মহিমান্বিত করা হচ্ছে।”
মহাসচিব সতর্ক করে বলেন, এসব সতর্ক সংকেতকে উপেক্ষা করা যাবে না।
তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই সময়মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। গণহত্যা প্রতিরোধ করা আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব এবং নিজেদের রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়।”