মিশরের ‘আল-শিন’ গ্রামে কাদামাটির ঘরের দেয়ালগুলো শুধু কুরআনের আয়াত তিলাওয়াতের সাক্ষী নয়—এখানে দাদিমারা এক অনন্য ঐতিহ্য ভেঙেছেন।
মিশরের ‘আল-শিন’ গ্রামে কাদামাটির ঘরের দেয়ালগুলো শুধু কুরআনের আয়াত তিলাওয়াতের সাক্ষী নয়—এখানে দাদিমারা এক অনন্য ঐতিহ্য ভেঙেছেন। পড়াশোনার সুযোগ না পেলেও অন্তর ভরা আগ্রহ নিয়ে তাঁরা এমন এক কুরআনী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, যেখানে ওহীর আয়াতগুলো বুক থেকে বুকে স্থানান্তরিত হয়। এই গ্রামে শিক্ষার মাপকাঠি অক্ষর চেনা নয়, বরং আল্লাহর কালামের সঙ্গে কতটা গভীর সম্পর্ক—সেটাই।
ইকনা সংস্থার প্রতিবেদনে আখবার আল-ইয়োমের বরাতে জানানো হয়েছে, অনেকে দীর্ঘ সময় অনর্থক আলাপচারিতায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটালেও মিশরের গারবিয়া প্রদেশের কুতুর উপজেলার ‘আল-শিন’ গ্রামের কয়েক ডজন বয়োবৃদ্ধা নারী বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন পথ। যে পথের শুরু ও শেষ কুরআনের আয়াত দিয়ে। নিরক্ষরতা, বার্ধক্য কিংবা জীবনের কঠিন বাস্তবতা—কিছুই এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আশি বছরেরও বেশি বয়সী নারীরা পর্যন্ত একই লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছেন—আল্লাহর কিতাব হিফজ করা এবং প্রমাণ করা যে সত্সঙ্কল্প যেকোনো বাধার চেয়ে শক্তিশালী।
এই দাদিমাদের অধিকাংশই কোনোদিন আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি, কেউ কেউ সম্পূর্ণ নিরক্ষর। তবু তাঁরা কুরআন কারীমের সঙ্গে এক কঠিন যাত্রা শুরু করেছেন। ক্যাসেট টেপ, রেডিও, টেলিভিশন আর এখন মোবাইল ফোন ও ‘কথা বলা কলম’—এই সহজ উপকরণগুলোর ওপর ভর করে তাঁরা কুরআন হিফজকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তুলেছেন।
অবসর সময় থেকে শুরু হওয়া বরকতময় মিশন
গল্পের শুরু ‘হাজিয়া উম্মে রাশা’ দিয়ে। তিনি নিজের ঘরের শান্ত পরিবেশে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বারবার রেকর্ড করা তিলাওয়াত শোনা এবং আয়াতগুলো বারবার আবৃত্তি করার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর বাণীকে শুধু স্মৃতিতে নয়, অন্তরে গেঁথে নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি একা হিফজ করেই ক্ষান্ত হননি—গ্রামের অন্য নারীদেরও এই বরকতময় পথে ডেকে নেন।
প্রথমে তাঁর ঘরেই কয়েকজন নারী জমায়েত হতেন। সংখ্যা বাড়তে থাকায় জায়গার অভাবে তিনি বাড়ির পাশের জমির একটা অংশ ছোট একটি কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ করেন। সেখানে প্রতিদিন নারীরা জড়ো হয়ে হিফজ ও পুনরাবৃত্তি করতেন। এই কেন্দ্র দ্রুতই সব বয়সের নারীদের দৈনিক মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে। গৃহকর্ম শেষে, সন্তান-নাতিনাতির দেখাশোনা করে তাঁরা আন্তরিক আগ্রহ নিয়ে নতুন আয়াত হিফজ করতে বা পুরোনোগুলো পুনরাবৃত্তি করতে এখানে আসতেন।
পরবর্তীতে গ্রামের তরুণী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতা নারীরাও এই উদ্যোগে যোগ দেন। তাঁরা বয়োবৃদ্ধাদের তিলাওয়াত শোনেন, উচ্চারণ সংশোধন করেন এবং হিফজ মজবুত করতে সাহায্য করেন। এক অসাধারণ দৃশ্য তৈরি হয়—যেখানে পূর্ববর্তী প্রজন্মের অভিজ্ঞতা আর তরুণদের উদ্দীপনা মিলেমিশে যায় এবং প্রত্যেকে অন্য প্রজন্মের সহায়ক হয়ে ওঠেন।
নিরক্ষরতাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবু নারীরা হার মানেননি। তাঁরা নানা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। কেউ কেউ টেলিভিশন বা রেডিও থেকে আয়াতগুলো কয়েক ডজনবার শোনেন, কেউ মোবাইলে সংরক্ষিত অডিও ফাইলের ওপর নির্ভর করেন। গ্রামের কিছু বাসিন্দা ‘কথা বলা কলম’ সরবরাহ করে সাহায্য করেন—যার মাধ্যমে আয়াত শোনা ও পুনরাবৃত্তি করে পুরোপুরি আয়ত্ত করা যায়।
এই শুভ্রকেশী কুরআন শিক্ষার্থীদের কাছে কুরআন আর শুধু তিলাওয়াতের পৃষ্ঠা নয়—ঘর, ক্ষেত এবং পথচলার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু হিফজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; অনেক পরিবারের জীবনধারাই বদলে গেছে। এই হিফজের হালকায় নারীরা এমন এক পরিসর পেয়েছেন, যা তাঁদের উত্তম পথে একত্রিত করে, অবসর সময়কে সৃজনশীল করে তোলে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার বন্ধন মজবুত করে।
দৈনিক এই জমায়েতগুলো পুনরাবৃত্তি, উৎসাহদান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয়ে ওঠে। যে সময়গুলো আগে অর্থহীন কথাবার্তা বা বিবাদের কারণ হতো, এখন সেগুলো পরিণত হয়েছে প্রশান্তির আশ্রয়ে।
এই সফল মডেল প্রমাণ করে, কুরআন হিফজ শুধু যুবক বা শিক্ষিতদের জন্য নয়। যে কেউ নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর কিতাবকে সঙ্গী করতে চায়—বয়স বা শিক্ষাগত পটভূমি যাই হোক—তার জন্য পথ খোলা।

পথ চলার উৎসাহ
এই পথ অসাধারণ সাফল্য এনেছে। অনেকে কুরআনের উল্লেখযোগ্য অংশ হিফজ করেছেন, কেউ কেউ পুরো কুরআনই মুখস্থ করেছেন—যদিও তাঁদের কেউ কেউ জীবনে কখনো কলমও ধরেননি।
গ্রামবাসীরা এই অর্জনকে উপেক্ষা করেননি। তাঁরা একযোগে এই কুরআনী আন্দোলনকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যবসায়ী, বণিক ও দানশীল ব্যক্তিরা এগিয়ে আসেন। নিয়মিত হিফজ প্রতিযোগিতা ও নগদ পুরস্কার দেওয়া হয় এবং যারা পুরো কুরআন হিফজ করেছেন বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছেন, তাঁদের সম্মানে বার্ষিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
এই উৎসবগুলো এখন ‘আল-শিন’ গ্রামকে এক বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হলঘর ও মসজিদ ভরে যায় মানুষে, প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার ধ্বনি ঘিরে ধরে সেই নারীদের, যাঁরা অধ্যবসায়ের পাঠ শিখিয়েছেন। যাঁরা প্রমাণ করেছেন—প্রকৃত অর্জনের মাপকাঠি বয়স নয়, ইচ্ছার শক্তি।
কিছু গ্রামবাসী উদ্যোগ নিয়েছেন হিফজে অসাধারণ সাফল্য অর্জনকারীদের জন্য দলগত ওমরাহর ব্যবস্থা করতে—যা তাঁদের দীর্ঘ কুরআনী সফরের যোগ্য পুরস্কার এবং পথ চলার নতুন উৎসাহ।
এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু অংশগ্রহণকারী দাদিমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবার ও নাতিনাতিরাও এর আওতায় এসেছে। তাঁরা এই নারীদের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের জীবন্ত আদর্শ দেখতে পান। শিশুরা হিফজের হালকায় যোগ দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং অনেক তরুণ-তরুণী মা ও দাদিমাদের অসম্ভবকে সম্ভব করার দৃষ্টান্ত দেখে নিজেরাও কুরআন হিফজের ক্লাসে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হন।

অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, মানব উন্নয়নের জন্য সবসময় বিশাল সম্পদের প্রয়োজন হয় না। বরং প্রয়োজন একটা আন্তরিক ধারণা, যা নিজের সমর্থক ও বিশ্বাসী খুঁজে নেয়। যে উদ্যোগ একটা সাধারণ ঘর থেকে শুরু হয়েছিল, গ্রামবাসীদের সমর্থন ও উৎসাহে তা সমাজের জন্য এক সফল মডেলে পরিণত হয়েছে। ফলে ‘আল-শিন’ মিশরের নারী ও বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে কুরআন হিফজের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
আল-শিনের দাদিমাদের সমাজভিত্তিক মিশন
প্রতিদিন সূর্যাস্তের আগে ‘জাওয়ায়া’ (কুরআনী শিক্ষাকেন্দ্র) ভরে ওঠে নারীদের শ্রদ্ধা ও বিনম্র তিলাওয়াতের ধ্বনিতে। প্রত্যেকের হাতে একখানা কুরআন, আর চারপাশে পুনরাবৃত্তি ও শিক্ষার আওয়াজ—এই দৃশ্য আল্লাহর কালামের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি।

হয়তো তাঁদের কেউ কেউ লিখিত পাঠ পড়তে পারেন না, তবু তাঁরা সেগুলো স্মৃতিতে ধারণ করেছেন। যেন তাঁদের হৃদয়ই হয়ে উঠেছে এমন পৃষ্ঠা, যা চোখ পড়তে পারেনি, তা অন্তরে সংরক্ষিত হয়েছে। এই গল্প সাক্ষ্য দেয়—জ্ঞান স্কুলের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়, বয়স শেখার পথে বাধা নয় এবং যখন দৃঢ় সঙ্কল্প থাকে, তখন নতুন করে শুরু করা যায়।
‘আল-শিন’ গ্রামে কুরআন হিফজের হালকাগুলো শুধু মুখস্থ করার আসর নয়—হয়ে উঠেছে এক সমাজভিত্তিক মিশন। যার মূলনীতি হলো—সবচেয়ে উত্তম সময় বিনিয়োগ সেটাই, যা মানুষকে তার প্রভুর কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং অবসর সময়কে এমন ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, যা বছরের পর বছর স্থায়ী প্রভাব ফেলে।
এভাবেই ‘আল-শিনের নারীরা’ কুরআন কারীমের সঙ্গে তাঁদের সফর অব্যাহত রেখেছেন এবং প্রতিদিন প্রমাণ করছেন—যখন হৃদয় আল্লাহর কালামের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন কঠিন পথ সহজ হয়ে যায়, বয়স ও নিরক্ষরতার বাধা সরে যায়। দৃঢ় সঙ্কল্পই হয়ে ওঠে সাফল্যের একমাত্র পথ এবং গ্রামটি পরিণত হয় আশার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে—তাঁদের জন্য, যাঁরা একসময় ভেবেছিলেন শেখা, হিফজ করা বা নতুন স্বপ্ন শুরু করার সময় আর নেই। 4368556#