কোরআন বিষয়ক বার্তা সংস্থা ইকনা’র রিপোর্ট: সুরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন: "হে রসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌঁছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।"
ওই সমাবেশে এক লাখ বিশ হাজারেরও বেশি সাহাবি ও হজ্বযাত্রী উপস্থিত ছিলেন।
অবশ্য এই ঘোষণায় উল্লেখিত একটি শব্দের অর্থ নিয়ে মুসলিম চিন্তাবিদ ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
'জুহফা' নামক এলাকার কাছে 'গাদিরে খুম' নামক জলাশয়ের পাশে বিশ্বনবী (সা.) ঘোষণা করেছিলেন যে " মান কুনতু মাওলা ফাহাজা আলিয়ুন মাওলা" অর্থাত আমি যাদের মাওলা আলীও তাদের মাওলা। মুসলমানদের একটি ধারা মনে করে এখানে মাওলা শব্দের অর্থ নেতা, আর অন্য একটি ধারা মনে করে এখানে 'মাওলা' শব্দটির অর্থ বন্ধু।
ইমাম বোখারীসহ ৩৬০ জন সুন্নি মনীষী এ সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসটির সনদ ১১০ সাহাবি কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে এবং ২৬ জন মুসলিম মনীষী এর সনদ ও পন্থা সম্পর্কে আলাদা বই রচনা করেছেন।
বিশ্বনবী (সা.) গাদিরে খুমে তিন দিন অবস্থান করেছিলেন। এই তিন দিন ধরে মুসলমানরা হযরত আলী (আ.)-কে আমিরুল মুমিনিন হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন বলে বর্ণনায় এসেছে।
বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবেত্তা আবু জাফার তাবারি এই হাদীসের সনদ ও পন্থাকে দুই খণ্ডের এক গ্রন্থে সংকলিত করেছেন।
আর সে দিনই হাসসান বিন সাবিত গাদিরের ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন-
يناديهم يوم الغدير نبيهم بخم واسمع بالرسول مناديا
فقال فمن مولاكم و نبيكم؟ فقالوا و لـم يبدوا أهناك التعاميا
إلهك مولانا و أنت نبينا و لم تلق من فی الولاية عاصيا
فقال له: قم يا علی فإننی رضيتك من بعدی إماما و هاديا
فمن كنت مولاه فهذا ولیّه فكونوا له اتباع صدق مواليا
هناك دعا: اللهم وال وليه و كن للذی عادی عليا معاديا
অনুবাদ:
১। গাদীরের দিন তাদের (মুসলমানদের) নবী তাদেরকে আহ্বান জানালেন উচ্চস্বরে, (কি বিস্ময়!) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল (সা.) দেখ কিভাবে আহ্বান করছেন { কিংবা শোন এখন, যা বললেন রাসূল (সা.) }
২। অতঃপর তিনি শুধালেন জনগণকে: কে তোমাদের প্রভু (মাওলা তথা অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক) ও নবী? সেখানকার সবাই বললো নির্দ্বিধায়:
৩।আপনার আল্লাহ আমাদের অভিভাবক এবং আপনি আমাদের রাসূল। আজ আপনি আমাদের মাঝে কোনো অবাধ্যকেই খুঁজে পাবেন না।
৪।অতঃপর বললেন: হে আলী ওঠ! নিশ্চয়ই আমি এতে সন্তুষ্ট যে আমার পর তুমিই ইমাম (নেতা) ও হেদায়াতকারী।
৫।অতএব, আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা। তোমরা তাঁর প্রকৃত বন্ধু হও বা তাঁকে ভালবাস ও তাঁর অনুসারী হও।
৬।এরপর তিনি সেখানে দোয়া করলেন: হে আল্লাহ্! আলীর বন্ধুকে তোমার বন্ধু মনে কর এবং যে আলীর সাথে শত্রুতা করবে তুমিও তার সাথে শত্রুতা কর।
গাদিরে খুমের ওই ঘটনার ২৫ বছর পর তৃতীয় খলিফা নিহত হলে মুসলমানদের ব্যাপক অনুরোধ ও পীড়াপীড়ির মুখে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) এখন থেকে ১৩৯৮ বছর আগে ঠিক আজকের দিনটিতে (১৮ ই জ্বিলহজ্ব) একান্ত অনীহা ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলমানদের রাজনৈতিক নেতা বা খলিফা হন। সামাজিক ন্যায়বিচার-ভিত্তিক আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্রের খলিফা হিসেবে প্রায় ৫ বছর শাসন করার পর এক ধর্মান্ধ খারেজির সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়ে (একুশে রমজান) তিনি শহীদ হন। হামলার সময় তিনি কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করছিলেন।
রাসূল (সা.) বিভিন্ন সময়ে বলেছেন:
" আলী আমার থেকে এবং আমি তাঁর থেকে এবং আলীই আমার পর সমস্ত মুমিনদের ওলি তথা অভিভাববক ও নেতা" (তিরমিজি, ৫ম খণ্ড, পৃ-১১০)
রাসূল (সা.) আরো বলে গেছেন, আলী সব সময়ই হকের পথে থাকবে। “আলী (আ.)-কে মহব্বত করা ঈমান, আর আলী(আ.)’র সঙ্গে শত্রুতা করা মুনাফেকী” (মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃ-৪৮)। “ আমি জ্ঞানের শহর, আলী তার দরজা”(সহি তিরমিজি, ৫ম খণ্ড, পৃ;২০১)। এমনকি রাসূল (সা.) এ দোয়াও করেছেন যে, “হে আল্লাহ সত্যকে আলীর পক্ষে ঘুরিয়ে দিও।” রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, কেবল মুনাফিকই আলীর সঙ্গে শত্রুতা করবে।
“যে আলীকে দোষারোপ করল, সে আমাকে দোষারোপ করল, আর যে আমাকে দোষারোপ করল সে খোদাকে দোষারোপ করল। আল্লাহ তাকে মুখ নীচু করে দোজখে নিক্ষেপ করবেন।”(সহি বুখারী-দ্বিতীয় খণ্ড, সহি মুসলিম- দ্বিতীয় খণ্ড, সহি তিরমিজি, ৫ম খণ্ড)।
“আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা। হে খোদা যে আলীর সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখে তুমিও তার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখ, যে আলীর সাথে শত্রুতা রাখে তুমিও তার সাথে শত্রুতা রাখ।” (সহি মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ-৩৬২, মুসনাদে ইমাম হাম্বল, ৪র্থ খণ্ড, পৃ-২৮১)
সাহাবিদের অনেকেই বলতেন, আমরা আলীর সঙ্গে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা দেখে কে মুনাফিক ও কে মুমিন তা নির্ধারণ করতাম।
রাসূল (সা.) আরো বলেছেন:
“ এই আলী আমার ভাই, আমার ওয়াসি এবং আমার পর আমার প্রতিনিধি হবে। তাই তাঁর আদেশ শোন, তাঁর আদেশ মত কাজ কর।” (তাফসিরে তাবারি, ১৯ খণ্ড, পৃ-১২১, ‘লাইফ অফ মুহাম্মাদ’-ড. মো. হোসাইন হায়কাল, প্রথম সংস্করণ১৩৫৪ হি,প্রথম খণ্ড, পৃ-১০৪)
হযরত আহমদ বিন হাম্বল বলেছেন, “যত ফজিলতের বর্ণনা আলীর বেলায় এসেছে অন্য কোনো সাহাবির বেলায় তা আসেনি। আলী (আ.)’র অসংখ্য শত্রু ছিল। শত্রুরা অনেক অনুসন্ধান করেছে আলী (আ.)’র দোষ-ত্রুটি বের করার, কিন্তু পারেনি।”
হযরত কাজী ইসমাইল নাসায়ি আবু আল নিশাবুরি বলেন, “যত সুন্দর ও মজবুত সনদের মাধ্যমে আলী (আ.)’র ফজিলতগুলো বর্ণিত হয়েছে-অন্য সাহাবিদের বেলায় তেমনি আসেনি।” সুত্র:রেডিও তেহরান