কোরআন বিষয়ক বার্তা সংস্থা ইকনা’র রিপোর্ট: কিন্তু, তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের ধারায় আজকাল সংবাদপত্রে পাঠকদের যে তাৎক্ষণিক ভাব প্রকাশের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তাতে বরং উল্টোটাই দেখা যাচ্ছে। অধিকাংশের মন্তব্যেই একধরনের সংশয়। তাঁদের বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে সমরাস্ত্র ক্রয়ে বাংলাদেশের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের কোনো প্রয়োজন নেই এবং তাঁদের সন্দেহ এই লেনদেনের মাধ্যমে কারও কারও কমিশন-বাণিজ্য হবে।
সামরিক খাতের ব্যয় সম্পর্কে বাংলাদেশে এ ধরনের সন্দেহ-সংশয় নতুন কিছু নয়। অবশ্য, এসব সন্দেহ দূর করার কোনো চেষ্টাও কখনো দেখা যায় না। তা ছাড়া, দেখা যায় যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আওয়ামী লীগ বা বিএনপি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার মতো দ্বিতীয় কাউকে প্রধানমন্ত্রীরা খুঁজে পান না অথবা বিষয়টিকে নিজের হাতে রাখাতেই তাঁদের স্বস্তি। সুতরাং, সময়ে-অসময়ে প্রতিরক্ষা বিষয়ে সরকারের পক্ষে ব্যাখ্যা দেওয়ার কেউ থাকেন না। ফলে, প্রতিরক্ষা খাতের সবকিছুই একধরনের অস্পষ্টতা বা গোপনীয়তার দেয়াল দিয়ে আড়াল করা থাকে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে গোপনীয়তা ক্ষেত্রবিশেষে যৌক্তিক হলেও সেই অজুহাতে প্রতিরক্ষা খাতের সবকিছু ঢেকে রাখাটা গ্রহণীয় হতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাশিয়ার কাছ থেকে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা লাভের বিষয়টিতে যাঁরা নানা রকম তির্যক মন্তব্য করেছেন, ধরে নেওয়া যায় তাঁরা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অংশ—যাঁদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। যাঁদের এ ধরনের সুযোগ নেই, অথবা যাঁরা এই সামরিক সহযোগিতা বা অস্ত্রশস্ত্র কেনাবেচার বিষয়ে তেমন একটা খোঁজখবর রাখেন না, তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী হতো, সেটা অনুমান করা দুষ্কর। তবে যাঁরা এই রুশ অস্ত্রসম্ভার ক্রয়ের বিষয়ে সন্দিহান, তাঁদের ভাবনার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি দেশের মধ্যে যেসব ক্ষেত্রে মিল দেখা যাচ্ছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। এ ক্ষেত্রে, অবশ্য এ কথাটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালে দুই পরাশক্তির রেষারেষির বিশ্বে বাংলাদেশের মিত্র ছিল যে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন, সেটির আমূল রূপান্তর ঘটেছে। বহুধাবিভক্তির পর বর্তমান রাশিয়া এখন আর সেই পরাশক্তিও নয়, আর কমিউনিস্ট তো নয়ই।
প্রথমেই দেখা যাক দুর্নীতির ক্ষেত্রে এই দুই দেশের মিলটা। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তৈরি ২০১২ সালের দুর্নীতির বৈশ্বিক সূচকে রাশিয়ার স্কোর ২৮ আর বাংলাদেশের ২৬। ট্রান্সপারেন্সির সূচক অনুযায়ী দুর্নীতির দৌড়ে এই দুই দেশের সহাবস্থান বেশ কয়েক বছর ধরেই বহাল আছে। পরের মিলটি ক্ষমতাধর ও ধনিক গোষ্ঠীর অবৈধ উপার্জন বিদেশে পাচারের রেকর্ডে। উভয় দেশ থেকেই বিদেশে পাচার হওয়া কালোটাকার বার্ষিক হার এসব দেশের অর্থনীতির অন্তত এক-দশমাংশের কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রক্ষণশীল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের সূচক অনুযায়ী নাগরিক স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার বিষয়গুলোতেও এই দুই দেশের স্কোর একই রকম কাছাকাছি। তবে ফ্রিডম হাউসের মূল্যায়ন বা শ্রেণীকরণ বিবেচনায় না নিলেও শুধু কিছু খবর পাশাপাশি সংকলন করলে এই সাদৃশ্যগুলো সহজেই চোখে পড়বে। উভয় দেশেই সরকার ও শাসক দলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত রূপও প্রায় একই রকম, যদিও সরকারপদ্ধতি ভিন্ন।
বিবিসির সাবেক মস্কো সংবাদদাতা অ্যাঙ্গাস রক্সবরা, যিনি পরে রুশ প্রেসিডেন্টের গণসংযোগ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁর বর্ণনায় রাশিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো দুর্নীতি। তিনি বিবিসিকে বলছেন, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না এবং সরকারি হিসাব অনুযায়ী আমলাদের গড় ঘুষের পরিমাণ বছরে ১০ হাজার ডলারেরও বেশি। ইনস্টিটিউট অব মডার্ন রাশিয়ার এক প্রকাশনায় তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, প্রেসিডেন্টের প্রটোকল দপ্তরের প্রধান তাঁর বেন্টলি কারের জন্য যা ব্যয় করেন, তা তাঁর মোট বেতনের চেয়ে এক লাখ ৪৫ হাজার ডলার বেশি। বড় বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন গাজপ্রম ও রেলওয়ের ঠিকাদারিতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বন্ধু এবং জুডো খেলার সঙ্গী হিসেবে পরিচিত দুই ব্যবসায়ী দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলারের কাজ পেয়েছেন বলে জানিয়েছে ফোর্বস ম্যাগাজিন। ইংলিশ ফুটবল ক্লাব চেলসির মালিক আব্রামোভিচ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা বাগিয়েছেন।
অন্যদিকে যেসব ব্যবসায়ী তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, তাঁদের ঠাঁই হয়েছে হয় কারাগারে, নয়তো ইউরোপের অন্য কোনো দেশে। আল-জাজিরা টেলিভিশনের এক খবরে জানা যায়, ২০১২ সালের মার্চে ভালেরি মারোজভ নামের একজন নির্মাণ ব্যবসায়ী ব্রিটেনে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন, কেননা ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় সোচির শীতকালীন অলিম্পিক প্রকল্পের কাজ পাওয়ার জন্য এক কোটি ডলার ঘুষ দেওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে সমঝোতা ব্যর্থ হয়। ব্লুমবার্গের এক খবরে জানা যায়, পার্লামেন্ট সদস্য গেন্নাদি গুদকভ এমপি হওয়ার পরও তাঁর কোম্পানির ব্যবসা চালু থাকায় তাঁর সদস্যপদ বাতিল করা হয়। প্রেসিডেন্ট পুতিনের মতোই কেজিবির সাবেক এই কর্নেল রাজনীতিতে যোগ দেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টিতে। কিন্তু, পরে ওই দল ত্যাগ করে বিরোধী দল, ফেয়ার রাশিয়া পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুদকভের অভিযোগ, তিনি তাঁর কোম্পানির মালিকানা তাঁর স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করার পরও তাঁকে এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অথচ, উপপ্রধানমন্ত্রী ইগর শুভালভ ও ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির আরও অন্তত পাঁচজন এমপি তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্য একই ধরনের ব্যবস্থায় চালু রাখার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ট্রান্সপারেন্সির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে আটকে থাকার কারণ যে কথিত দুর্নীতির অভিযোগগুলো, সেগুলোর পুনরুল্লেখ না করলেও পাঠক নিশ্চয় বৈশিষ্ট্যগত সামঞ্জস্যগুলো দেখতে পাচ্ছেন। অঙ্কের হিসাবে বাংলাদেশের সংখ্যাগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও অর্থনীতির আকার বিবেচনায় এগুলোর ওজন কম নয়, তা সে রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পই হোক, কিংবা হল-মার্ক অথবা শেয়ারবাজার।
অন্য আরেকটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালের প্রথম চার মাসে বিদেশে পাচার হয়েছে চার হাজার ২০০ কোটি ডলার। ইনস্টিটিউট অব মডার্ন রাশিয়ার হিসাবে প্রেসিডেন্ট পুতিন যে চার বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সেই চার বছরে রাশিয়া থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৩৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, বছরে গড়ে আট হাজার কোটি ডলারের বেশি। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ কত? গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১০—এই ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলার, অর্থাৎ গড়ে বার্ষিক ১২০ কোটি ডলারের মতো। ২০০৬-০৭ সালে তা ছিল ২০০ কোটি ডলার এবং ২০১০ সালে তা গড় হারের চেয়ে বেশি ছিল বলে সংস্থাটি জানায়। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় বলা চলে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় তাল মিলিয়েই চলেছে। কেননা, রুশ অর্থনীতি বাংলাদেশের অন্তত ১৫ গুণ বড়।
নাগরিক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দিক দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে খুব কম দেশেরই তুলনা চলে। নাগরিক অধিকারবিষয়ক প্রায় সব বৈশ্বিক সংগঠনের বিচারেই রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ১০০-এর মধ্যে ১০-এরও নিচে। সুতরাং, সে দেশে কোনো সামরিক লেনদেন বা বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের খুঁটিনাটি তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নে কোনো বিতর্কে না গিয়েও তার জন্য সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র ও সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য রাশিয়াকে বেছে নেওয়ার পেছনে সে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা কতটা কাজ করেছে, সে প্রশ্ন নিশ্চয়ই অবান্তর হবে না। এর বাইরে কূটনৈতিক আরেকটি বিষয়ও এখানে লক্ষণীয়। জাতিসংঘের তদারকিতে এবং পাশ্চাত্যের শক্তিগুলোর সহায়তায় ইউরোপের কেন্দ্রে যে নতুন মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, সেই কসোভোকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের অনীহা ও কালক্ষেপণের সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি জড়িত কি না, তা স্পষ্ট নয়। তা না হলে গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর উপর্যুপরি অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো কসোভোকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কসোভোর একটি আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার বিষয়টিকে মস্কো তীব্রভাবে বিরোধিতা করে এসেছে।
প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি।