IQNA

টেলিস্কোপ আবিষ্কারে আল মাসুদির অবদান

1:25 - January 05, 2023
সংবাদ: 3473116
তেহরান (ইকনা): আজ থেকে ৪০০ বছর আগে ডাচ বিজ্ঞানী হ্যানস লিপারশে টেলিস্কোপ আবিষ্কার করেন। পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানে টেলিস্কোপ ব্যবহার করে বিপ্লব সাধন করেন গ্যালিলিও। আধুনিককালের জ্যোতির্বিজ্ঞান তো সম্পূর্ণই টেলিস্কোপের কারিশমা। সৌরজগত্ তো বটেই, নিজেদের গ্যালাক্সি ছাড়িয়ে এখন মহাবিশ্বের দূরদূরান্তের গ্যালাক্সির দিকে নজর রাখতে পারছে পৃথিবীর মানুষ।

এই টেলিস্কোপ নিয়ে তাই আমাদের কৌতূহলের কমতি নেই। কিছুদিন আগে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চমকপ্রদ তথ্যগুলো দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যা টেলিস্কোপের প্রতি মানুষের কৌতূহল আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

অনেকের দাবি, টেলিস্কোপের ধারণা আসে মূলত মুসলিম বিজ্ঞানী আবুল হাসানের তৈরীকৃত দূরবীক্ষণ যন্ত্র থেকে। যা নবম শতাব্দীতে তৈরি করা হয়েছিল। এ রকম দাবি আমাদের বাংলা ভাষায় লিখিত বিভিন্ন বইতেও আছে। সেরা মুসলিম বিজ্ঞানী নামক একটি বইতে দাবি করা হয়েছে, আবুল হাসান ছিলেন একজন পদার্থবিদ। তিনি নবম শতাব্দীতে সর্বপ্রথম দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। গ্যালিলিওর দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারের ৭৩১ বছর আগে আবুল হাসান এ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ’ (সেরা মুসলিম বিজ্ঞানী, পৃ: ১৬)

 

প্রশ্ন হলো, এই আবুল হাসান কে? অনেকেই আবুল হাসান বলতে ঘড়ির পেন্ডুলামের আবিষ্কারক আবুল হাসানকে ধারণা করেন। জেনে রাখা ভালো, সেই আবুল হাসান আর এই আবুল হাসান এক নন। ঘড়ির পেন্ডুলাম আবিষ্কারকারী বিজ্ঞানীর নাম হলো আবুল হাসান আলী ইবনে ইউনুস আল মিসরি। তিনি মিসরের রাজধানী কায়রোর বিখ্যাত জ্ঞান-গবেষণাকেন্দ্র দারুল হিকমার নেতৃস্থানীয় গণিতজ্ঞ ছিলেন।

 

হিউম্যান প্রোগ্রেস নামক একটি গবেষণা ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, সেই আবুল হাসান হলেন আবুল হাসান আল মাসুদি, যিনি সম্ভবত টেলিস্কোপের অগ্রদূত আবিষ্কার করেছিলেন। (সুত্র : https://www.humanprogress.org/centers-of-progress-pt-11-baghdad-astronomy/)

 

বিষয়টি বিখ্যাত লেখক জন টিম্বস এফ এ এ তাঁর বিখ্যাত বই থিংস নট জেনারেলি নোনও শিকার করেছেন। সেখানে তিনি টেলিস্কোপের আবিষ্কার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আবুল হাসান আল মাসুদির দূরবীক্ষণের আলোচনাও এনেছেন। (থিংস নট জেনারেলি নোন, পৃ: ৯৪)

 

বিভিন্ন সূত্রে আল মাসুদির তৈরীকৃত দূরবীক্ষণটির বর্ণনাও পাওয়া যায়—তাঁর দূরবীক্ষণটি ছিল একটা লম্বা টিউব, যার মধ্যে বেশ কিছু ল্যান্স লাগানো ছিল। (সূত্র : http://web.archive.org/web/20040407081652/www.geocities.com/mutmainaa/history/muslim_inventors.html)

 

বহু প্রতিভার অধিকারী আবুল হাসান আল মাসুদিকে বলা হয়  ‘দ্য হেরোডটাস অব দ্য আরব’। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইতিহাস ও ভূগোল নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে কাজ করেছেন। তাঁকে ইসলামের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভূগোলবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর পুরো নাম আবু আল হাসান আলী ইবনে আল হুসাইন ইবনে আলী আল মাসুদি, যিনি সংক্ষেপে আল মাসুদি নামে পরিচিত।

 

আল মাসুদি খুবসম্ভব ৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইরাকের বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব, পরিবার ও শিক্ষা—এসব বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যই পাওয়া যায় না। তবে তাঁর ভ্রমণবিলাসিতার কথা প্রায় সব ইতিহাসবিদই লিখে গেছেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আল মাসুদি তাঁর যাযাবর জীবনের শুরু করেন এবং মৃত্যুর কয়েক বছর আগে পর্যন্ত তাঁর এই ভ্রমণ অব্যাহত থাকে। পারস্য, শাম (বর্তমান সিরিয়া), আর্মেনিয়া, আজারবাইজান হয়ে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ভোলগা অঞ্চল, মধ্য এশিয়া, ভারত, কানবালু বা বর্তমান মাদাগাস্কার, ওমান, দক্ষিণ আরব, গ্রিক সাম্রাজ্য ও স্পেনে ঘুরে মিসরে গিয়ে শেষ হয় তাঁর এই দীর্ঘ ভ্রমণ। অনেক ইতিহাসবিদ তাঁর ভ্রমণের তালিকায় চীন ও শ্রীলঙ্কাও যোগ করেন। কেননা তাঁর ইতিহাস বিষয়ক লেখায় চীন ও শ্রীলঙ্কা সম্বন্ধে ব্যাপক পরিমাণে তথ্য ছিল।

 

আল মাসুদি কেবল একজন অসামান্য ভূগোলবিদই ছিলেন না, ছিলেন একজন চমত্কার লেখকও। আর তাঁর লেখার আগ্রহও ছিল ভীষণ বৈচিত্র্যময়। বিশেষত বিজ্ঞানের ইতিহাসবিষয়ক লেখায় তিনি একজন পথিকৃত্ হয়ে আছেন। তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখা ‘কিতাব আল মুরাজ আল ধাহাব’, যার ইংরেজি অনুবাদ ‘গোল্ডেন মিডোজ’ই একমাত্র অক্ষত অবস্থায় বর্তমানকাল পর্যন্ত টিকে আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে এই বইটি ছাড়া আল মাসুদির অধিকাংশ লেখাই হারিয়ে গেছে। ভূগোল আর ইতিহাসের বাইরেও তাঁর জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছিল সৃষ্টিতত্ত্ব, আবহাওয়াবিদ্যা, সমুদ্রবিজ্ঞান, জোতির্বিজ্ঞান, ইসলামিক শরিয়াহ আর আরব লোকজ সংস্কৃতি দিয়ে।

 

আল মাসুদির শিক্ষা সম্বন্ধে কিছু জানা না গেলেও এটুকু জানা যায় যে তাঁর জ্ঞানের প্রধান উত্স ছিল গ্রিক এবং রোমান ইতিহাস ও বিজ্ঞান এবং তাঁর ভ্রমণ। তিনি তত্কালীন সমাজে প্রচলিত অনেক কুসংস্কার থেকে নিজেকে সফলভাবে মুক্ত করতে পেরেছিলেন। প্রচলিত তথ্যের ওপর অন্ধভাবে বিশ্বাস স্থাপন না করে তিনি ভ্রমণের মাধ্যমে প্রামাণিক ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ করেন।

 

হয়তো তথ্যের প্রকৃত সত্যতা উদঘাটনে তাঁর এই জেদই তাঁকে সেরা কিছু উপহার দিতে সাহায্য করেছে। বিজ্ঞান, ভুগোল ও ইতিহাসে পৃথিবী উপকৃত হচ্ছে তাঁর গবেষণা থেকে। 

captcha