
খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে আরব মুসলিমরা ভারতবর্ষে অভিযান শুরু করে। উমাইয়া সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল সিন্ধুতে প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। তিনি রাজা দাহিরকে পরাজিত করে আলোর, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও মুলতান জয় করেন। এই অভিযানের পেছনে বেশ কিছু কারণ ছিল। যেমন—সাধারণ নাগরিকদের ওপর রাজা দাহিরের অত্যাচার, মুসলিম নৌবহরে হামলা-লুণ্ঠন, বিধবা মুসলিম নারীদের বন্দি এবং ক্ষতিপূরণ ও বন্দি মুক্তিতে অস্বীকার, পারস্য অভিযানের মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে ভারতীয়দের সহযোগিতা, ইরাকের বিদ্রোহীদের আশ্রয় প্রদান। এ ছাড়া ভারতবর্ষে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা ও আরব বণিকদের ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবসা নির্বিঘ্ন করাও এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।
সিন্ধু বিজয়ের বহুমাত্রিক প্রভাব
যদিও সিন্ধু অঞ্চলে মুসলিম শাসনামল খুব বেশি দীর্ঘ ও স্থিতিশীল ছিল না। তবু তা ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ভারতবাসীর জীবনযাত্রায় বহুমাত্রিক প্রভাব বিস্তার করে। ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার বলেন, ‘মুসলমান কর্তৃক ভারতবর্ষের সিন্ধু বিজয় অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা পরবর্তী সময়ের ওপর একটি স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছিল।’ (এন অ্যাডভান্স হিস্টোরি অব ইন্ডিয়া, পৃষ্ঠা-২৬৮)
নিম্নে মুসলমানের সিন্ধু অভিযানের প্রভাবগুলো তুলে ধরা হলো—
ধর্মীয় প্রভাব : সিন্ধু ও মুলতান অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী সমাজের গোড়াপত্তন হয়, যা পরবর্তী মুসলিম অভিযানের পথপ্রশস্ত করেছিল। মুসলমানের সহনশীল আচরণের কারণে ইসলাম সম্পর্কে স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায় এবং তারা ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হয়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ না করায় তারা মুসলিম বাহিনীর সহযোগীতে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব : মূলত আরবদের সিন্ধু অভিযানের মাধ্যমে স্থানীয় শাসকদের দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিক শক্তির স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যায়। যা পরবর্তী সময়ে অন্য মুসলিম শাসকদের ভারত অভিযানে প্রলুব্ধ করে। এই অভিযান স্থানীয় শাসকদের মানসিক শক্তিও খর্ব করে। আরবরা কোনো অঞ্চলের ভূমি দখলের চেয়ে মানুষের অন্তর জয় করাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও সামরিক সংঘাতে বিরক্ত ছিল। ফলে আরবরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় মনোযোগ দেন। স্থানীয় শাসকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব আরবদের রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছিল।
সিন্ধু অঞ্চলে আরব মুসলিমদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে এটা ছিল উপজাতি শাসিত একটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চল। আরব শাসনাধীন হওয়ার পর সিন্ধু সুবিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। যা সিন্ধুর শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখে। অন্যদিকে সিন্ধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়।
সাংস্কৃতিক প্রভাব : সিন্ধু বিজয়ের পর আরব মুসলিমরা সহনশীলতার নীতি অবলম্বন করে। তারা সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। আরব প্রশাসকরা স্থানীয় মানুষের বহু রীতি-নীতি যা ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়, তার স্বীকৃতি দেন। তারা হিন্দু ব্রাহ্মণদের থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও অর্থশাস্ত্রের জ্ঞান আত্মস্ত করেন। প্রাশাসনিক পরিভাষা হিসেবে বহু সংস্কৃত শব্দ যুক্ত করেন। ফলে সিন্ধু অঞ্চলে একটি সহনশীল মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
আরবরা ছিল মহান কবি। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের ছিল অগাধ ভালোবাসা। ফলে আরবি ও সংস্কৃত ভাষার মিশ্রণে সিন্ধি নামে একটি নতুন ভাষার জন্ম হয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু বিখ্যাত কবির জন্ম হয়। সে সময় সিন্ধি ভাষায় লেখা বহু কবিতা এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। আরব মুসলিমরা সিন্ধি ভাষায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদও করেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব : সিন্ধু অঞ্চলে অসংখ্য ছোট শহর ছিল। আরবরা প্রত্যেক অঞ্চলের কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ভিত্তিতে নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। যা অত্র অঞ্চলের কৃষি ও শিল্পের বিকাশে অভূতপূর্ব অবদান রাখে। সিন্ধুকে একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আরবরা যোগাযোগের বাহন হিসেবে সিন্ধু অঞ্চলে ঘোড়া ও উটের ব্যাপক প্রচলন ঘটায়। পরবর্তী সময়ে তা এই এলাকার প্রধান বাহনে পরিণত হয়। বহু আরব যোদ্ধা স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে সিন্ধুতে স্থায়ী হন, যা স্থানীয় জনসংখ্যায় প্রভাব ফেলে। আরবরা নিজের মাতৃভূমির মতোই এই এলাকার সার্বিক উন্নয়নে সচেষ্ট হয়। আরবদের পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা ও সুরম্য প্রাসাদ ভারতীয় নগর সভ্যতায় ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়।
মোটকথা, আরব অভিযান সিন্ধু অঞ্চলের জন্য ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করেছিল এবং সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সাধারণ মানুষকে ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করে তুলেছিল। ফলে পরবর্তী এই অঞ্চলে সহজেই ইসলাম বিস্তার লাভ করেছিল। মুসলিম শাসকদের সহনশীল মনোভাবের কারণে সিন্ধু অঞ্চলে একটি মিশ্র সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
জাগরণজশ ডটকম অবলম্বনে