IQNA

মুমিনের জীবনে প্রকৃত উত্তরণ

0:02 - January 10, 2023
সংবাদ: 3473147
তেহরান (ইকনা): উত্তরণ বলতে বোঝায় বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে গন্তব্যে উপনীত হওয়া, পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করা। পৃথিবীতে মুমিনের জীবনটাই পরীক্ষাস্বরূপ। এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পাবে পরকালে। তাই পরকালীন সাফল্যই মুমিনের প্রকৃত উত্তরণ। মুমিন যদি পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে এবং জান্নাতে প্রবেশ করে, তবেই সে সফল ও উত্তীর্ণ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, সেই সফল।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
উত্তরণের দুই প্রান্ত : মুমিনের জীবনে উত্তরণের প্রান্ত দুটি : দুনিয়া ও আখিরাত। মুমিন উত্তরণের দুই প্রান্তই স্পর্শ করার চেষ্টা করবে। মুমিনের জীবনে পরকালীন জীবন প্রাধান্য পেলেও পার্থিব জীবন উপেক্ষিত হবে না। এ জন্য মহান আল্লাহ দোয়া শিখিয়েছেন, ‘আর তাদের মধ্যে যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতে কল্যাণ দিন। আর আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। তারা যা অর্জন করেছে তার প্রাপ্য অংশ তাদেরই। বস্তুত আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০১-২০২)
 
উত্তরণে উৎসাহ : পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তরণের পথ অনুসরণ করার উৎসাহ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘এটাই তো মহাসাফল্য। এরূপ সাফল্যের জন্য সাধকদের উচিত সাধনা করা।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ৬০-৬১)
 
উত্তরণের তিন স্তর
 
 
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সাফল্য বা উত্তরণের সঙ্গে তিন ধরনের বিশেষণ উল্লেখ করেছেন। তা হলো, ‘আজিম’ (মহা), ‘কাবির’ (বড়) ও ‘মুবিন’ (স্পষ্ট)। কোরআন গবেষকরা বলেন, এগুলো মূলত উত্তরণের ধারাবাহিক স্তর। তারা স্তরগুলোর পরিচয় এভাবে তুলে ধরেন।
 
১. আল-ফাউজুল মুবিন : স্পষ্ট উত্তরণ হলো, যেখানে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তবে জান্নাতে প্রবেশের কথা বলা হয়নি। এটা মুমিনের সর্বনিম্ন উত্তরণ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন যাকে তা (জাহান্নাম) থেকে রক্ষা করা হবে, তার প্রতি তিনি তো দয়া করবেন এবং এটাই স্পষ্ট সফলতা।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬)
 
২. আল-ফাউজুল কাবির : বড় উত্তরণ হলো যেখানে জান্নাতে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে চিরদিন থাকা বা জান্নাতের কোনো স্তর উল্লেখ করা হয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা বুরুজ, আয়াত : ১১)
 
৩. আল-ফাউজুল আজিম : মহা-উত্তরণ হলো, যেখানে চিরদিন জান্নাতে বসবাস করার অনুমতি দেওয়া হয়, আবাসস্থলের বর্ণনা দেওয়া হয় এবং তাদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রকাশ করা হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ বলবেন, এই সেদিন যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৯)
 
 
উত্তরণের সর্বোচ্চ স্তর : তবে সুফিসাধক আলেমদের মতে, মুমিনের জীবনে উত্তরণের সর্বোচ্চ স্তর হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা। কেননা পরকালীন মুক্তি ও সাফল্য নির্ভর করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মুমিন নর-নারীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জান্নাতের, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত। যেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং স্থায়ী জান্নাতে উত্তম বাসস্থানের। আল্লাহর সন্তুষ্টিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৭২)
 
উত্তরণের অবলম্বন
 
কোরআন-হাদিসে ইহকালীন ও পরকালীন জীবনে উত্তীর্ণ হওয়ার অসংখ্য উপায় বর্ণিত হয়েছে। যার কয়েকটি হলো :
 
১. ঈমান ও আমল : ঈমান ও নেক আমল উত্তীর্ণ হওয়ার প্রধান অবলম্বন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে ও ভালো কাজ করে, তাদের প্রতিপালক তাদেরকে দাখিল করবেন স্বীয় রহমতে। এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা জাসিয়া, আয়াত : ৩০)
 
 
২. সত্যের অনুসরণ : সত্যপথের অনুসারীদের আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তীর্ণ করবেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ বলবেন, এই সেদিন, যেদিন সত্যবাদীরা তাদের সত্যতার জন্য উপকৃত হবে, তাদের জন্য আছে জান্নাত যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে; আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট; এটাই মহাসাফল্য।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৯)
 
৩. মুমিনের পারস্পরিক হৃদ্যতা : মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন নর ও নারী পরস্পরের বন্ধু; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজে নিষেধ করে, নামাজ আদায় করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে; এদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ (জান্নাত দান) করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৭১)
 
৪. আল্লাহভীতি : তাকওয়া বা আল্লাহভীতি মুমিনের জীবনে সাফল্য লাভের মহামন্ত্র। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে সাবধান থাকে। তারাই সফলকাম।’ (সুরা নুর, আয়াত : ৫২)
 
৫. আল্লাহর জন্য আত্মত্যাগ : যারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ ব্যয় করে তাদের ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হলো, ‘যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারা আল্লাহর কাছে মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ, আর তারাই সফলকাম।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ২০)
 
৬. কষ্ট পেয়ে ধৈর্য ধরা : কারো পক্ষ থেকে কষ্ট পেয়ে ধৈর্য ধারণ করলে, আল্লাহ তাকে উত্তীর্ণ করেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আজ তাদেরকে তাদের ধৈর্যের কারণে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে তারাই হলো সফলকাম।’ (সুরা মুমিনুন, আয়াত : ১১১)
 
 
৭. আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করা : জীবনের সর্বত্র আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যেই মুমিন জীবনের সাফল্য নিহিত। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭১)
 
আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে সবাইকে উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দিন।
captcha