IQNA

মোজাম্বিকে ইসলাম প্রচারের ইতিহাস

17:01 - July 27, 2023
সংবাদ: 3474112
তেহরান (ইকনা): দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের পূর্বদিকে ভারত মহাসাগর, উত্তরে তানজানিয়া, উত্তর-পশ্চিমে মালাউ ও জাম্বিয়া, পশ্চিমে জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ-পশ্চিমে দক্ষিণ আফ্রিকা অবস্থিত। দেশটির মোট আয়তন আট লাখ এক হাজার পাঁচ শ ৯০ বর্গ কিলোমিটার। চলতি বছরের পরিসংখ্যান মতে মোট জনসংখ্যা তিন কোটি ২৫ লাখ ১৩ হাজার ৮০৫ জন। মাপুতো দেশটির প্রধান শহর ও রাজধানী।
মোজাম্বিক ২৫ জুন ১৯৭৫ পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ধারণা করা হয়, মুসলিম শাসক মুসা বিন আম্বিক অথবা মুসা বিন মালিকের নামানুসারে দেশটির নামকরণ করা হয়। যা পর্তুগিজ ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে মোজাম্বিক হয়েছে।
মোজাম্বিক দরিদ্র দেশ হলেও তা প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর।
 
দেশটির অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। তবে শিল্প খাত ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে। খাদ্য ও পানীয়, রাসায়নিক উৎপাদন, অ্যালুমিনিয়াম ও পেট্রোলিয়াম দেশটির প্রধান প্রধান শিল্প খাত। সম্প্রতি পর্যটন খাতও বিকশিত হচ্ছে।
মোজাম্বিকের ৫৭.৬ শতাংশ মানুষ খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী এবং ১৮.৩ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। মুসলমানদের বেশির ভাগ সুন্নি মতালম্বী। কিছুসংখ্যক শিয়াও আছে। মোজাম্বেকিয়ান মুসলিমদের অধিকাংশ স্থানীয় আদিবাসী। অন্যরা ভারত, পাকিস্তান, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী।
 
খ্রিস্টানপ্রধান দেশ হলেও মোজাম্বিক সর্ববৃহৎ ইসলামী সংগঠন ওআইসির সদস্য।
মোজাম্বিকে ইসলামের আগমন ঘটে সুফি ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। বিশেষত হিজরি প্রথম শতকে ইয়েমেনি সুফি ও ব্যবসায়ীরা ইসলাম প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এর কয়েক শতাব্দী পরে আরো সুসংহতভাবে সেখানে ইসলাম প্রচার করা হয়। ওমানের ইবাদি মুসলিমরা পূর্ব আফ্রিকার উপকূল ধরে মোজাম্বিকে গমন করে এবং স্থানীয় জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে একটি ক্ষুদ্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে অত্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়। তখন মোজাম্বিকে মুসলিম ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ ও তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। অত্র অঞ্চলের সঙ্গে মুসলমানদের যোগাযোগ সুদৃঢ় হয় খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে। এ সময় উত্তর মোজাম্বিকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে এবং সিরাজি গোত্রের অভিজাত নেতারা এ কাজে সহযোগিতা করেন।
 
খ্রিস্টীয় দশম শতকে আলী ইবনে হাসান সিরাজি মোজাম্বিকে কিলওয়া সালতানাত প্রতিষ্ঠা করলে ইসলাম অত্র অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। মুসলমানদের প্রচেষ্টায় দেশটিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়। বন্দরনগরী সোফালা অত্র অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। সোফালা থেকে বিপুল পরিমাণ হাতির দাঁত, কাঠ, দাস-দাসী, স্বর্ণ ও লোহা ভারতবর্ষ ও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হতো। সোফালাসহ মোজাম্বিকের বেশির ভাগ উপকূলীয় অঞ্চল কিলওয়া সালতানাতের অংশ ছিল। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী থেকে ১৫০৫ সালে পর্তুগিজ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত মোজাম্বিক কিলওয়া সালতানাতের অধীনে ছিল। ওমানের আল বুসাইদ রাজবংশের সময় থেকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা মোজাম্বিকের দক্ষিণ উপকূলে ব্যবসা প্রসারিত করেছিল।
 
ঔপনিবেশিক আমলে মোজাম্বিকে ইসলাম ও মুসলমান বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এ সময় শাসক গোষ্ঠী ও গির্জা পরস্পরের সহযোগীতে পরিণত হয়। শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় রোমান ক্যাথলিক ধর্ম বিস্তার লাভ করে এবং তা মোজাম্বিকের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। তবে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সরকার মুসলমানসহ অন্য ধর্মালম্বীদের গুরুত্ব দিতে শুরু করে। যেন তারা স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে যোগদান না করে। তবে স্বাধীনতার পরও দেশটিতে ইসলাম পালনে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ ছিল। ১৯৮৯ সালে সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান হওয়ার পর মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্মপালন ও নতুন মসজিদ ভবন নির্মাণের সুযোগ পায়। তাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মুসলিম দেশের স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন মোজাম্বিকে সক্রিয় রয়েছে। তাদের সহযোগিতায় দেশটিতে নতুন নতুন মসজিদ ও ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে আফ্রিকান মুসলিম এজেন্সি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাইয়িদিনা হামজা কলেজ ও জামিয়া আনাস বিন মালিক কলেজ দেশটির প্রধান দুটি ইসলামী বিদ্যাপীঠ। এ ছাড়া দেশটির নামপুলা শহরে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া মোজাম্বিক মুসলিম বিবাহ রীতিকে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে।
 
সূত্র : প্রবন্ধ : ইসলাম ইন মোজাম্বিক : সাম হিস্টোরিক্যাল অ্যান্ড কালচারাল পারসপেক্টিভ; দাওয়াহ ডট সেন্টার ও উইকিপিডিয়া
 
captcha