
মুসলিম স্থাপত্য থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাবারেও রঙের প্রতীকী ব্যবহার দেখা যায়।
ইসলামের দৃষ্টিতে রং
কোরআন-সুন্নায় রং ও তার ব্যবহারের কথা নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন—
১. কুদরতের নিদর্শন : ইসলামের দৃষ্টিতে বিচিত্র রং মহান আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি দেখো না, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত করেন এবং আমি তা দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফলমূল উদ্গত করি।
আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ—শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো। এভাবে রংবেরঙের মানুষ, জন্তু ও আনআম রয়েছে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাই তাঁকে ভয় করে, আল্লাহ পরাক্রমশালী ও ক্ষমাশীল।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ২৭-২৮)
২. শোভা-সৌন্দর্যের উপকরণ : রং পৃথিবীতে শোভা ও সৌন্দর্য অর্জনের মাধ্যম।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আকাশে গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি এবং তাকে সুশোভিত করেছি (নানা রঙের গ্রহ-নক্ষত্র দ্বারা) দর্শকদের জন্য।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ১৬)
৩. মনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী : রং মানুষের মনের ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আল্লাহ বলেন, ‘মুসা বলল, আল্লাহ বলছেন, তা হলুদ বর্ণের গরু তার রং উজ্জ্বল গাঢ়, যা দর্শকদের আনন্দ দেয়।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৬৯)
৪. মনের ভাব প্রকাশকারী : রঙের ভিন্নতায় মানুষের মনের ভাব প্রকাশিত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।
’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)
৫. অবস্থা প্রকাশকারী : রঙের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর অবস্থা প্রকাশ করা যায়। যেমন দুর্ভিক্ষ ও সুদিন বোঝাতে বলা হয়েছে, ‘সেদিন কতক মুখ শুভ্র (উজ্জ্বল) হবে এবং কতক মুখ কালো হবে। যাদের মুখ কালো হবে তাদের বলা হবে ঈমান গ্রহণের পর তোমরা কী কুফরি করেছিলে? সুতরাং তোমরা শাস্তি ভোগ করো, যেহেতু তোমরা কুফরি করতে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৬)
কোরআনে বিভিন্ন রং ও তার প্রতীকায়ন
পবিত্র কোরআনে মোট আটটি রঙের বর্ণনা পাওয়া যায়। তা হলো :
১. আসফার : আসফার শব্দের অর্থ হলুদ। পবিত্র কোরআনে হলুদ রংটি পাঁচটি আয়াতে পাঁচবার এসেছে। আয়াতগুলো হলুদ রংটি পশুর সৌন্দর্য, ফসলের বিবর্ণ হওয়া, আগুনের তীব্রতা ও পশুর দৃষ্টিকটূ রং বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘তার উপমা বৃষ্টি, যার দ্বারা উৎপন্ন শস্য-সম্ভার কৃষকদের চমৎকৃত করে, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তুমি তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়-কুটায় পরিণত হয়।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২০)
২. আবয়াদ : আরবি আবয়াদের অর্থ শুভ্র বা সাদা। রংটি কোরআনের ১২টি আয়াতে ১২ বার ব্যবহৃত হয়েছে। সাদা রংটি কোরআনে কালোর বিপরীত বর্ণ, চেহারার ঔজ্জ্বল্য, পরিচ্ছন্নতা, দুশ্চিন্তা ও বার্ধক্যের নিদর্শন, হুরের সৌন্দর্য ইত্যাদি অর্থে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, সে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, আফসোস ইউসুফের জন্য। শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৪)
৩. আসওয়াদ : আসওয়াদ শব্দের অর্থ কালো। রংটির বর্ণনা কোরআনের ছয়টি আয়াতে সাতবার এসেছে। এর দ্বারা সাদার বিপরীত বর্ণ, দুর্ভাগ্য, হতাশা ও ক্রোধ বোঝানো হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫৮)
৪. আখজার : সবুজ রংকে আরবি ভাষায় আখজার বলা হয়। কোরআনের ছয়টি আয়াতে ছয়বার রংটির বর্ণনা এসেছে। এর মাধ্যমে সবুজ বর্ণ, আল্লাহর অনুগ্রহ, সজীবতা, প্রাচুর্য, জীবন, ফল ও ফসল বোঝানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাজা বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি স্থূলকায় গাভি তাদের সাতটি শীর্ণকায় গাভি ভক্ষণ করছে এবং দেখলাম সাতটি সবুজ শিষ ও অপর সাতটি শুষ্ক।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৩)
৫. আজরাক : আরবি আজরাক অর্থ নীল। পবিত্র কোরআনে মাত্র একবার রংটির বর্ণনা এসেছে। রংটি ভয়ে চোখে শূন্যতা দেখার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা নীল অসীম ও শূন্যতাকে বোঝায়। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং যেদিন আমি অপরাধীদের দৃষ্টিহীন অবস্থায় সমবেত করব।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১০২)
৬. আহমার : আহমার অর্থ লাল। কোরআনে লাল রঙের বর্ণনা দুই আয়াতে দুইবার এসেছে। এর দ্বারা লাল বর্ণ এবং বিপজ্জনক ও ভয়ানক অবস্থা বোঝানো হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে সেদিন তা রক্ত-রঙে রঞ্জিত চামড়ার রূপ ধারণ করবে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৩৭)
৭. জাহাবিয়্যু : সোনালি বর্ণকে আরবি ভাষায় জাহাবিয়্যু বলা হয়। কোরআনের তিনটি আয়াতে তিনবার রংটির বর্ণনা এসেছে। এর দ্বারা স্বর্ণ, সোনালি বর্ণ, পার্থিব ও পরকালীন জীবনের সুখ ও সমৃদ্ধি, আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ বোঝানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৪)
৮. ফিদ্দিয়্যু : আরবি ফিদ্দিয়্যু শব্দ দ্বারা রুপালি রং বোঝানো হয়। পবিত্র কোরআনের ছয়টি আয়াতে ছয়বার রংটির বর্ণনা এসেছে। এর দ্বারা রৌপ্য, রুপালি বর্ণ, সম্পদ ও প্রাচুর্য, আল্লাহর অনুগ্রহ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের পরিবেশন করা হবে রৌপ্যপাত্রে এবং স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানপাত্রে।’ (সুরা : দাহর, আয়াত : ১৫)
৯. ফাখখার : ফাখখার বলা হয় পোড়া মাটিকে। যাকে বাংলায় মৃত্তিকা বর্ণ বলা হয়। কোরআনে মাত্র একবার রংটির বর্ণনা এসেছে। এর দ্বারা শুষ্ক মাটির রং ও প্রকৃতি বোঝানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির মতো শুষ্ক মাটি থেকে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ১৪)
১০. মুদহাম : ঘন সবুজ রংকে আরবি ভাষায় মুদহাম বলা হয়। কোরআনে শব্দটি একবার ব্যবহৃত হয়েছে। এর দ্বারা বাগানের প্রাণ-প্রাচুর্য ও সজীবতা বোঝানো হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘এই উদ্যানদ্বয় ছাড়া আরো দুটি উদ্যান রয়েছে। ...ঘন সবুজ এই উদ্যান দুটি।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৬২ ও ৬৪)