
ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার শিকার। কিন্তু রাঈসী তার তুখোড় কূটনীতিক মুজাহিদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ হুসাইন আমীর আব্দুল্লাহীয়ানের সফল কূটনীতির মাধ্যমে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলোর সাথে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেন।
শহীদ রাঈসীকে খাদেমুর রেযা বলা হয়; কারণ তিনি ইরানের মাশহাদে নগরীতে ইমাম রেযার (আ) মাযার শরীফের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আজ সকাল ৮টায় ইরান সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে আয়াতুল্লাহ রাঈসী ও তার সফরসঙ্গীদের শাহাদাত ঘোষণা করেছে।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
إنّا لِلّٰهِ وَ إِنَّا إِلَیْهِ رَاجِعُوْنَ
আমরা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর এবং আমরা নিশ্চয়ই তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তন করছি ।
وَ مِنَ الْمُؤْمٌنِیْنَ رِجَالٌ صَدَقُوْا مَا عَاهَدُوا اللّٰهَ عَلَیْهِ ، فَمِنْهّمْ مَّنْ قَضَیٰ نَحْبَهُ وَ مٌنهُمْ مَّنْ یَنْتَظِرُ ، وَ مَا بَدَّلُوْا تَبْدٌیْلَاً .
মুমিনদের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহর সাথে নিজেদের কৃত অংগীকার পূর্ণ করেছেন , তাদের কেউ কেউ শাহাদাত বরণ করেছেন এবং কেউ কেউ (শাহাদাতের) প্রতীক্ষায় (ও ইন্তিযারে) রয়েছেন ; আর তাঁরা তাঁদের অঙ্গীকার ও ওয়াদায় কোন পরিবর্তন করেন নি (সূরা-ই আহযাব ৩৩ : ২৩) ।
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِيْنَ قُتِلُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللّٰهِ أَمْوَاتَاً بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْزُقُوْنَ .
‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন তাঁদেরকে কখনই মৃত মনে করো না । বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত।’ (সুরা-ই আল-ই ইমরান : ১৬৯)
মহানবীর (সা) পবিত্র আহলুল বাইতের (আ) বারো মা'সূম ইমামের ৮ম মা'সূম হযরত ইমাম আলী ইবনে মূসা আর-রেযার (আ) শুভ জন্মদিনে (১১ যিলক্বদ) হযরত ইমাম রেযার (আ) খাদেম (খাদেমুর রেযা), মুজাহিদ সংগ্রামী আলেম ও ইরানের ৭ম প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ ড: সাইয়েদ ইব্রাহিম রাঈসী, ইরানের মুজাহিদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমীর আব্দুল্লাহীয়ান, আজারবাইজানের জুমা’র খতিব (ইমাম) ও সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আলে হাশেম, আজারবাইজানের গভর্ণর ড: মালেক রহমতী , প্রেসিডেন্টের সিকিউরিটি টিম প্রধান সেকেন্ড ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সর্দার সাইয়েদ মাহদী মূসাভী , কর্ণেল (পাইলট) সাইয়েদ তাহের মুস্তাফা, কর্ণেল (পাইলট) মোহসেন দারিয়ানূশ্ এবং হেলিকপ্টারের টেকনিক্যাল বিষয়ক দায়িত্বশীল ক্যাপটেন বেহরূয ক্বাদীমী পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ভার্যেক্বনে গতকালের হেলিকপ্টার ( রোববার ১৯-৫-২০২৪ ) দুর্ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
শহীদ রাঈসীকে খাদেমুর রেযা বলা হয়; কারণ তিনি ইরানের মাশহাদে নগরীতে ইমাম রেযার (আ) মাযার শরীফের তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আজ সকাল ৮টায় ইরান সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে আয়াতুল্লাহ রাঈসী ও তার সফরসঙ্গীদের শাহাদাত ঘোষণা করেছে। ইমাম রেযার (আ) শুভ জন্মদিনের প্রাক্কালে খাদেমুর রেযার (ইমাম রেযার -আ- খাদেম ) শাহাদাতে আন্তরিক তাসলিয়াত (শোক) ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। এরা (প্রেসিডেন্ট রাঈসী ও তার সঙ্গীগণ) মহান আল্লাহ ও ইসলামের পথে এবং জনগণের সেবা, খেদমত ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন কালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন বলে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছেন। শহীদ রাঈসী তিনবছর ধরে নিরলসভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার শিকার। কিন্তু রাঈসী তার তুখোড় কূটনীতিক মুজাহিদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ হুসাইন আমীর আব্দুল্লাহীয়ানের সফল কূটনীতির মাধ্যমে আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র গুলোর সাথে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেন । ইরান তার সময় সাংগহাই গ্রুপ ও ব্রিক্সের সদস্যপদ লাভ করে। সফল রাজনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি সফল অর্থনৈতিক কূটনীতিও গড়ে তুলেন রাষ্ট্রপতি রাঈসী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী ইহুদী বাদী ইসরাঈলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তীন ও পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনকে শক্তিশালী করেন শহীদ ড: রাঈসী এবং শহীদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমীর আব্দুল্লাহীয়ান। আজ ইসরাইলের বিরুদ্ধে গাযায় হামাস ও ইসলামী জিহাদের সফল মুক্তি যুদ্ধ ও প্রতিরোধ সংগ্রাম, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের প্রতিরোধ সংগ্রামী গ্রুপ ও দলসমূহ এবং ইয়ামান একযোগে গাযায় ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে রাঈসী-আব্দুল্লাহীয়ানের সফল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ কূটনীতি প্রত্যক্ষ করা যায় ।
এই সফল কূটনীতির উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে সৌদি-ইরান কূটনৈতিক সম্পর্কের পুনঃ প্রতিষ্ঠা । মিসর ও জর্দানের সাথেও ইরানের সম্পর্ক উন্নয়নে রাঈসী-আব্দুল্লাহীয়ানের সফল কূটনীতি প্রত্যক্ষ করা যায় এমনকি আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে সেই সফল কূটনীতি লক্ষ্য করা যায় । ইরানের এত সব সাফল্য কি পশ্চিমাদের বিশেষ করে মাযুরা ( মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) ও যুরার ( যুক্তরাজ্য ) সহ্য হয়! আর এ কারণেই রাঈসী ও তার সরকার ছিল পশ্চিমাদের বিশেষ করে মাযুরা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) , যুরা (যুক্তরাজ্য) ও ইসরাঈলের চক্ষুশূল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা ইসলামী হিজাব ও মাহসা আমিনীর ঘটনা কেন্দ্র করে ২০২২ সালে ইরানে গোলযোগ ও ফিৎনায় ইন্ধন যুগিয়েছিল যাতে করে যেন রাঈসী সরকার ইরানে জনপ্রিয়তা হারায় এবং বিশ্বব্যাপী নিন্দিত হয়ে একঘরে হয়ে যায় । কিন্তু পশ্চিমারা সবাই এ মহাষড়যন্ত্রে ব্যর্থ হয়। কোভিড-১৯ মহামারীতে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য ধরাশায়ী ও বিধ্বস্ত এবং তখন দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯০০ - ১১০০ জন প্রতিদিন করোনায় প্রাণ হারাত। অথচ তখন রাঈসী সরকার খুব সফল ভাবে ইরানে করোনা মোকাবেলা করেন এবং করোনায় প্রতিদিন ৫০০ এর অধিক মৃত্যুকে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই রাঈসী সরকার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনেন। ইরানের বড় বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও অবকাঠামো বিনির্মাণে রাঈসী সরকার ব্যাপক অনবদ্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে এবং আবাসন সমস্যা সমাধানে রাঈসী সরকার ব্যাপক কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রচুর আবাসিক প্রকল্প পুরো ইরান জুড়ে বাস্তবায়ন করছেন যা গত রূহানী প্রশাসনে প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত ছিল। সামরিক-প্রতিরক্ষায় রাঈসী সরকারের এক অতি গৌরবোজ্জল দিক হচ্ছে সিরিয়ার রাজধানী দামেশকে ইরানী দূতাবাসের কনস্যুলেট ভবনে ইসরাইলের সন্ত্রাসী বিমান হামলায় শীর্ষ স্থানীয় কতিপয় ইরানী কর্মকর্তা শহীদ হলে গত ১৪ এপ্রিল ইসরাইলে সত্য প্রতিশ্রুতির সফল সামরিক (আমালীয়তে ওয়াদায়ে সদেক্ব) অভিযান পরিচালনা করে রাঈসী সরকার যা ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর আর কোনো আরব বা অনারব মুসলিম দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে পরিচালনা করতে সক্ষম হয় নি।
শহীদ আয়াতুল্লাহ ইব্রাহীম রাঈসী ছিলেন ইসলামী বিপ্লবী প্রশাসনিক প্রধানের প্রকৃত বাস্তব নমুনা যিনি আল্লাহর রাহে অর্থাৎ ইসলামী বিপ্লব, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে আল-কুদস ও ফিলিস্তীন সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের পথে যে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয়েছিলেন সেই প্রতিশ্রুতি পালন এবং জনগণের খিদমত ও সেবার পথে নিজ জীবন উৎসর্গ ও শাহাদাত বরণ করেছেন। আর তাঁর ও শহীদ সফরসঙ্গীদের মতো আরো একদল শাহাদাত বরণের প্রতীক্ষায় আছেন এবং তারা আসলেই তাদের কৃত অঙ্গীকার ও ওয়াদায় কোনো পরিবর্তন করেন নি ।
তাঁর ও তাঁর সফরসঙ্গীদের শাহাদাত উপলক্ষে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল - উযমা ইমাম খামেনেয়ী পাঁচ দিনের সরকারী শোক ঘোষণা করেছেন।
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ মোখবের দেযফূলী সংবিধানের ১৩১ ধারা মোতাবেক এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা ইমাম খামেনেয়ীর অনুমোদনে সরকারের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছেন। এখন তিনি ইরান সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান (প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট)। পার্লামেন্টের স্পিকার , বিচার বিভাগীয় প্রধান এবং ইরান সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৫০ দিনের মধ্যে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন । নির্বাচিত নতুন প্রেসিডেন্ট দেশ ও সরকারের প্রশাসনিক দায়িত্ব ভার গ্রহণ করবেন।
মহান আল্লাহ পাক শহীদ আয়াতুল্লাহ ড: সাইয়েদ ইব্রাহীম রাঈসী , তাব্রীযের শহীদ জুমা নামাযের ইমাম ও আযারবাইজানে সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আয়াতুল্লাহ আলে হাশেম, শহীদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমীর আব্দুল্লাহীয়ন এবং তাঁদের অপর সকল শহীদ সফর সংগীকে মহানবী ( সা ) এবং তাঁর পবিত্র আহলুল বাইতের (আ) সাথে মাহশূর ( পুনরুত্থিত ) করুন ।
লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ এবং গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান