
‘১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস’ প্রচলনের পক্ষে ভোট দেয় ৮৪টি সদস্য রাষ্ট্র।
প্রস্তাবের বিপক্ষে পড়ে ১৯টি ভোট আর ৬৮টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত ছিল। ওই গণহত্যায় নিহত আট হাজার পুরুষের স্বজনদের জন্য সন্তোষজনক। বসনিয়ান-সার্ব বাহিনী মানুষগুলোর ওপর পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।
১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে বলকান গৃহযুদ্ধের সময় স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার ঘটনা ঘটে।
গণহত্যার কিছুদিন আগে বসনিয়ার সার্ব সেনারা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ঘোষিত নিরাপদ এলাকা স্রেব্রেনিৎসা শহর এবং তার আশপাশের এলাকা দখল করে নিয়েছিল। বসনিয়ান সার্বরা স্রেব্রেনিৎসার মুসলিম পুরুষ ও বালকদের ধরে নিয়ে যায়। এদেরকে বেছে বেছে আলাদা করে হত্যা করা হয়, তারপর তাদের গণকবর দেওয়া হয়। আট হাজার মুসলিমকে ১১ জুলাই হত্যা করেছিল সার্বিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা বসনিয়ান-সার্ব বাহিনী, যাকে ইউরোপের সবচেয়ে নৃশংস ঘটনা হিসাবে দেখা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এত বড় গণহত্যা আর হয়নি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জার্মানি এবং রুয়ান্ডার পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। বিরোধিতা করে সার্বিয়া ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানোর পরও এটি পাশ হয় সদস্যদের ভোটে। এই প্রস্তাবকে ‘পলিটিসাইজড’ বলে আখ্যা দিয়েছেন সার্ব রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার ভুসিক। তিনি মনে করেন, এর ফলে পুরো সার্বিয়া এবং সার্ব জনগণের গণহত্যাকারী হিসেবে পরিচিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো।
বসনিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় স্রেব্রেনিৎসায় জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সেইফ এরিয়া (নিরাপদ স্থান)’ শান্তিরক্ষীদের তত্ত্বাবধানে ছিল। কিন্তু সংখ্যায় অপ্রতুল হওয়ায় শান্তিরক্ষীরা বসনিয়ান-সার্ব বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠেনি।
বসনিয়ান-সার্ব সামরিক কর্মকর্তা রাতকো ম্লাদিচের নির্দেশে বাহিনীর সদস্যরা নারী ও পুরুষদের আলাদা করেছিল। মা, স্ত্রী, কন্যা, বোনদের থেকে সেই যে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আলাদা করা হয়েছিল, আর তাদের দেখা মেলেনি। শুধু হত্যা নয় পরবর্তী সময়জুড়ে বসনিয়ান-সার্ব বাহিনীর সদস্যরা নিহতদের গণকবরগুলো পুনরায় খোঁড়ে। গণহত্যাকে ধামাচাপা দিতে দেহাবশেষগুলোকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় তারা। ফলে, একেকজনের শরীরের অংশগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।
ঘটনার ২৯ বছরে বেশিরভাগ পরিবার কিছু না কিছু দেহাবশেষ শনাক্ত করে দাফন করতে সক্ষম হয়েছে। গণহত্যার স্থানটির কাছেই, পোতোক্যারি সিমেট্রিতে কবর দেয়া হয়েছে তাদের। তবে কোনো কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন মিসিং পারসনস’ এর সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সাত হাজার ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে একটি বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দিবসটি ব্যক্তি, পরিবার এবং সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যার স্থায়ী ক্ষতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার শিকার মানুষগুলোকে স্বীকৃতি এবং শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে।’
এদিকে সার্বিয়া সরকার অবশ্য বিষয়টিকে একইভাবে দেখছে না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আলোচনার সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ভুসিক হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘এই প্রস্তাব পাস হলে তা প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিতে পারে।’ আরো অনেক গণহত্যা নিয়েই তখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভুসিক বলেন, ‘স্রেব্রেনিৎসা প্রস্তাবে কোনো সমাধানের ব্যাপার নেই, স্মৃতির ব্যাপার নেই বরং এতে নতুন ক্ষত সৃষ্টি হবে, শুধু আমাদের আঞ্চলিক পর্যায়ে নয়, এই পরিষদেও।’ সার্বিয়া সরকারের এমন তীব্র বিরোধিতায় সেই দেশটিতেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। কারণ, প্রস্তাবে সুনির্দিষ্টভাবে কেবল গণহত্যায় দায়ী ব্যক্তিদের কথাই বলা হয়েছে। স্পষ্ট করা হয়েছে, সেই দায় নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা অন্য কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের ওপর সামগ্রিকভাবে আরোপ করা যাবে না।
স্রেব্রেনিৎসায় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এমন রুল জারি করলেও, সার্বিয়া এর জন্য সরাসরি দায়ী বা সম্পৃক্ত নয় বলে জানা যায়। অবশ্য, সার্বিয়া গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন বিচারকরা। তিন বছর পর, সার্বিয়ার জাতীয় সংসদে গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়। প্রতিরোধে আরো ব্যবস্থা না নেয়ার জন্য ক্ষমাও চাওয়া হয় সেই প্রস্তাবে।