
কোরআন ও হাদিস লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমেই মুসলিম সমাজে পাঠাগারের সূচনা হয়েছিল। কোরআনের অনুলিপি ছাড়াও সাহাবায়ে কিরাম (রা.) কর্তৃক সংকলিত হাদিস গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২০টি। এগুলোই মুসলিম পাঠাগারের প্রথম সম্বল। (হাদিস অধ্যয়নের মূলনীতি, পৃষ্ঠা-২৪)
মুসলিম ইতিহাসের প্রথম পাঠাগার
সংরক্ষিত ইতিহাস অনুযায়ী, মুসলিম ইতিহাসের প্রথম পাঠাগার গড়ে উঠেছিল ইরাকের আম্বার শহরে।
সে ছিল বই সংগ্রাহক। তার কাছে বইয়ের এত বেশি সংগ্রহ ছিল, যা আমি আর কারো কাছে দেখিনি। সেখানে আরবি ভাষা, সাহিত্য, ব্যাকরণবিষয়ক বই এবং প্রাচীন বইয়ের বিপুল সংগ্রহ ছিল। এ ছাড়া আরব জাতির ইতিহাস, আরবি কবিতা, গল্প-কাহিনি, বংশধারার ইতিহাসবিষয়ক বই ছিল।
ইসলামের ইতিহাসে শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হয়েছিল মসজিদ কেন্দ্র করে। তাই ইসলামের সোনালি যুগে মসজিদই ছিল জ্ঞানচর্চার মূল কেন্দ্র। মুসলিম ইতিহাসে গণপাঠাগারের সূচনাও হয়েছিল মসজিদকে কেন্দ্র করে। ইসলামের ইতিহাসে গণপাঠাগারের বিকাশে উমাইয়া খলিফাদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা তাদের শাসনাধীন অঞ্চলে মসজিদভিত্তিক গণপাঠাগার গড়ে তোলেন।
এ ক্ষেত্রে স্পেনের উমাইয়া শাসকদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল। মুসলিম স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা সম্পর্কে বলা হয়, সেখানে ৮০০ সাধারণ মাদরাসা, ৭০টি বিশেষ মাদরাসা এবং ৭০০ মসজিদ ছিল। এসব মাদরাসা ও মসজিদের বেশির ভাগের নিজস্ব পাঠাগার ছিল। কর্ডোভার আল জাহরা রাজপ্রাসাদে অবস্থিত মুস্তানসির বিল্লাহ পাঠাগার ছিল একটি বৃহৎ গণপাঠাগার। তাঁর সম্পর্কে আল্লামা ইবনে খালদুন বলেন, মুস্তানসির বই সংগ্রহের জন্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে ব্যবসায়ীদের পাঠাতেন এবং তাঁদের কাছে বই কেনার জন্য অর্থ দিয়ে দিতেন। যেন তাঁরা আন্দালুসে (মুসলিম স্পেন) এমন সব বই উপস্থিত করতে পারেন আন্দালুসবাসী যার সঙ্গে পরিচিত নয়। বইয়ের অনুলিপি পেতে তিনি লেখকদের কাছেও অর্থ পাঠাতেন। তিনি বইয়ের অনুলিপি তৈরি ও বাঁধাইয়ে দক্ষ একদল লোককে তাঁর পাঠাগারে নিয়োগ দেন। তিনি স্পেনে বইয়ের এমন সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন, যা আগে-পরে কেউ করেনি। (নাফহুততিব : ১/৩৮৬)
গণপাঠাগারের নানা ধরন
মুসলিম সমাজে গণপাঠাগারের বিকাশ নানাভাবে হয়েছিল। যেমন—
১. স্বতন্ত্র গণপাঠাগার : গণমানুষের জ্ঞানচর্চার জন্য এসব পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। এসব পাঠাগার অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশ ছিল না, বরং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ছিল। যেমন কর্ডোভার মুস্তানসির বিল্লাহ পাঠাগার। এই পাঠাগারের বইয়ের তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল ৪৪টি বইয়ে। প্রতিটি বইয়ে ২০টি করে পাতা ছিল। এই তালিকায় কেবল বইয়ের নামই লেখা হয়েছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেছেন, এই পাঠাগারে বইয়ের সংখ্যা ছিল চার লাখ।
এমন আরেকটি বৃহৎ গণপাঠাগার ছিল বনি আম্মারের পাঠাগার, যা খাজানাতুল কুতুব বা দারুল উলুম নামে পরিচিত ছিল। সিরিয়ায় অবস্থিত এই পাঠাগারে ৮৫ জন লিপিকার কর্মরত ছিল। বনি আম্মারের লোকেরাও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বই সংগ্রহ করত। উজির বাহাউদ্দৌলা বাহাভি গণপাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠাগারের জন্য ওয়াকফ করেন। (ইবনু হাজাম আন্দালুসি, পৃষ্ঠা-৩৭; নিয়াবাতু তারাবিলিসিশ শাম, পৃষ্ঠা-১২)
২. মসজিদভিত্তিক গণপাঠাগার : মসজিদভিত্তিক পাঠাগারগুলোই ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীনতম গণপাঠাগার। এমন কয়েকটি বিখ্যাত পাঠাগার হলো মসজিদে নববীর পাঠাগার, দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের পাঠাগার, হালবের উমাইয়া মসজিদের পাঠাগার—যার অপর নাম সাইফিয়া, জামে আল-আজহারের পাঠাগার, কারাউইন মসজিদের পাঠাগার, স্পেনের কর্ডোভা মসজিদের পাঠাগার। ৮৮৬ হিজরিতে বজ্রপাত থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত মসজিদে নববীতে একটি বৃহৎ উন্মুক্ত পাঠাগার ছিল। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের পাঠাগারটি ছিল বিরল বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার। কর্ডোভা মসজিদ মুসলিম স্পেনের সর্ববৃহৎ মসজিদ। এই মসজিদে একটি বড় পাঠাগার ছিল, যাতে কোরআনের বহুসংখ্যক মূল্যবান ও বিরল পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত ছিল। এখানে উসমান (রা.)-এর হাতে লেখা কোরআনের অনুলিপিও ছিল।
৩. মাদরাসাভিত্তিক গণপাঠাগার : ইসলামের সোনালি যুগে পাঠাগার ছিল প্রতিটি মাদরাসার অপরিহার্য অংশ, বিশেষত ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানীগুলোতে। যেমন—বাগদাদ, দামেস্ক, কর্ডোভা, খোরাসান, কায়রো, দিল্লি ইত্যাদি। মসজিদভিত্তিক পাঠাগারের মতো উন্মুক্ত না হলেও মাদরাসাভিক্তিক পাঠাগারগুলো থেকে জ্ঞানান্বেষীদের উপকৃত হওয়ার সুযোগ ছিল। তা ছাড়া সে যুগে মুসলিম বিশ্বে মাদরাসা শিক্ষাই একমাত্র শিক্ষা হওয়ায় মাদরাসাগুলো ছিল গণবিদ্যালয় এবং তার পাঠাগারগুলো প্রকৃত অর্থে গণপাঠাগারই ছিল। এমন কয়েকটি পাঠাগার হলো—বাগদাদে অবস্থিত নিজামিয়া মাদরাসার পাঠাগার, দামেস্কে সুলতান নুরুদ্দিন প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার পাঠাগার, সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি (রহ.) প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার পাঠাগার, কায়রোর ফাজিলিয়া মাদরাসার পাঠাগার, যেখানে দুই লক্ষাধিক বই ছিল। (দাউরুল কুতুবি ওয়াল মাকতাবাতি ফি হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা-২৫)
মুসলিম বিশ্বের উল্লেখযোগ্য গণপাঠাগার
মুসলিম বিশ্বের বিখ্যাত কয়েকটি গণপাঠাগারের পরিচয় তুলে ধরা হলো—
১. বায়তুল হিকমাহ, বাগদাদ : আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর প্রতিষ্ঠিত এই জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রটি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পাঠাগার। এটি গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও কালক্রমে তা একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার, প্রকারান্তে গণপাঠাগারে পরিণত হয়। সংগৃহীত বইয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই পাঠাগারে মানুষের প্রবেশাধিকারের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে। আব্বাসীয় খলিফা হারুন ও মামুন এই জ্ঞানকেন্দ্রের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখেন। আরবি ভাষার পাশাপাশি এখানে গ্রিক, সুরিয়ানি (হিব্রু), ফারসি, হিন্দি, কিবতি ও হাবশি ভাষার বই ছিল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুসারে বায়তুল হিকমায় সংগৃহীত বইয়ের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখেরও বেশি।
২. দারুল ইলম, কায়রো : মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণপাঠাগার ছিল এটি। ফাতেমি শাসক হাকিম বিআমরিল্লাহ দারুল ইলম পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এটাকে বায়তুল হিকমাহর সমকক্ষ একটি পাঠাগারে উন্নীত করতে চেয়েছিলেন। ফলে তিনি এখানে একটি বিজ্ঞানাগারও প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল ইলমে সাত লক্ষাধিক বই ছিল। হাকিম বিআমরিল্লাহ নিজে পাঠাগারের সার্বিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করতেন।
৩. নিজামিয়া মাদরাসার পাঠাগার, বাগদাদ : সেলজুক রাজবংশের প্রধানমন্ত্রী নিজামুল মুলক তুসি (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া মাদরাসার পাঠাগারটিও ছিল বাগদাদের একটি বৃহৎ গণপাঠাগার। মাদরাসার মাসিক খরচ ছিল ৬০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পাঠাগারের জন্য ব্যয় হতো।
৪. মুস্তানসিরিয়া মাদরাসার পাঠাগার, বাগদাদ : ঐতিহাসিকরা লেখেন, মুস্তানসিরিয়া মাদরাসা পাঠাগারের বইয়ের সংগ্রহ ছিল নজিরবিহীন। বই সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য পৃথক ব্যক্তি ও কক্ষ ছিল। ছিল পৃথক আর্থিক বরাদ্দ।
৫. ভারতবর্ষে মুসলিম গণপাঠাগার : মুসলিম শাসক, রাজন্যবর্গ ও আলেমরা বড় বড় গ্রন্থাগার গড়ে তোলেন। এসব পাঠাগারের বেশির ভাগই গণপাঠাগার ছিল। ভারতের পাঠাগারগুলোর ভেতরে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বিরল বই-পুস্তক, মূল্যবান স্মৃতিচিহ্ন ও পাণ্ডুলিপির সংগ্রহশালা হলো ইয়ানকিপুর পাঠাগার। এটি মরহুম কাজি খোদা বকশ খানের পাঠাগার। রায়পুরের রাজকীয় পাঠাগার, হায়দারাবাদের আসফিয়া পাঠাগার, আলীগড়ে অবস্থিত শুরি পাঠাগার—প্রতিষ্ঠাতা হায়দারাবাদের সাবেক ধর্মবিষয়ক প্রধান শায়খ হাবিবুর রহমান শেরওয়ানি, লখনউতে অবস্থিত নদওয়াতুল উলামার পাঠাগার, দারুল উলুম দেওবন্দের পাঠাগার, আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার, লখনউতে অবস্থিত শায়খ নাসির হুসাইন বিন হামিদ হুসাইন পাঠাগার বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। (দাউরুল কুতুবি ওয়াল মাকতাবাতি ফি হাদারাতিল আরাবিয়্যা ওয়াল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা-২৫; ভারতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে মুসলিম অবদান, পৃষ্ঠা-১৪৪)
গণপাঠাগারের বহুমুখী কার্যক্রম
মুসলিম সভ্যতায় গণপাঠাগার শুধু বইয়ের সংগ্রহশালা ছিল না, বরং তার বহুমুখী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছিল। নিম্নে মুসলিম গণপাঠাগারের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তুলে ধরা হলো—
১. বই সংগ্রহ করা : বইয়ের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ গড়ে তোলা গণপাঠাগারের প্রধান কার্যক্রম ছিল।
২. বইয়ের অনুলিপি তৈরি করা : বইয়ের অনুলিপি তৈরির জন্য গণপাঠাগারগুলোতে লিপিকার নিযুক্ত করা হতো। যেন তারা নতুন বইয়ের অনুলিপি তৈরি করে রাখতে পারে এবং প্রয়োজনে পাঠককে অনুলিপি তৈরি করে দিতে পারে।
৩. বিশেষ পাঠকক্ষ : সর্বসাধারণের জন্য মুসলিম গণপাঠাগারে উন্মুক্ত পাঠকক্ষ ছিল আর শাসক, শীর্ষ আলেম, গবেষকদের জন্য বিশেষ পাঠকক্ষ ছিল। কায়রোর দারুল ইলম পাঠাগারের বিশেষ পাঠকক্ষ ছিল ৪০টি।
৪. বিজ্ঞানাগার : কোনো কোনো মুসলিম গণপাঠাগারে বিজ্ঞানাগারও ছিল। যেখানে গবেষকরা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেতেন। যেমন বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ এবং কায়রোর দারুল ইলমে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার জন্য মানমন্দির স্থাপন করা হয়েছিল। এই দুই জ্ঞানকেন্দ্রে গণিত, রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা চর্চার জন্য পৃথক শাখা ছিল।
৫. অনুবাদ : বিদেশি ভাষার বই অনুবাদ করা ছিল মুসলিম গণপাঠাগারের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। প্রায় প্রতিটি রাজকীয় পাঠাগার ও রাষ্ট্র পরিচালিত পাঠাগারে একাধিক ভাষার অনুবাদ নিযুক্ত ছিল, বিশেষত বায়তুল হিকমাহ, মুস্তানসির বিল্লাহ পাঠাগার ও দারুল ইলম।
৬. গ্রন্থ পর্যালোচনা ও নিরীক্ষা : বই সংগ্রহ করার পর তা পর্যালোচনা ও নিরীক্ষা করা হতো। নিরীক্ষকরা ইতিবাচক মন্তব্য করলেই তা পাঠের জন্য উন্মুক্ত করা হতো।
৭. দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ : মুসলিম ইতিহাসের প্রসিদ্ধ পাঠাগারগুলোতে বিরল বই ও দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য পৃথক কক্ষ ছিল। এ ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের ইসলামী পাঠাগারগুলোর অনন্য অবদান রয়েছে। ১৯৫৬ সালে আরব বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রসিদ্ধ পাঠাগারগুলো থেকে বিরল বই ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা। তারা ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানী ও বড় বড় পাঠাগার সফর করে এবং কয়েক শ বিরল গ্রন্থের ফটোকপি সংগ্রহ করে। (ভারতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতিতে মুসলিম অবদান, পৃষ্ঠা-১৪৪)
আল্লাহ সবাইকে প্রকৃত জ্ঞানান্বেষী হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।