
ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ও হরিদি সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে গবেষক আলী মারুফি আরানি ইকনা-কে দেওয়া এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, হরিদিদের কিছু উপগোষ্ঠী, যেমন “সাতমার”, ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারই বিরোধী। তাদের বিশ্বাস—মানুষের হাতে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করা ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধাচরণ। এমনকি “নাতুরি কার্তা” নামের আরেক হরিদি গোষ্ঠী ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় দলিল—পাসপোর্ট বা জাতীয় পরিচয়পত্র—কোনোকিছুকেই বৈধ মনে করে না।
এই গোষ্ঠীর মতে, ইহুদিদের প্রকৃত মুক্তি কেবল “মসিহ” আগমনের পরই সম্ভব। তবে একই সঙ্গে এমন হরিদিও আছেন যারা রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সুবিধা গ্রহণ করে নিজেদের স্বার্থ নিশ্চিত করেন এবং ইসরায়েলের জটিল জোট–রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে প্রথমদিকে হরিদিরা ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল। তাদের মতে, ইহুদিদের পবিত্র ভূমিতে প্রত্যাবর্তন কেবল মসিহের হাতে হওয়া উচিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তারা বুঝতে পারে আধুনিক সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব নয়। ফলে ১৯৫০-এর দশক থেকে ধীরে ধীরে তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করে এবং সংসদে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।
হরিদিরা নিজেদের ধর্মীয় নিয়ম-কানুন রক্ষার জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে শাবাত আইন, বিবাহ–বিচ্ছেদসহ নানা বিষয়ে ধর্মীয় আদালতের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে। পাশাপাশি তারা সামরিক সেবায় অংশগ্রহণ থেকে ব্যাপক ছাড়ও আদায় করে নেয়—যা আজও ইসরায়েলের অন্যতম বিতর্কিত বিষয়।

জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ডেল সার্তোর মতে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল হরিদি ও দূর-ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তার কথায়, “নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য হরিদিদের ওপর নির্ভর করায় ধর্মীয়-অতিবাদী দলগুলো অস্বাভাবিক শক্তি পেয়েছে।” তিনি আরও বলেন, এ কারণে বেন-গভির ও স্মুটরিচের মতো অতিরাষ্ট্রবাদী নেতারা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে, যা ইসরায়েলের গণতন্ত্রকে আরও সংকটে ফেলছে।

হরিদি সমাজ আধুনিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায়। তারা ঘরে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট টিভি পর্যন্ত সীমিত রাখে। যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করে “কোশের ফোন”—যেখানে ইন্টারনেট, ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়া নেই। তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাও সীমাবদ্ধ পোস্টার, ধর্মীয় ঘোষণা ও স্থানীয় নোটিশে।
তবে নতুন প্রজন্মের হরিদিদের মধ্যে পরিবর্তনের ঢেউ দেখা যাচ্ছে। অনেক তরুণ-তরুণী প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে যুক্ত হতে আগ্রহী। “KamaTech” ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় অনেক হরিদি যুবক-যুবতী গুগল, মাইক্রোসফটসহ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে হাজার হাজার হরিদি নারী–পুরুষ ইসরায়েলের হাই-টেক খাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, যেখানে উল্লেখযোগ্য অংশই মহিলা।
ইসরায়েলের ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স ইনস্টিটিউটের রিপোর্ট অনুযায়ী, হরিদি সমাজের ৫১ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে—এর ফলে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে আগ্রহী হচ্ছে।

২০১৪ সালে হরিদিদের একটি উপগোষ্ঠী “লো তাহোর”, যাদের “ইহুদি তালিবান” বলা হয়, ইসরায়েলের সরকারি চাপে অতিষ্ঠ হয়ে ইরানে আশ্রয় চাইতে চেয়েছিল। তাদের বিশ্বাস, ইরান ইহুদিদের ধর্মীয় অনুশীলনে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেয়।
এর আগে “নাতুরি কার্তা” গোষ্ঠীর নেতারাও ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ার চেষ্টা করেছিল এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের আমন্ত্রণে কয়েকবার তেহরান সফর করে যায়নবাদী বিরোধী বক্তব্য দেন। 4320385#