
ইতিহাসে আলোচিত ব্যাবিলন নগরী, যা প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সভ্যতার কেন্দ্র—ভৌগোলিকভাবে এই কোরআনিক বাবিলেরই ঐতিহাসিক রূপ। কোরআন যেখানে বাবিলকে নৈতিক শিক্ষা ও সতর্কবার্তার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, ইতিহাস সেখানে ব্যাবিলনকে সভ্যতা ও মানব উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে।
ব্যাবিলনীয় সভ্যতা
যার কেন্দ্র ছিল প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ঐতিহাসিক নগরী ব্যাবিলন—প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে বিবেচিত।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে রাজা হাম্মুরাবি ব্যাবিলনকে ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁর শাসনামলেই এই নগরী তার সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়। হাম্মুরাবি একে একে এই অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোকে পরাজিত করেন এবং আইনের শাসন, পাশাপাশি জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতে পারদর্শী পণ্ডিতদের জ্ঞানকে ভিত্তি করে একটি সুসংগঠিত ও স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলেন। তাঁর শাসনের শেষ পর্যায়ে প্রায় পাঁচ শ বছর আগে সারগনের সাম্রাজ্যের পর এই প্রথমবারের মতো সমগ্র মেসোপটেমিয়া একটি একক শাসনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়।
ব্যাবিলনীয় পুরাকীর্তি
ব্যাবিলনীয় সভ্যতা প্রাচীন যুগের অসংখ্য মূল্যবান পুরাকীর্তিতে সমৃদ্ধ।
এর মধ্যে সর্বাধিক খ্যাত ও তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন হলো ইশতার গেট। ইশতার গেট ছিল পোড়ানো ইট দিয়ে নির্মিত এক বিশাল ও নান্দনিক প্রবেশদ্বার। এটি প্রাচীন ব্যাবিলন নগরীর প্রধান রাজপথের ওপর অবস্থিত ছিল, যা বর্তমান ইরাকের অন্তর্গত। খ্রিস্টপূর্ব ৫৭৫ সালে নির্মিত এই গেটটির উচ্চতা ছিল ১২ মিটারেরও বেশি।
চকচকে নীল রঙের ইটের ওপর ড্রাগন ও তরুণ ষাঁড়ের উঁচু নকশা (রিলিফ) দিয়ে গেটটি শৈল্পিকভাবে সজ্জিত ছিল, যা ব্যাবিলনীয় শিল্পকলার উৎকর্ষের এক অনন্য নিদর্শন। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি বিশিষ্ট জার্মান প্রত্নতাত্ত্বিক রবার্ট কোল্ডেউই আবিষ্কার করেন। বর্তমানে মূল ইশতার গেটের কিছু অংশ জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত পেরগামন জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সাল থেকে ইরাকি সরকার গেটটির মূল অংশ ও সংশ্লিষ্ট পুরাকীর্তিগুলো ইরাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে, তবে এখনো সে উদ্যোগ সফল হয়নি।
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান
ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান ছিল নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের রাজধানীকে শোভিত করা এক কিংবদন্তিতুল্য উদ্যানসমূহ।
বলা হয়, সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার এই উদ্যান নির্মাণ করেছিলেন। প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হিসেবে এটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। তবে এর প্রকৃত অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এই উদ্যান আসলে অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী নিনেভেতে অবস্থিত ছিল, আবার অনেকে একে প্রাচীন কল্পনারই একটি রূপ বলে ধারণা করেন।
ব্যাবিলনের সিংহ
ব্যাবিলনের সিংহ ছিল প্রাচীন ব্যাবিলন নগরীর ফটকসমূহে স্থাপিত এক বিখ্যাত শিল্পনিদর্শন, যা চকচকে টাইলস দিয়ে নির্মিত হয়েছিল। সিংহকে ব্যাবিলনের প্রতীক এবং দেবী ইশতারের প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হতো। উর্বরতা, প্রেম ও যুদ্ধের দেবী ইশতারের প্রতীক হিসেবে এই মূর্তিটি শুধু ব্যাবিলনের শক্তি ও মর্যাদার প্রকাশই ছিল না, বরং শত্রুদের ভয় প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। আজকের ইরাকে এটি ব্যাবিলনীয় সভ্যতার একমাত্র জীবিত প্রতীক হিসেবে বিদ্যমান।
হাম্মুরাবির বিধিসংহিতা
হাম্মুরাবির বিধিসংহিতা হলো ব্যাবিলনীয় রাজা হাম্মুরাবি প্রবর্তিত প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ লিখিত আইন সংকলনগুলোর একটি। এতে মোট ২৮২টি বিধান অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মাধ্যমে বাণিজ্যিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে জরিমানা ও শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই আইনসমূহ একটি বিশাল কালো, আঙুলের আকৃতির পাথরে খোদাই করা ছিল। পরবর্তীকালে আক্রমণকারীরা এটি লুট করে নিয়ে যায়, তবে দীর্ঘকাল পরে ১৯০১ সালে তা পুনরুদ্ধার করা হয়।
বর্তমান ব্যাবিলন
সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে ইরাকি সরকার ব্যাবিলনের প্রাচীন পুরাকীর্তি নিয়ে বিস্তৃত খননকাজ পরিচালনা করে এবং ঐতিহাসিক নগরীর কিছু নিদর্শন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। এসব পুনর্নির্মাণের মধ্যে নব্য-ব্যাবিলনীয় শাসক নেবুচাদনেজারের একটি প্রাসাদও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযানের পর মার্কিন বাহিনী ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষের ওপর একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির মতে, এই ঘাঁটি নির্মাণের ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরে পরিস্থিতির উন্নতি হলে ২০০৯ সালে ঐতিহাসিক এই স্থানটি পুনরায় পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।