
এমন পরিবেশে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে ইসরাইলি কনস্যুলেটে আমেরিকান ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে বৈঠকে দেওয়া বক্তব্য সাধারণ কথার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে।
তিনি বলেছিলেন: “সোশ্যাল মিডিয়া এ যুগের অস্ত্র। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেনাকাটা হচ্ছে টিকটক। আমি আশা করি এই চুক্তি হবে, কারণ এটি ভাগ্য নির্ধারক হতে পারে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে এক্স। যদি আমরা এই দুটো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারি, তাহলে বিরাট অর্জন হবে। আমাদের যুদ্ধে নামতে হবে যাতে ইহুদি ও অ-ইহুদি বন্ধুদের মন ও চিন্তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।”
এই বক্তব্য প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে, যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়—এটি এখন “জনমতের যুদ্ধ” এবং বিশেষ করে ডিজিটাল জগতে চলছে; যেখানে ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রচলিত কথনকে চ্যালেঞ্জ করছে।
নেতানিয়াহু যখন সোশ্যাল মিডিয়াকে “অস্ত্র” বলে অভিহিত করেন এবং কেনা-বেচার যুক্তিতে তার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন, তখন তিনি আসলে ইসরাইলের জনমত নিয়ন্ত্রণ হারানোর গভীর উদ্বেগের কথাই প্রকাশ করেন—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে।
আমেরিকায় ইসরাইলের প্রতি জনমতের পরিবর্তন গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলের সঙ্গে আমেরিকান জনমতের মধ্যে গভীর ফাটল ধরেছে। গাজার হত্যা, অবরোধ ও ক্ষুধার যে ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে, তা তেল আবিবের “চিরকালীন ভুক্তভোগী” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
এর ফলস্বরূপ আমেরিকা ও ইউরোপে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থনের অভূতপূর্ব পতন ঘটেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সেপ্টেম্বর ২০২৫-এর জরিপ অনুসারে ৫৩ শতাংশেরও বেশি আমেরিকান ইসরাইলের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন—যা ২০২২ সালে (গাজা যুদ্ধের আগে) ছিল ৪২ শতাংশ।
গ্যালপ জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের বিরোধী, আর সমর্থনকারী মাত্র ৩২ শতাংশ।
এই পরিবর্তন শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ৫০ বছরের নিচের রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইসরাইলের প্রতি সমর্থনের গভীর ফাটল দেখা দিয়েছে। এমনকি ম্যাগা সমর্থক তরুণরাও আর আগের মতো ঐতিহ্যবাহী সমর্থন দেখাচ্ছে না।
প্রচলিত প্রচার থেকে ডিজিটাল যুদ্ধে জনমতের এই পরিবর্তনের মুখে ইসরাইল বুঝতে পেরেছে যে, পুরনো “হাসবারা” (ইসরাইলের ইতিবাচক প্রচারণা) আর কাজ করছে না। তাই তারা আমেরিকায় নিজেদের বর্ণনা নতুন করে গড়ে তোলার ব্যাপক প্রকল্প শুরু করেছে—যার তিনটি মূল স্তম্ভ: সোশ্যাল মিডিয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক-ধর্মীয় কাঠামোতে প্রভাব বিস্তার।
প্রথম পদক্ষেপ ছিল আমেরিকান ও ইউরোপীয় বড় প্রচারণা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো “ক্লক টাওয়ার এক্স” (Clock Tower X)-এর সঙ্গে চুক্তি—যার প্রধান ব্র্যাড পার্সক্যাল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০১৬ ও ২০২০ নির্বাচনের ডিজিটাল ক্যাম্পেইন ম্যানেজার। তিনি একই সঙ্গে খ্রিস্টান মিডিয়া নেটওয়ার্ক “সেলেম মিডিয়া”র (Salem Media) সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিক ম্যানেজারও।
এই চুক্তির আওতায় কোম্পানিটি টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও পডকাস্টের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে “কৌশলগত যোগাযোগ” সেবা দেবে। লক্ষ্য: মাসিক কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন ভিউ—ইসরাইলপন্থী বর্ণনা দিয়ে।
চুক্তির মূল্য প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার এবং মেয়াদ ৪ মাস। এটি “ইহুদি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই” নামে একটি বড় ক্যাম্পেইনের অংশ—যা বিশ্বের বিজ্ঞাপন জায়ান্ট “হাভাস মিডিয়া নেটওয়ার্ক” (Havas Media Network)-এর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। হাভাস ইসরাইলের পক্ষে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে এবং ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নতুন যুদ্ধক্ষেত্র এই কৌশলের একটি বড় অংশ হলো গুগল, ইউটিউব, এক্স ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের জন্য কোটি কোটি ডলার খরচ। এছাড়া চ্যাটজিপিটি-সহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটগুলোর উত্তরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে—যাতে গাজা ও যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে “আত্মরক্ষা”, “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই”, “মানবিক সহায়তা” জাতীয় শব্দ ব্যবহার হয়।
২০২৫ সালে এই প্রকল্পের বাজেট ৫৪৫ মিলিয়ন শেকেল ছাড়িয়ে গেছে—যার নাম “প্রজেক্ট ৫৪৫”।
জেনারেশন জি-কে লক্ষ্য করে ক্যাম্পেইন পুরো ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য জেনারেশন জি—যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে সক্রিয় এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সবচেয়ে বেশি সহানুভূতিশীল। তাদের জন্য ছোট, আবেগময় ও অনানুষ্ঠানিক কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে—ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে, সরকারি অ্যাকাউন্ট নয়।
গ্যালপ জরিপে দেখা গেছে, ১৮–৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের সমর্থন ১০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এটি প্রজন্মগত পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ।

ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ও গির্জা: ঐতিহ্যবাহী দরজা তরুণদের পাশাপাশি ইসরাইল তাদের ঐতিহ্যবাহী ভিত্তি—ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই গোষ্ঠী এখনো ইসরাইলের বড় সমর্থক, কিন্তু তারাও অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের চাপের মুখে পড়েছে। তাই ইসরাইল এখন সরাসরি ইভানজেলিক্যাল গির্জাগুলোকে লক্ষ্য করছে।
সরকারি নথি অনুসারে, খ্রিস্টান মিডিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করে কয়েক মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করা হয়েছে। লক্ষ্য: ইসরাইলকে “চিরকালীন ভুক্তভোগী” হিসেবে দেখানো এবং ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা।
কিছু ক্ষেত্রে আমেরিকান পাদরি ও খ্রিস্টান নেতাদের জন্য ইসরাইল সফরের আয়োজন করা হচ্ছে—যাতে তারা গির্জার মিম্বর থেকে ইসরাইলের পক্ষে বক্তব্য দেন।
ইসরাইল শুধু সমর্থন চায় না—তারা গির্জাগুলোকে রাজনৈতিক প্রচারের মঞ্চ এবং পাদরিদের “ইসরাইলপন্থী বর্ণনার দূত” বানাতে চায়।
এসব কি ইসরাইলের মুখোশ ঢাকতে যথেষ্ট? কয়েক মিলিয়ন ডলারের এই বিশাল প্রচারণা সত্ত্বেও প্রশ্ন থেকে যায়: এত খরচ করে কি ইসরাইলের কলঙ্কিত চেহারা ঢাকা সম্ভব?
জাতিসংঘের রিপোর্ট, মানবাধিকার সংস্থার নথি ও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যগুলো এত সহজে মুছে ফেলা যায় না। গাজার যুদ্ধ সরাসরি ছবি ও ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্বের সামনে এসেছে—এবং জেনারেশন জি, যারা এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য, তারাই সবচেয়ে বেশি সচেতন ও প্রতিরোধী।
এই বিপুল খরচের প্রচারণা আসলে একটি গভীর সংকটেরই প্রকাশ: যে ইসরাইল একসময় ইভানজেলিক্যালদের অকাতরে সমর্থন পেয়ে আসছিল, তাদের এখন লাখ লাখ ডলার খরচ করে তাদেরই সমর্থন কিনতে হচ্ছে। এটি প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষণ নয়—বরং একটি মূল স্তম্ভ হারানোর ভয়।
যখন বৈধতা হারিয়ে যায়, তা বিজ্ঞাপন দিয়ে কেনা যায় না, অ্যালগরিদম দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঠিক করা যায় না। 4329951#