সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে একদল তরুণ মুসলিম নারী উজ্জ্বল বৈজ্ঞানিক অর্জনের পাশাপাশি কুরআন হিফজের মতো ধর্মীয় সাফল্য অর্জন করে ধর্মীয় পরিচয় ও একাডেমিক উৎকর্ষের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ইকনা নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন, মুসলিমস অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড সূত্রে: মুসলিম সমাজে ব্যক্তির পরিচয় তার শিক্ষা ও পেশাগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তা স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের উৎস হতে পারে। যখন ইসলামী পরিচয় বিশেষায়িত শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উৎকর্ষের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন এমন উদাহরণ সামনে আসে যা প্রমাণ করে যে ধর্ম ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা নয়; বরং একটি সফল ও ফলপ্রসূ একাডেমিক ও পেশাগত ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে একদল তরুণ মুসলিম নারী উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত সাফল্য অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতক, বর্তমানে অধ্যয়নরত ছাত্রী, একজন হাফেজায়ে কুরআন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কার ও সম্মাননাপ্রাপ্তরা।
কুরআন হিফজ ও শৃঙ্খলা-দায়িত্ববোধের শিক্ষা
এই অভিজ্ঞতায় রয়েছেন এদিনা সার্দরিয়াভিচ, আসিয়া মিভিচ এবং হাফেজায়ে কুরআন খাদিজা চেঙ্গিচ। এছাড়া ফাতিমা গাভরান কাপ্তানোভিচ-ইসমাইল বেগোভিচ সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পদের মাধ্যমে এই দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এদিনা সার্দরিয়াভিচ চলতি বছরের ১৫ জুলাই স্নাতক সম্পন্ন করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল সার্জন হওয়া। তিনি চিকিৎসাবিদ্যাকে শুধু পেশা হিসেবে নয়, বরং মানবতার সেবায় একটি আহ্বান হিসেবে দেখেন। কঠোর অধ্যয়ন সম্পন্ন করার মূল প্রেরণা ছিল অন্যদের উপকার করার সুযোগ।
হাফেজায়ে কুরআন খাদিজা চেঙ্গিচ শৈশবে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ার পরিকল্পনা করেননি। ইসলামী উচ্চমাধ্যমিক স্কুল শেষ করার পর তিনি মানবতার সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এই পেশা বেছে নেন। মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে ভর্তির আগেই তিনি কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছিলেন। হিফজের অভিজ্ঞতাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি বলে মনে করেন, কারণ এতে শৃঙ্খলা, ধৈর্য, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধ গড়ে ওঠে।
চেঙ্গিচ জোর দিয়ে বলেন, প্রেরণা মানুষকে যাত্রা শুরু করতে সাহায্য করে, কিন্তু শৃঙ্খলাই তাকে পথ চলতে সাহায্য করে যখন পড়াশোনা কঠিন হয়ে ওঠে। তিনি মনে করেন, জ্ঞান একটি আমানত যা মানবতার সেবায় ব্যবহার করতে হবে।
আসিয়া মিভিচ ৯.২৪ সিজিপিএ নিয়ে মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের রৌপ্য পদক লাভ করেন। এটি চিকিৎসাবিদ্যা ও মানবদেহের জটিলতার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহের প্রমাণ।
হিজাবের প্রতি গর্ব ও ধর্মীয় পরিচয় সংরক্ষণ
পড়াশোনার শুরুতে তিনি বসনিয়ান হিজাবধারী মুসলিম নারী, মেডিক্যাল ছাত্রী এবং ভবিষ্যতের গবেষক হিসেবে নিজের পরিচয়ের সামঞ্জস্য নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে যে, একাডেমিক পরিবেশে প্রকৃত মর্যাদা নির্ভর করে জ্ঞান, পরিশ্রম, পেশাদারিত্ব এবং উন্নত আন্তঃব্যক্তিগত দক্ষতার ওপর।
মিভিচ মনে করেন, তাঁর প্রজন্মের কয়েকজন হিজাবধারী তরুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রৌপ্য পদক পেয়েছেন—এটি তাঁদের জ্ঞান, কঠোর পরিশ্রম ও একাডেমিক উৎকর্ষের স্বীকৃতি। হিজাব তাঁদের পরিচয়ের অংশ, যোগ্যতার বিকল্প নয়।
সার্দরিয়াভিচ বলেন, হিজাব তাঁর শিক্ষাজীবনে কোনো বাধা হয়নি; বরং এটি তাঁকে কাজের পদ্ধতি ও অন্যদের সঙ্গে আচরণে আরও দায়িত্বশীল করেছে এবং নিজের জ্ঞান ও পেশাদারিত্বকে নির্ভরযোগ্য রাখার অঙ্গীকার আরও বাড়িয়েছে।
মিভিচ জোর দিয়ে বলেন, হিজাবধারী মুসলিম নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের জ্ঞান, প্রচেষ্টা ও মূল্যবোধ ভাগ করে নিতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফাতিমা গাভরান কাপ্তানোভিচ মনে করেন, এই ছাত্রীরা নিজেদের ঈমানের প্রতি গর্ব এবং জ্ঞান ও মানবিকতার মাধ্যমে মানুষের সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে একসঙ্গে ধারণ করেছেন। তিনি রৌপ্য পদকধারী, একজন হাফেজায়ে কুরআন এবং উজ্জ্বল শিক্ষাগত ফলাফল অর্জনকারী কয়েকজন ছাত্রীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
ইসলামী পরিচয় সংরক্ষণ উৎকর্ষের পথে বাধা নয়
একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মেডিক্যাল ফ্যাকাল্টিতে বৈজ্ঞানিক ও পেশাগত মান সকলের জন্য সমান। ছাত্র-ছাত্রীদের বিচার করা হয় তাঁদের জ্ঞান, পরিশ্রম, দায়িত্ববোধ ও চরিত্রের ভিত্তিতে। সাদা এপ্রোন রোগীর সেবায় দক্ষতা, সহানুভূতি, মানবিকতা ও আত্মত্যাগের স্পষ্ট দাবি করে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো হিজাবধারী নারী মেডিক্যাল ছাত্রীদের সাফল্যের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে। তাঁরা এমন তরুণ মুসলিম নারীদের উদাহরণ, যারা নিজেদের পরিচয় সংরক্ষণ করেছেন এবং হিজাবকে নিজেদের উপস্থিতির অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছেন; একইসঙ্গে কঠিন বৈজ্ঞানিক পথে এগিয়ে গিয়ে উৎকর্ষ অর্জন করেছেন এবং সার্জারি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও রোগীর সেবায় পেশাগত স্বপ্ন লালন করছেন।
এই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্য এখানেই নিহিত: ইসলামী পরিচয়, বিজ্ঞান, বিশেষজ্ঞতা ও পেশাগত সাফল্য একই ব্যক্তির মধ্যে সহঅবস্থান করতে পারে। পরিচয় সংরক্ষণ উৎকর্ষের পথে বাধা নয়; বরং তা জ্ঞান, মানবতা ও সমাজের প্রতি আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। 4368982#