
রাজধানী শহরের স্থান নির্বাচনে তিনি নৌপথে সারা বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। ঐতিহাসিক ইয়াকুবি বলেন, ‘মানসুর স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন। কারণ হলো এটা সত্যিকার অর্থে দজলা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী একটি দ্বীপ। পূর্বে দজলা আর পশ্চিমে ফোরাত, এ দুটি গোটা পৃথিবীর ঘাট। ’
মূলত আব্বাসীয় আমলে আরবদের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। সামরিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আরবরা ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। ফলে আব্বাসীয় খেলাফতের বিভিন্ন প্রান্তে নৌবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে। নিম্নে আব্বাসীয় আমলের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নৌবন্দরের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
১. বসরা : আব্বাসীয় আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত নৌবন্দর ছিল বসরা। বিশেষত বাগদাদে যাতায়াতকারী জাহাজগুলো বসরায় অবস্থান করত। এ ছাড়াও তুর্কিস্তান, সাস ও ফারগানার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান নৌবন্দর।
২. ওবুল্লা : ওবুল্লা আব্বাসীয় আমলের সবচেয়ে প্রাচীন নৌবন্দর। চীন থেকে আগত জাহাজগুলো ওবুল্লাতে অবস্থান করত। এটাই ছিল আব্বাসীয় আমলের প্রধান নৌবন্দর।
৩. সিরাফ : তৃতীয় হিজরি শতকে পারস্য উপসাগরের তীরে সিরাফ বন্দর স্থাপন করা হয়। চীন ও ভারতে চলাচলকারী জাহাজগুলো এখানে ভিড়ত।
৪. এডেন : ইয়েমেনের এডেন পৃথিবীর প্রাচীন বন্দরগুলোর একটি। প্রাচীনকালেই এখানে বসতি গড়ে উঠেছিল। আব্বাসীয় আমলে এই বন্দরের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায়। ঐতিহাসিক ইয়াকুবি বলেন, এডেন সানার বন্দর। আবিসিনিয়া, মানদাহ, জেদ্দা, সিলেট (আসাম) ও চীন থেকে আগত জাহাজ এখানে নোঙর করে। ’
৫. সুহার : সুহার ছিল ওমানের বন্দর ও রাজধানী। ঐতিহাসিক বাশশারি বলেন, চীন (আরব) সাগরের পাড়ে এর থেকে বড় কোনো শহর নেই। অতি জনবহুল ও সুন্দর জায়গা এটি। সম্পদ ও ফলমূলে পরিপূর্ণ। এখানে মিষ্টি পানির খাল আছে। এটা হচ্ছে চীনের দরজা ও প্রাচ্যের ধনভাণ্ডার এবং ইয়েমেনের বাণিজ্যকেন্দ্র।
৬. শিহর : মাছ ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল শিহর নৌবন্দর। এখান থেকে ইরাক, ওমান ও ইয়েমেনের বিস্তৃত অঞ্চলে মাছ রপ্তানি করা হতো।
৭. কায়স : ওমান সাগরে অবস্থিত বাহরাইনের একটি প্রাচীন দ্বীপ ও বন্দর। ভারতগামী জাহাজ এখানে যাত্রা বিরতি করত।
৮. বাহরাইন : প্রাচীনকাল থেকে বাহরাইন নাবিকদের বসবাসের স্থান। আব্বাসীয় আমলে বাহরাইনের এত উন্নতি হয়েছিল যে সেখানে সব সময় এক হাজার ছোট-বড় নৌকা ও জাহাজ থাকত।
৯. হরমুজ : পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপ ও বন্দরটি কায়সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করত। ভারত, চীন ও ইয়েমেনের বাণিজ্য জাহাজ এখানে থামত।
১০. জেদ্দা : আরব উপদ্বীপের সঙ্গে আফ্রিকা মহাদেশের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল জেদ্দা। ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে এই বন্দরের ব্যবহার ছিল। ইসলাম আগমনের পর জেদ্দা বন্দরের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে মুসলিমরা হাবশায় হিজরত করার সময় জেদ্দা বন্দর ব্যবহার করেছিল।
১১. কুলজুম : লোহিত সাগরেরপারে মিসরীয় উপকূলের কাছেই ছিল প্রাচীন কুলজুম বন্দর। এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি বন্দর ছিল। ঐতিহাসিক ইয়াকুবি বলেন, ‘সাগরপারের এটি বড় শহর। যেসব ব্যবসায়ী মিসর থেকে হিজাজ ও ইয়েমেনে খাদ্যশস্য রপ্তানি করে, তারা এখানে থাকেন। ’
১২. আইলাহ : প্রাচীন আইলা বন্দরের বর্তমান নাম আকাবা। এটি ছিল কুলজুম বন্দরের নিকটবর্তী সিরীয় বন্দর। বহু দেশের ব্যবসায়ীরা এখানে একত্র হতো। মিসর, সিরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার হজযাত্রীরা এখানে একত্র হতো।
সাইয়েদ সুলাইমান নদভি (রহ.)-এর আরব নৌবহর অবলম্বনে