
সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা বলতে যা বোঝায় : সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থায় বয়স, যোগ্যতা ও জ্ঞান-বুদ্ধি অনুসারে পবিত্র কোরআন, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, আকাইদ সম্পর্কে ধারণা লাভের সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি তাতে ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব), ফালসাফা (দর্শন), স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, গণিত, পদার্থ, রসায়ন জীববিজ্ঞানসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। ফলে একজন শিক্ষার্থী যেভাবে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের সুযোগ থাকে, তেমনি নির্দিষ্ট সময়ের পর সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার সুযোগ পায়।
প্রাচীন ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : মূলত ইসলামের প্রধান শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে মাদরাসাব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। মহানবী (সা.)-এর যুগে মক্কায় দারুল আরকাম বিন আবুল আরকাম ও পরবর্তী সময়ে মসজিদে নববী থেকেই মসজিদে এর যাত্রা শুরু। ধীরে ধীরে এই কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। মূলত সুদক্ষ শিক্ষকদের কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি। এক পর্যায়ে মুসলিম সভ্যতার বিকাশে তা মৌলিক ভূমিকা পালন করে।
উমাইয়া, আব্বাসী শাসনামল ও পরবর্তী যুগে মুসলিম প্রধান শহরগুলোতে ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত মসজিদকেন্দ্রিক এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ৭৩০ সালে তিউনিসিয়ায় উবাইদুল্লাহ বিন আল-হাবহাব জামি জাইতুনাহ বা জাইতুনাহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজ নগরীতে ফাতিমা আল ফিহরির অর্থায়নে কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মনে করা হয়। ৯৭০ সালে ফাতেমি গভর্নর জাওহার আল-সিকিল্লি মিসরের কায়রোতে জামিউল আজহার প্রতিষ্ঠা করেন। ১০৫৭ সালে সেলজুক মন্ত্রী নিজামুল মুলুক বাগদাদে নিজামিয়াহ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১২২৭ সালে আব্বাসী খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ ইরাকের বাগদাদে মুসতানসিরিয়্যাহ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এসব প্রতিষ্ঠান মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি ইসলাম ও জাগতিক বিষয়াবলির পাঠদানে সমন্বয় ছিল।
মধ্যযুগের (৯০০-১২০০) বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানীরা এসব প্রতিষ্ঠানের হয়তো সরাসরি শিক্ষার্থী ছিল, নতুবা এসবের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা ছিল। যেমন গণিতবিদ আল-খাওরিজিমি, চিকিৎসাগুরু ইবনে সিনা, উদ্ভিববিজ্ঞানী আল-ইদরিসি, জ্যেতির্বিজ্ঞানী আল-বাত্তানি, দার্শনিক ও চিকিৎসক আবু বকর আল-রাজি, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-বেরুনি, দার্শনিক আল-কিন্দি, চিকিৎসক আল-জাহরাবি, উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ইবনুল বাইতার, চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনুন নাফিস, রসায়নবিদ জাবির ইবনে হাইয়ান, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ আল-খাইয়ামসহ আরো অনেকে যেমন ইসলামী পণ্ডিত ছিলেন, তেমনি নানা বিষয়ে তাদের গবেষণা ছিল সর্ববিদিত।
মুসলিম দেশে সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা : আধুনিক যুগে সৌদি আরব, কাতার, আমিরাত, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের স্কুল-কলেজগুলোতে মৌলিক ধর্মীয় শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি দেখা যায়। এসব দেশের মাদরাসাগুলোতেও প্রয়োজনীয় আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় রয়েছে। তুরস্কের সরকারি ইমাম হাতিপ স্কুল ছাড়াও বিভিন্ন স্কুলে কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমন্বয় রয়েছে। এমনকি ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার স্কুলগুলোতেও প্রয়োজনীয় ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। পাকিস্তানেও মাদরাসার পাশাপাশি স্কুলগুলোতে কোরআন ও ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে দেখা যায়। ভারতের অনেক রাজ্যে সমন্বিত শিক্ষা কারিকুলামে ইসলামিক স্কুল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
মোটকথা, উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছে। এরপর সুনির্দিষ্ট একটি বিষয়ে তার জন্য উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যেকোনো বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্য বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের দীর্ঘ তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ অনুশীলন জরুরি।