IQNA

সুফি দার্শনিক শেখ সাদি (রহ.)

18:42 - August 09, 2023
সংবাদ: 3474181
তেহরান (ইকনা): শেখ সাদির এ নাত সম্বন্ধে প্রচলিত, ‘তিনটি চরণ রচনার পর, একাধারে তিন দিন, তিন রাত পেরিয়েও তিনি কিছুতেই লিখতে পারছিলেন না চতুর্থ চরণ। প্রায় মাথাখারাপ অবস্থা। হঠাৎ চোখে ঘুম। স্বপ্ন দেখলেন—সাদির সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন: ‘কী ভাবছো?’ সাদি বলেন, কিছুতেই চতুর্থ চরণ মিলছে না।
 
‘বালাগাল-উলা বিকামালিহি
 
কাশাফাদ দুজা বিজামালিহি
 
হাসুনাত জামিউ খেসালিহি
 
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি’
 
শেখ সাদির এ নাত সম্বন্ধে প্রচলিত, ‘তিনটি চরণ রচনার পর, একাধারে তিন দিন, তিন রাত পেরিয়েও তিনি কিছুতেই লিখতে পারছিলেন না চতুর্থ চরণ। প্রায় মাথাখারাপ অবস্থা। হঠাৎ চোখে ঘুম। স্বপ্ন দেখলেন—সাদির সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন: ‘কী ভাবছো?’ সাদি বলেন, কিছুতেই চতুর্থ চরণ মিলছে না।
 
নবী (সা.) সাদির তিনটি চরণ শুনে বললেন ‘চতুর্থ চরণ : সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।’ (তথ্যসূত্র : অগ্রপথিক ই.ফা.বা.)
১১৭৫ খ্রি. ৫৭৫ হি.তে পারস্যের (ইরান) সিরাজনগরের তাউসে শেখ সাদির জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষাও সিরাজেই। উচ্চশিক্ষার জন্য গেলেন বাগদাদে।
 
অল্পদিনেই তিনি কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, উসুল, ফারায়েজ, হিকমা, দর্শন, ভাষাবিজ্ঞান, ধ্বনিবিজ্ঞান, অলংকারশাস্ত্র এবং সাহিত্য, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্রে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য মাওলানা উপাধি পেলেন। আবদুল কাদির জিলানির সান্নিধ্যে-সাদি ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই কবিতা লিখতেন তিনি। ছিলেন বিভিন্ন ভাষার প্রতি আগ্রহীও।
 
অল্প সময়েই তিনি আরবি, ফারসি, হিব্রু, গ্রিক, তুর্কি, ল্যাটিন, উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, আফগানিসহ চব্বিশাধিক ভাষা শিখে ফেলেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর হজ পালন করে, তিনি দেশভ্রমণে দামেস্ক, জেরুজালেম, ত্রিপলি, আলেপ্পো, কায়রো, ইস্পাহান, ভারত, সমরকন্দ, চীন, স্পেন, ইতালি, আফ্রিকা গমন করেন। তিনি বলেন—
‘নানান দেশে ঘুরে ঘুরে জীবন হল গত যে
 
নানান রকম লোকের সাথে দিন কেটেছে কত যে।
 
যেথায় গেছি কিছু কিছু নিয়েছি মোর থলিতে,
 
নিয়েছি ভালো যা পেয়েছি পথের ধারে চলিতে।’
 
জীবনসায়াহ্নে তিনি হামদ, নাত, গজল, কবিতা, বিভিন্ন উপদেশমূলক রচনা লিখতেন এবং রাতে কোরআন অধ্যয়ন ও ইবাদত বন্দেগিতে কাটাতেন।
 
গ্রন্থ পরিচিতি : রচিতগ্রন্থ ২২ মতান্তরে ২৪টি। সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ গুলিস্তাঁ ও বোস্তাঁ (গুলিস্তান, বোস্তান)। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো, সাহারিয়া, কারিমা, কাসায়েদ ফারসি, কাসায়েদ আরবিয়া, গজলিয়াত, পান্দে নামাহ ইত্যাদি।
 
ক. গুলিস্তান : তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম, বলা চলে সমগ্র সাহিত্যজগতে অবিস্মরণীয়। গুলিস্তানে আটটি অধ্যায় : ১. বাদশাহের চরিত্র, ২. দরবেশদের চরিত্র, ৩. অল্পে তুষ্টির গুরুত্ব, ৪. নীরবতার উপকারিতা, ৫. প্রেম ও যৌবন, ৬. দুর্বলতা ও বৃদ্ধাবস্থা, ৭. শিষ্টাচারের প্রভাব, ৮. কথা বলার শিষ্টাচার।
 
খ. বোস্তানের ১০ অধ্যায় : ১. ন্যায়বিচার, ২. এহসান, ৩. প্রেম, ৪. ভদ্রতা, ৫. ক্ষমা, ৬. জিকির, ৭. প্রশিক্ষণ, ৮. কৃতজ্ঞতা, ৯. তাওবা, ১০. মোনাজাত ও পুস্তকের সমাপ্তি।
 
জীবনোপলব্ধিতে সাদির উচ্চারণ :
 
‘সারা রাত কাটে ইবাদত বন্দেগিতে,
 
ভোররাত কাটে রিযিকের দুআ-মুনাজাতে,
 
আর সারা দিন যায়-
 
রুটি-রুজির ধান্ধায়।’
 
সাংসারিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর বাণী :
 
‘পরিবারের শেকলে বাঁধা তুমি সকাল-বিকাল
 
ঝেড়ে ফেলো নিশ্চিন্তে ইবাদতের খোশ-খেয়াল
 
রুটি-রুজির চিন্তা করে যার শান্তিহরণ
 
ঊর্ধ্বজগতে কেমন করে হবে তার বিচরণ?’
 
অধ্যাত্ম্যসাধনার অন্তরায় জাগতিকতার মোহ :
 
‘হাত পেতে নিলো যে দিরহাম-দিনার
 
নিজেই গুঁড়িয়ে দিলো সে সাধুতার মিনার।’
 
শাসকের কর্তব্য সম্পর্কে সাদি বলেন:
 
‘বাদশাহ হলেন জনগণের রাখাল;
 
যদিও তাঁর আছে প্রচুর ধন-সম্পদ,
 
রাখলের জন্য নয় ছাগল;
 
ছাগলের সেবা করার জন্যই রাখাল।’
 
মানবজীবনের অনিত্যতা প্রসঙ্গে সাদি বলেন:
 
‘বহু নামকরা মানুষ দাফন করা হয়েছে মাটির নিচে,
 
যাদের কোনো নাম-নিশানাও নেই এ পৃথিবীতে;
 
সে বৃদ্ধ ব্যক্তিটির লাশ দাফন করা হলো মাটিতে,
 
মাটি তা এমনভাবে ভক্ষণ করল; যার হাড়ও নেই বাকিতে।’
 
নিরুপায়ের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন:
 
‘যদি দেখি অন্ধ ও কূপ;
 
খুবই অন্যায়, যদি থাকি বসে করিয়া চুপ।’
 
মানুষের সঠিক গন্তব্যস্থল নির্ণয়ের উপদেশ দিয়ে সাদির বিখ্যাত উক্তি:
 
‘হে বেদুঈন,
 
আমি শংকিত, তুমি পারবে না পৌঁছতে কাবাতে;
 
কারণ যে পথে তুমি করেছ গমন, সে পথ যাবে তুর্কিস্তানে।’
 
সাদির জীবন তিন ভাগে বিভক্ত। ৩০ বছর অধ্যয়নে, ৩০ বছর ভ্রমণ ও কাব্য রচনায়, ৩০ বছর ধ্যান-আরাধনায় এবং নিজ রচনার বিন্যাস ও পূর্ণতা সাধনে। তাঁর শেষ ১২ বছর সুফিতত্ত্বের শিক্ষা প্রদান-প্রচারে অতিবাহিত। মহাকবি শেখ সাদি ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করলে সিরাজনগরের ‘দিলকুশা’য় তাঁকে দাফন করা হয়।
 
 
 
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
captcha