
ইহুদিবাদী ইসরাইল বিগত কয়েক দশক ধরে শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে বিশ্ব জনমতকে তার মতো করে সাজিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। গাজা উপত্যকায় গত এক বছর ধরে চলমান গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের খবরাখবরও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিকৃত করা হয়েছে অথবা গোপন রাখা হয়েছে। ইহুদিবাদীরা বিশ্বব্যাপী দর্শক-শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করার ক্ষেত্রে দারুনভাবে সফল হয়েছে এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে নিজের ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞের চমৎকার সব ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পেরেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসরাইলি প্রচারণা কীভাবে কাজ করে এবং গাজায় ইহুদিবাদীদের অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে বিশ্ব জনমতকে ভ্রুক্ষেপহীন করতে তারা কী কী কৌশলে আশ্রয় নেয়? পার্সটুডের আজকের এ নিবন্ধে আমরা এরকম পাঁচটি কৌশলের দিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করব:
১- ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে সামাজিক মাধ্যমগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাসী এ যুদ্ধকে কীভাবে দেখবে তা নির্ধারণ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইহুদিবাদী ইসরাইল। এ কাজে তারা সামাজিক মাধ্যমগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। ইসরাইলি এই প্রচারাভিযানে এক্স (সাবেক টুইটার), ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক সমাধ্যমগুলোতে হাজার হাজার গ্রাফিক ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দেয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে জনমতকে ক্ষেপিয়ে তোলার লক্ষ্যে ইসরাইলি প্রচারণার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদেরকে দায়েশের [আইএস] মতো ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরা হয়। যদিও দায়েশিদের কাজ ছিল মুসলমানদের হত্যা করা; ইহুদিদের হত্যা করা নয়।
২- ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরা
ইসরাইলি প্রচারণা যুদ্ধের একটি মূল পদ্ধতি হচ্ছে ঐতিহাসিক বাস্তবতার ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করা। ইতিহাসকে অস্বীকার কিংবা বিকৃত করা ইসরাইলের একটি পুরনো রীতি। তেল আবিব দাবি করে, ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার সময় ফিলিস্তিনি জনগণ নীরবে মেনে নিয়েছিল। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে তাদের ভূখণ্ড জবরদখল করে এই অবৈধ রাষ্ট্র চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইসরাইল সে বাস্তবতা আড়াল করে এমন একটি জল্পনা ও বিতর্কের ধুম্রজাল সৃষ্টি করে রেখেছে যাতে কেউ কোনদিন বাস্তবতার ধারেকাছেও যেতে না পারে।
৩- ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদেরকে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের থেকে আলাদা করে তাদের সম্পর্কে ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরা
ইহুদিবাদী ইরসাইল ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদেরকে সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের চেয়ে ভিন্ন কোনো সৃষ্টি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তারা ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদেরকে নির্দয় ঘাতক ও গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরে ইহুদিবাদী ইসরাইলের ভয়াবহ নৃশংসতার ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দেয়। ইসরাইলি প্রচারণার ধুম্রজালে বিশ্ববাসীর কারছে মনে হয় বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি সারাক্ষণ ইহুদি শিশুদের হত্যা করার ধান্দা করে এবং তারা চরম বিদ্বেষী মানসিকতার অধিকারী। এই ভীতিকে তারা হলোকাস্টের মতো বিষয়গুলির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর মধ্যে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি সৃষ্টি করে।
৪-ভয়াবহ বোমাবর্ষণ ও গণহত্যাকে আত্মরক্ষা বলে চালিয়ে দেয়া
ইসরাইলি প্রচারণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে নিজের সকল সামরিক পদক্ষেপকে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বলে চালিয়ে দেয়া। পশ্চিমা জনমতের সামনে ইসরাইলিরা সারাক্ষণ এ প্রশ্নটি ছুড়ে দিতে থাকে যে, ‘তোমাদের ঘরবাড়ি ও স্কুলগুলোর দিকে যদি এভাবে রকেট বর্ষণ করা হতো তাহলে আমরা যা করছি তার থেকে ভিন্ন কিছু কি তোমরা করতে?’ এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দমন অভিযানকে বৈধতা দিয়ে দেয়া হয়।
৫- যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার ও আলোচনার বিষয়বস্ত পরিবর্তন
যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ও গণহত্যার মতো অভিযোগগুলো ইসরাইল হয় তাৎক্ষণিকভাবে অস্বীকার করে কিংবা বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে দেয়ার মাধ্যমে জনমতকে বিভ্রান্ত করে। উদাহরণস্বরুফ, যখনই গাজায় ইসরাইলি বোমা হামলায় কোনো সাংবাদিক কিংবা বেসামরিক নাগরিক নিহত হয় তখন তেল আবিব দাবি করে, তারা ভুলবশত ওই হামলা চালিয়েছিল এবং বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকরা ইসরাইলি এই দাবি বিশ্বাস করে, ফলে ইহুদিবাদীদের নৃশংসতা সম্পর্কে তাদের মধ্যে অস্পষ্টতা থেকে যায়। আর এসব কারণেই পশ্চিমা দেশগুলোর জনমত ইহুদিবাদী ইসরাইলের ভয়াবহ অপরাধযজ্ঞের ব্যাপারে নীরব রয়েছে।#
পার্সটুডে