
আইআরআইবি'র বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইকনা: এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট এক লাখ ৭ হাজার ২৯০ জন পবিত্র হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। রোববার ৩০৫ জনের পর আজ সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টায় সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট আরও ৩১৫ জন হাজি নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
মর্মান্তিক ওই ঘটনায় আহত ও প্রত্যক্ষদর্শী হাজিরা দেশে ফিরে বলেছেন, কেবল পায়ের নিচে চাপা পড়ে নয়, মানুষের চাপে অক্সিজেনের অভাবেও অনেক হাজি মারা গেছে। তারা একে কেবল দুর্ঘটনা বলে মানতে নারাজ।
দেশে ফিরে বিমানবন্দরে নেমে এক হাজি মিনার ঘটনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘মিনায় পদদলিত হয়ে হাজীদের মৃত্যুর ঘটনার সম্পূর্ণ দায় বাদশাহ'র ছেলের (যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান)। সে আসাতে সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। থার্ড ফ্লোরের রাস্তাটা খোলা ছিল। সেখানে অবস্থান নেয়া লোকগুলো কেবল বেঁচে ছিল। আর সমস্ত লোক মারা গেছে। প্রিন্সের কারণে সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দেয়ায় ভিড়ের চাপে মানুষ মারা যায়।’
অন্য হাজি বলেন, 'সৌদি বাদশাহর ছেলে জামারায় ঢিল মারতে গেছিল। ঢিল মারতে যাওয়ার দরুন তাঁর অনারে (সম্মানে) সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে দিছে। বন্ধ করার কারণে মানুষ যেখানে গিয়া আটকায়, সেখানে আর কোনো জায়গা থাকে না। পিছন থেইকা চাপ লাগলে, ইটা যেমন দাঁড় করায়া রাখলে ধাক্কা দিলে একটার পর একটা পড়তে থাকে; অমন ধাক্কায় মানুষগুলার অবস্থা এরকম হইছে।’
আরেক হাজি বলেন, ‘প্রশস্ত রাস্তা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু এত লোকজন, নিয়ন্ত্রণ করার দরকার ছিল। ওই রাস্তায় যত লোক যাওয়া সম্ভব, ততটুকুই ছাড়া দরকার ছিল। মেইন রোড যেটা, সেটা দিয়ে আমাদের না যেতে দিয়ে সাইড রাস্তায় আমাদের দেয়া হয়েছে।’
রাজধানী মুগদার বাসিন্দা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সৌদির স্থানীয় সময় সোয়া ৮টায় ওই ঘটনা ঘটে। ওই সময় আমি সামনের দিকে ছিলাম। পেছন থেকে চাপ আসলে সামনের দিকে চলে যাই। সৌদি একজন প্রিন্সের জামারায় যাওয়ার কারণে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে হতাহতের এ ঘটনা।’
বাংলাদেশি হাজিদের প্রতি বৈষম্যের কথা তুলে ধরে বাসাবোর হাজি সুলতান আলী বলেন, ‘আমাদের দেখলেই ওরা আলী বাবা, আলী বাবা মনে করে। অত্যন্ত লজ্জাকর ব্যাপার। অথচ আমরা যে ক্যাম্পে ছিলাম, ৩০০ গিনিপিগের মতো। যেমন ফার্মে মুরগি এক সঙ্গে রাখা হয়। পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ানদের নিচের রাস্তা রেড কার্পেট দেয়া, আর আমাদের বাংলাদেশীদের মুরগির মতো রাখা হয়।
এর আগে এক ইরানি হাজি মিনা দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে বলেছিলেন, 'প্রথমত: আমরা যে পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম সে পথ বন্ধ ছিল। যদি পথ বন্ধ না করত অথবা প্রথমেই বন্ধ করে দিত তাহলে এ ঘটনা ঘটত না। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, কেন পথ বন্ধ করা হয়েছিল। তাছাড়া আগে পিছেও কোনো পথ ছিল না যে আমরা সেদিকে যাব।'
এদিকে, ওতারা মুসা নামে আইভরি কোস্টের এক হাজি জানান, 'যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন সেখানে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী ও ত্রাণকর্মীরা উপস্থিত ছিল, কিন্ত তারা হাজিদের রক্ষার জন্য কিছুই করে নি। হাজি সাহেবরা যে পথ দিয়ে আসা-যাওয়া করছিলেন সেই পথের দুই এক ধরনের বেড়া ছিল যা সহজেই খুলে দেয়া যেতো। কিন্তু তারা তা করেনি।'
উল্লেখ্য, সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ গত বৃহস্পতিবার মিনায় আসেন তার বাবা বাদশাহ সালমানের সঙ্গে বৈঠকের জন্য। যুবরাজের সঙ্গে ছিল ৩৫০ সদস্যের নিরাপত্তা দল। গাড়ি বহরটি হঠাৎ করে হজযাত্রীদের স্রোতের উল্টো দিকে ফিরতে থাকে এবং হজযাত্রীদের সঙ্গে সমন্বয় না করে কয়েকটি সড়ক হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। সৌদি যুবরাজের নিরাপত্তার জন্য চলাচল একমুখী করা হয়। তার গাড়ি বহর মিনা শহরের কেন্দ্রস্থলে আসায় তীব্র ভিড় দেখা দেয়। মূলত এ কারণেই পদপিষ্ট হয়ে হজযাত্রীদের মৃত্যু ঘটেছে।