IQNA

খলিজ ফার্স: বিশ্বের জিওপলিটিক্সের স্পন্দিত হৃদয় — শক্তি, নিরাপত্তা ও প্রতিযোগিতার মিলনস্থল

16:50 - May 01, 2026
সংবাদ: 3479102
ইকনা- একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, খলিজ ফার্স আজ শুধু একটি জলরাশি নয়, বরং বিশ্বশক্তির সমীকরণে একটি নির্ধারক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিপুল জ্বালানি সম্পদ, কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলকে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকায় রূপান্তরিত করেছে।

ইকনা-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বিষয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক নাভিদ কামালি বলেন:

ইকনা: কোন কোন উপাদান খলিজ ফার্সকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জিওপলিটিক অঞ্চলে পরিণত করেছে?

নাভিদ কামালি: খলিজ ফার্সকে শুধু ভৌগোলিক এলাকা হিসেবে নয়, বরং একটি বহুস্তরীয় কৌশলগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। এখানে ভূগোল, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও শক্তির প্রতিযোগিতা জটিলভাবে জড়িত। এর গুরুত্ব জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরের সমন্বয়ের ফল। প্রথমত, এর ভৌগোলিক অবস্থান পূর্ব ও পশ্চিমকে যুক্ত করে এবং ভারত মহাসাগর থেকে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার বাজার পর্যন্ত যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ার সংকটপূর্ণ এলাকার সঙ্গে সংযোগ। তৃতীয়ত, বিভিন্ন শক্তির উপস্থিতি। এসব কারণে খলিজ ফার্স বিশ্বশক্তির সমীকরণে নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে।

ইকনা: জ্বালানি সম্পদ খলিজ ফার্সের জিওপলিটিক গুরুত্ব বৃদ্ধিতে কী ভূমিকা রাখছে?

নাভিদ কামালি: জ্বালানি সম্পদ এই অঞ্চলের জিওপলিটিক গুরুত্বের মূল স্তম্ভ। বিপুল তেল ও গ্যাসের মজুত এটিকে বিশ্বের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিশ্ব অর্থনীতি এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকায় খলিজ ফার্স থেকে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা অনেক দেশের জাতীয় নিরাপত্তার মূল উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চীনসহ পূর্ব এশিয়ার শিল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো অনিশ্চয়তা তেল-গ্যাসের দামে ব্যাপক ওঠানামা ঘটাতে পারে। তাই জ্বালানি শুধু গুরুত্ব বাড়ায়নি, বরং এই অঞ্চলকে জিও-ইকোনমিক ও জিও-স্ট্র্যাটেজিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

ইকনা: তেহরান প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্ব ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?

নাভিদ কামালি: তেহরান প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। এটি বন্ধ হলে স্বল্পমেয়াদেও বিশ্ববাজারে তীব্র ধাক্কা লাগবে এবং তেল-গ্যাসের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতি স্ট্যাগফ্লেশনের (মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি) মুখে পড়বে। আঞ্চলিকভাবে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর আয় কমবে, আমদানিকারক দেশগুলোর বাণিজ্য ভারসাম্য চাপের মুখে পড়বে। বিকল্প জ্বালানি ও পরিবহন পথের প্রতিযোগিতা বাড়বে, কিন্তু স্বল্পমেয়াদে কোনোটিই এই প্রণালীর সক্ষমতা পূরণ করতে পারবে না। ফলে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। এরই প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ও ওপেক প্লাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

ইকনা: খলিজ ফার্স ও তেহরান প্রণালীতে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য কী?

নাভিদ কামালি: আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি একটি বহুস্তরীয় কৌশলের অংশ। প্রথমত, পশ্চিমা অর্থনীতি ও মিত্রদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং চীনকেন্দ্রিক স্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠা রোধ করা। তৃতীয়ত, এই সংবেদনশীল অঞ্চলে সংকট ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কৌশলগত ঘাঁটি বজায় রাখা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই উপস্থিতি আরও কম খরচে, জোটভিত্তিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর হয়েছে, কিন্তু মূল কৌশল অপরিবর্তিত রয়েছে।

نوید کمالی

ইকনা: ইরান খলিজ ফার্সের নিরাপত্তায় কী ভূমিকা পালন করছে এবং এটি দেশের নিরাপত্তা মতবাদে কীভাবে সংজ্ঞায়িত?

নাভিদ কামালি: ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ ও তেহরান প্রণালীর ওপর কৌশলগত প্রভাবের কারণে ইরান খলিজ ফার্সের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ইরানের নিরাপত্তা মতবাদে «অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় নিরাপত্তা» নীতি মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, অঞ্চলের দেশগুলো নিজেরাই বহিরাগত শক্তি ছাড়াই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বাস্তবে ইরান তার প্রতিরোধ ক্ষমতা, তথ্য ও নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার মাধ্যমে নৌপথের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ভূমিকা শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগতও। ইরান আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছে এবং ওমানের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।

ইকনা: খলিজ ফার্সে «আঞ্চলিক যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা» গড়ে তোলার পথে কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

নাভিদ কামালি: সবচেয়ে বড় বাধা হলো কিছু দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার অভাব, যার মূলে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, ঐতিহাসিক বিরোধ ও পরিচয়গত বিভেদ। এছাড়া কিছু দেশের বহিরাগত শক্তির ওপর নিরাপত্তা নির্ভরতা আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। বহিরাগত খেলোয়াড়দের হস্তক্ষেপও বড় বাধা। সংকট ব্যবস্থাপনা ও বিরোধ নিরসনের জন্য সর্বসম্মত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবও এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। এছাড়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা দ্বিধা (security dilemma) উদ্ভূত হয়েছে, যা বিভেদ বাড়াচ্ছে এবং ইসরায়েলের মতো খেলোয়াড়দের (বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও সৌদি আরবের মাধ্যমে) প্রভাব বৃদ্ধি করছে।

ইকনা: যদি সাম্প্রতিক যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংঘাত হয়, তাহলে খলিজ ফার্সের জিওপলিটিক অবস্থানে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

নাভিদ কামালি: এমন পরিস্থিতিতে খলিজ ফার্স দ্বৈত অবস্থার মুখোমুখি হবে। একদিকে সংকট ও বড় শক্তির প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে তার গুরুত্ব বাড়বে এবং বিদেশি সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প খোঁজার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করবে—যেমন জ্বালানির বৈচিত্র্যকরণ, বিকল্প পরিবহন পথ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ। দীর্ঘমেয়াদে এটি খলিজ ফার্সের ঐতিহ্যবাহী জিওপলিটিক সুবিধা কিছুটা কমাতে পারে। সামগ্রিকভাবে, উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটি জিওপলিটিক পুনর্গঠনের পর্যায়ে প্রবেশ করবে, যেখানে জ্বালানির পাশাপাশি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও জিও-ইকোনমিক উপাদানগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। 4349656#

captcha