IQNA

আরবাইনের স্থায়িত্বের রহস্য নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্ণনা

23:30 - August 04, 2026
সংবাদ: 3479578
আরবাইনের স্থায়িত্বের রহস্য নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের বর্ণনা**
একটি ভারতীয় গণমাধ্যম লিখেছে: প্রতি বছর যারা আরবাইনে করবালায় পৌঁছান, সেই লক্ষ লক্ষ যাত্রীর জন্য এই অনুষ্ঠানের বার্তা একইসঙ্গে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক। অর্থাৎ, ১৪ শতাব্দী আগে শহীদ হওয়া একজন মানুষের মাজারের দিকে যাত্রা এবং এই সত্যের উপর জোর দেওয়া যে, জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবিচল অবস্থান আজকের বিশ্বের জন্যও অর্থপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।

ইকনা’র বরাত দিয়ে আউটলুক ইন্ডিয়া জানিয়েছে, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ যাত্রী দক্ষিণ ইরাকের মরুভূমি পেরিয়ে পবিত্র শহর করবালায় হেঁটে যান, যাতে আরবাইনের এই মহান আয়োজনে অংশ নিতে পারেন—যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বার্ষিক সমাবেশ। এ বছর যাত্রীরা 4 আগস্ট করবালায় একত্রিত হবেন।

 

এই ভারতীয় গণমাধ্যম লিখেছে: আরবাইন আশুরার ৪০ দিন পর অনুষ্ঠিত হয়—যেদিন শিয়ারা ইমাম হুসাইন (আ.), নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতির শাহাদাতকে স্মরণ করেন।

 

প্রতিবেদন অনুসারে, আরবাইনের মতো খুব কম আয়োজনই শিয়া মতবাদের বিভিন্ন দিক এত স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারে—আত্মত্যাগ ও শাহাদাত থেকে শুরু করে জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতা পর্যন্ত।

 

একটি শাহাদাত যা ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে

 

আরবাইন বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের করবালার ময়দানে। ইমাম আলী (আ.) এবং তাঁর বড় পুত্র ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাতের পর খেলাফত উমাইয়া শাসক ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার হাতে চলে যায়। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের (৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) পর এটি ছিল ইসলামি বিশ্বের প্রথম বংশানুক্রমিক শাসন।

 

ইমাম হুসাইন (আ.) ইয়াজিদের শাসনের বৈধতা স্বীকার করেননি, কারণ তিনি তাঁকে নৈতিকভাবে ইসলামি সমাজের নেতৃত্বের যোগ্য মনে করতেন না।

 

৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের একটি ছোট দল নিয়ে ইরাকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু করবালার কাছে অনেক বড় এক সেনাবাহিনীর দ্বারা তিনি অবরুদ্ধ হন এবং তাঁর প্রায় ৭০ জন সঙ্গীসহ শহীদ হন। কাফেলার নারী ও শিশুদের বন্দি করে উমাইয়া রাজধানী দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়।

 

শিয়াদের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরাজয় ছিল না, বরং ধর্মের সত্য রক্ষার জন্য আত্মত্যাগ। ইমাম হুসাইন (আ.) উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যা তিনি জালিম ও ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী মনে করতেন।

 

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের স্মরণ শিয়াদের জন্য নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারের শিক্ষার স্মারক। এটি হক ও বাতিলের চিরন্তন সংঘাতের প্রতীক এবং ক্ষমতাসীনদের আচরণ ও ইচ্ছা নির্বিশেষে নৈতিক নীতির প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষা।

 

করবালার ঘটনার পর, যারা দামেস্ক থেকে ফিরছিলেন, তাঁরা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজারে উপস্থিত হন। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আনসারিও তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এবং শিয়া বিশ্বাস অনুসারে তিনিই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজারের প্রথম যাত্রী।

 

আরবাইন এই জিয়ারতের স্মারক এবং শোকের সময়সীমার সমাপ্তি নির্দেশ করে। প্রতীকী অর্থে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত ছিল বিশ্বের ধ্বংস এবং আরবাইন হলো তার পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবনের প্রতীক।

 

করবালার পথচলা

 

আজ আরবাইনের সবচেয়ে পরিচিত পথচলা নাজাফ থেকে শুরু হয়—যেখানে ইমাম আলী (আ.)-এর মাজার রয়েছে—এবং প্রায় ৭৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে করবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হরমে পৌঁছায়। সাধারণত এই পথ তিন দিনে পাড়ি দেওয়া হয়। পথে মোকাবগুলো স্থাপন করা থাকে এবং স্বেচ্ছাসেবীরা যাত্রীদের বিনামূল্যে খাবার, চা, চিকিৎসা সেবা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেন।

 

শিয়া অধ্যয়নের গবেষক সাইয়েদ আকবর হায়দার লিখেছেন: “আমি আরবাইনের সময় করবালা সফর করেছি। আমার কাছে এটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে যে, দশকের পর দশক ধরে সংঘাত ও অস্থিরতার শিকার একটি দেশ কীভাবে এক সপ্তাহ ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে বিনামূল্যে খাবার ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করতে পারে। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগের বর্ণনা আজও কঠিন পরিস্থিতিতেও অসাধারণ আতিথেয়তার অনুপ্রেরণা জোগায়।”

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরবাইনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দুই কোটিরও বেশি বলে অনুমান করা হয় এবং অনেকে একে বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক সমাবেশ বলে মনে করেন।

 

তবে আরবাইন সবসময় এত প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হয়নি। সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসনের সময় (১৯৭৯-২০০৩) শিয়াদের শোকানুষ্ঠান কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছিল এবং আরবাইনের পথচলা কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। কেবল সাদ্দামের পতনের পর এই অনুষ্ঠান আবার স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত হতে শুরু করে এবং দ্রুত বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের জিয়ারতে পরিণত হয়।

 

শোকের বাইরে

 

অধিকাংশ শিয়ার কাছে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত কেবল একটি ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি নয়। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আত্মত্যাগ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসকেই নয়, রাজনৈতিক চিন্তাধারাকেও প্রভাবিত করেছে। হায়দার মনে করেন, এই ঘটনা জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি মডেল উপস্থাপন করে, যা ‘করবালা প্যারাডাইম’ নামে পরিচিত।

 

এই মডেলের রাজনৈতিক প্রয়োগের একটি উদাহরণ দেখা যায় ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবে, যেখানে ইমাম খোমেইনি (রহ.) মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাত করেন।

 

ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত বিশ্বজুড়ে শিয়া সম্প্রদায়কে বিভিন্ন ভাষায় কবিতা, নাটক ও শোকানুষ্ঠান রচনায়ও অনুপ্রাণিত করেছে।

 

এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি হলো উনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় শিয়া কবি মীর আনিসের মহাকাব্য ‘জঙ্গ-ই করবালা’। তিনি এমন একটি দৃশ্য বর্ণনা করেছেন যেখানে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর চার বছর বয়সী কন্যা হযরত সাকিনা (সা.) তাঁর ফুপিআম্মার কাছে বাবার খোঁজ করেন, অথচ তিনি জানেন না যে তাঁর পিতা যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়েছেন। শিয়ারা এই বেদনাকে কেবল ঐতিহাসিক বর্ণনা নয়, বরং একটি জীবন্ত ও চিরস্থায়ী যন্ত্রণা বলে মনে করেন।

 

প্রতিবেদনের শেষে বলা হয়েছে: প্রতি বছর যারা আরবাইনে করবালায় পৌঁছান, সেই লক্ষ লক্ষ যাত্রীর জন্য এই অনুষ্ঠানের বার্তা একইসঙ্গে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক—অর্থাৎ, ১৪ শতাব্দী আগে শহীদ হওয়া একজন মানুষের মাজারের দিকে যাত্রা এবং এই সত্যের উপর জোর দেওয়া যে, জুলুম ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবিচল অবস্থান আজকের বিশ্বের জন্যও অর্থপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ।4367571

captcha