IQNA

ড. মুহাম্মদ আবদু হাননান

বাংলায় মুসলিম আগমন নিয়ে নতুন তত্ত্ব

1:37 - May 18, 2021
সংবাদ: 2612804
তেহরান (ইকনা): আকবর আলি খান প্রধানত অর্থনীতিবিদ। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে, বিশেষ করে প্রাচীন বাংলায় মুসলিম আগমনের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর অনুসন্ধান প্রণিধানযোগ্য। তাঁর এ বিষয়ে গবেষণালব্ধ ফলাফল নিয়ে ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমি থেকে Discovery of bangladesh শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় এবং পরবর্তীকালে এর অনুবাদও (আমিনুল ইসলাম অনূদিত) বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়।

 সম্প্রতি (২৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে) তিনি একই বিষয় নিয়ে (শিরোনাম : ‘বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার : ঐতিহাসিক প্রশ্নসমূহের পুনর্বিবেচনা’) একটি বক্তৃতা (জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক গুণীজন বক্তৃতা : ৬) দেন। এতে তাঁর গ্রন্থের অনুসন্ধানগুলো আরো সুসংবদ্ধভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রাচীন বাংলায় মুসলিম আগমন বিষয়ে তাঁর কতক মন্তব্য এর সমাধানে নতুনত্ব ধরা পড়ে। বিষয়গুলো আমরা পর্যালোচনা করব। প্রথমে দেখি, তিনি এ বিষয়ে তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। প্রশ্নগুলো হলো—

১. বাংলাদেশের মুসলিমরা কি ধর্মান্তরিত স্থানীয় হিন্দুদের বংশধর নাকি পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত আশরাফ মুসলিমদের বংশধর?

২. বাংলাদেশে কখন ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়?

৩. বাংলাদেশে হিন্দুরা কেন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলো?

প্রশ্নগুলো নতুন নয়। কয়েক শ বছর ধরেই প্রশ্নগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া হচ্ছে। প্রশ্নগুলো পরস্পরবিরোধীও। এখানে যে তিনটি প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তাতে প্রথমটির উত্তর তৃতীয়টিতে এমনিতেই এসে গেছে। প্রথম প্রশ্নের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মুসলিমরা ধর্মান্তরিত স্থানীয় হিন্দুদের বংশধর কি না’, তৃতীয় প্রশ্নেই জবাব হয়ে যায়, আর তা হলো—‘বাংলাদেশের হিন্দুরা কেন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলো’? অর্থাৎ বাংলাদেশের হিন্দুরা যে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছে, তা তৃতীয় প্রশ্নেই রয়েছে, তা না হলে প্রশ্ন কেন হলো যে হিন্দুরা কেন মুসলিম হলো। আর হিন্দুরা যদি মুসলিম হয়ে থাকে, সেটি যে কারণেই হোক, বাংলাদেশের মুসলিমরা ধর্মান্তরিত হিন্দুদেরই বংশধর, এতে সন্দেহ কী! এসব প্রশ্ন বেশির ভাগ এসেছে পৌত্তলিক (হিন্দু) ধর্মে বিশ্বাসী ঐতিহাসিকদের কাছ থেকেই।

প্রথম প্রশ্নটির দ্বিতীয় অংশে আরেকটি উপ-প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের মুসলিমরা পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত আশরাফ মুসলিমদের বংশধর কি না? এ প্রশ্নগুলো বারবার এসেছে কিছু তথাকথিত ‘মুসলিম’ ঐতিহাসিকের কাছ থেকেই। বিশেষ করে ইতিহাসবিদ খোন্দকার ফজলে রাব্বি, এ এ গজনবী, ড. আবদুর রহিম, ড. মোহর আলী প্রমুখের অনুসিদ্ধান্ত এই যে বাংলাদেশের মুসলিম জনসংখ্যার বেশির ভাগ পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত বহিরাগত মুসলিম অথবা তাদের বংশধারা। স্থানীয় ধর্মান্তরিতরা, যারা হিন্দু ও বৌদ্ধদের থেকে এসেছে, তাদের সংখ্যা বেশি নয়। পাঠক এ ব্যাপারে দেখতে পারেন খোন্দকার ফজলে রাব্বী : বাংলার মুসলমান (বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৬ মুদ্রণ) এবং Muhammad Abdur Rahim : Social and Cultural History of Bengal, vol. I (Pakistan Historical Society, Karachi, 1963) এবং একই গ্রন্থের vol. II (Pakistan Publishing House, Karachi, 1977), এ ছাড়া Dr. muhammad Mohor Ali : History of the Muslims of Bangal, (Riyadh, Ibn Soud Islamic University, 1985)- গ্রন্থগুলো।

এই ইতিহাসবিদদের ধারণা ইতিহাসোচিত নয়। বাংলার মুসলিমদের ইতিহাস তাঁরা জানতেন না এমন নয়। অনুমান করি, তাঁরা নানা কারণে বাংলার মুসলিমদের অভিজাত শ্রেণি থেকে আগত এমনটা দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন—

১. একটা কারণ এমন হতে পারে যে হিন্দুদের কাছে মুসলিম আভিজাত্যকে বড় করে তোলা।

২. আরেকটা কারণ হতে পারে, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি মুসলিমদের সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তার অবসান ঘটানো। আমরা এ প্রসঙ্গে দেখব, খোন্দকার ফজলে রাব্বীর গ্রন্থ ছাড়া অন্য গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়েছে, হয় পাকিস্তানের করাচি থেকে অথবা সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে।

৩. তৃতীয় আরেকটি কারণ এ হতে পারে যে এ ইতিহাসবিদরা বহুল কথিত (তথাকথিত) আশরাফ মুসলিমদের দলভুক্ত মনে করেছেন নিজেদের এবং ধারাটি বেশ শক্তিশালী ধারা—এমনটাই দেখাতে চেয়েছেন।

ফলে বুঝতে কষ্ট হয় না, উপরোক্ত তিন কারণেই অথবা যেকোনো একটি কারণেই এসব ইতিহাসবিদের ধারণাগুলো আরোপিত। আমরা এমন ধাঁচের ‘নাকউঁচা’ ‘মুসলিম নামসর্বস্ব’ ব্যক্তির সাক্ষাৎ ইতিহাসে আরো পাই। ১৮৮২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লর্ড রিপন কর্তৃক গঠিত শিক্ষা কমিশনে (হান্টার কমিশন) ‘মুসলিম রাজনীতিক’ নবাব আবদুল লতিফ লিখিত প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে মুসলিম উচ্চ শ্রেণির (তাদের ভাষায় ‘আশরাফ’) ছাত্ররা ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় লেখাপড়া শিখবে, আর নিম্ন শ্রেণির (তাদের ভাষায় ‘আতরাফ’) মুসলিম ছাত্ররা, যারা জাতিগতভাবে হিন্দুদের থেকে পৃথক নয়, তারা প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা শিখতে পারে। (বিস্তারিত : বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, অখণ্ড : ১, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৫২)

আমাদের উপরোক্ত ইতিহাসবিদরাও এ শ্রেণির মানসিকতার ছিলেন বলে বাঙালি মুসলিমদের পরিচয় প্রসঙ্গে তারা দ্বিধান্বিত ছিলেন এবং মুসলিমদের মধ্যে শ্রেণিবিভাগ করেছিলেন। ‘আশরাফ’-‘আতরাফ’ প্রকৃতপক্ষে শ্রেণিবিভাজনই এবং এ রকম বিভাজন ছিল ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। ইসলাম সাম্যবাদের ধারকবাহক। সাম্যবাদের চেতনা নিয়েই বাংলার সমাজে ঢুকেছে, ফলে তৎকালীন সমাজে বিরাজিত অসাম্যের শ্রেণিবিভাগকে চ্যালেঞ্জ করেই হিন্দু ও বৌদ্ধসমাজ দলে দলে ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছে। বাংলায়, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলিম ও হিন্দু-বৌদ্ধদের সম্মিলিত নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করলেও এর সত্যতা অনুধাবন করা যায়। আশরাফ-আতরাফ নামে শ্রেণিবিভাজন মুসলিম সমাজে পরবর্তীকালে ‘নাকউঁচু মুসলিমরা’ প্রয়োগ করে। এসব ‘নাকউঁচু’ মুসলিমের সঙ্গে তৎকালীন ব্রাহ্মণ-সামন্তদের মানসিকতার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য ছিল না।

সাহিত্য ও সমাজ গবেষক আনিসুজ্জামান সমাজের তৎকালীন আশরাফ-আতরাফ প্রসঙ্গে বলেছেন—

...আশরাফ (আরবি শরিফ শব্দের বহুবচন) অর্থাৎ অভিজাত ও আজলাফ বা আরো প্রচলিত আতরাফ (আরবি আতরাফ-উন-নাস থেকে) অর্থাৎ নিম্ন শ্রেণির মানুষ। উচ্চ শ্রেণিতে থাকতেন সৈয়দ, মোগল ও পাঠানরা...।

আতরাফ সমাজ গঠিত হয়েছিল দেশীয়—অর্থাৎ ধর্মান্তরিত মুসলমানদের দ্বারা। পেশায় এরা ছিল কারিগর, নাবিক, কৃষক প্রভৃতি।...

উচ্চ শ্রেণির মুসলমানদের মধ্যে সুরা পান ছিল সাধারণ ব্যাপার, বহুবিবাহ ছিল প্রকট...।

সমাজে এক শ্রেণির লোক বাংলা ভাষাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত এবং তারা ছিল ওই আশরাফ সম্প্রদায়ভুক্ত।

[আনিসুজ্জামান : ‘বাংলার মুসলমানদের পরিচয়-বৈচিত্র্য’ (অষ্টাদশ শতাব্দী অবধি), জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক গুণীজন বক্তৃতা, ঢাকা, ২৯ অক্টোবর ২০১৭। পৃষ্ঠা ৯, ১৩, ১৫]

মুসলিম সমাজে শ্রেণিবিভাজন পূর্বে ছিল না। ‘পূর্বে’ বলতে যখন প্রাচীন বাংলায় মুসলিমরা আসতে শুরু করল এবং ইসলাম প্রচার শুরু হলো। এটা তুর্কি শাসক বখতিয়ারের আগমনের পূর্বের জমানা, এবং কম করে হলেও পাঁচ শ বছর পূর্বের। তুর্কিদের মধ্য দিয়ে শাসক মুসলিমরা প্রথম আসতে শুরু করে, এরপর মোগল, পাঠান, আরো নানা জাতির শাসক আর এখান থেকেই মুসলিম জাতির মধ্যে শ্রেণিবিভাজন শুরু হয়। তবে উনিশ শতকের আগে তা এত তীব্র ছিল না। বিশেষ করে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের ছদ্মাবরণে যখন খ্রিস্টান রাজত্ব শুরু হয়, তখনই একদল তথাকথিত ‘উঁচু শ্রেণি’র মুসলিম এ বিভেদকে তীব্র করে তুলেছিল। আনিসুজ্জামানের ধারণাও অনেকটা এ রকম।

গত ছয় শ বছরে আত্মপরিচয়ের ধারণাটা যত তীব্র বা তীক্ষ হয়েছে, উনিশ শতকের আগে তা ছিল বলে মনে হয় না। আমরা অনেক সময় পরবর্তীকালের ধ্যান-ধারণা পূর্ববর্তীকালে আরোপ করি। (আনিসুজ্জামান : ‘বাংলার মুসলমানের পরিচয়-বৈচিত্র্য’, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২১)

এ পর্যায়ে আমরা আকবর আলি খানের প্রথম ও তৃতীয় প্রশ্নের একটা সদুত্তর পেয়ে যাই। তবে আকবর আলি খানের দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশে কখন ইসলাম ধর্ম প্রচারিত হয়’—বিষয়টি যুগপৎ কৌতূহলের ও বিস্ময়ের। কারণ এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন, তার অনেকগুলোই মীমাংসিত বিষয়, তার পরও তিনি তা পুনরাবৃত্তি করেছেন। এসব বিষয়ে তাঁর কিছু পর্যালোচনা অজ্ঞতাপ্রসূত, কিছুটা গত্বাঁধা ঐতিহাসিকদের মতো আবেগসর্বস্ব। এসব বিষয়ে তাঁর মতামতগুলো প্রথমে দেখা যেতে পারে—

১. বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ শতকে। ইসলাম ধর্মের উদ্ভবের প্রায় ৬০০ বছর পর বাংলায় মুসলমান রাজত্ব শুরু হয়। এই দীর্ঘ সময় ধরে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য মুসলমান বণিকরা কুক্ষিগত করে রেখেছিল। কাজেই মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই এখানে মুসলমান বণিকদের আনাগোনা ছিল।

২. ষষ্ঠ শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক সময়কালে আরব ভূগোলবিদদের লেখায় বাংলার উল্লেখ পাওয়া যায়।

৩. দিল্লিতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাদেশে আরব বণিকদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।

৪. পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে আরবদের মুদ্রা পাওয়া গেছে।

৫. স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে—বাংলায় মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার আগেই আরব ও পারস্য থেকে অনেক মুসলমান দরবেশ বাংলায় এসেছিলেন। (আকবর আলি খান : ‘বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রসার—ঐতিহাসিক প্রশ্নসমূহের পুনর্বিবেচনা’, জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক, গুণীজন বক্তৃতা, ঢাকা, ২৮ জুলাই ২০১৮, পৃষ্ঠা ২৩)

দেখুন, আকবর আলি খান পাঁচটি ভালো কথা বলেছেন। এর সবই ইতিহাসসম্মত। কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে তিনি এরপর আবেগের বশে লেখেন—

১. তবে এ ধরনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাংলায় ইসলাম প্রসারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখেনি।

২. এসব কিংবদন্তি সত্ত্বেও ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে বাংলায় উল্লেখযোগ্য কোনো মুসলিম বসতি গড়ে ওঠেনি। (আকবর আলি খান, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৩)

ইতিহাসের তথ্য ও সত্য—সব কিছু উদ্ধৃত করেও এভাবে আবার বেঁকে বসার ঘটনা আকবর আলি খানই প্রথম ঘটাননি। বাংলাদেশ ও ভারতে ইসলামের ইতিহাস রচনায় এ রকম আরো বহু পণ্ডিতের সাক্ষাৎ পাই, যাঁরা বরাবরই আরবের প্রচারক মুসলিমদের অবদানকে এ ক্ষেত্রে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছেন। এ বিষয়ে আকবর আলি খানের রাগ আরেকটু বেশি। আর সেটি বোঝা যায়, যখন তিনি লেখেন, ‘... দীর্ঘ সময় ধরে ভারত মহাসাগরের বাণিজ্য মুসলিম বণিকরা কুক্ষিগত করে রেখেছিল।’ এই ‘কুক্ষিগত’ শব্দ থেকে তাঁর ‘রাগ’-কে চিহ্নিত করা যায়। ‘কুক্ষিগত’ শব্দের অর্থ হলো, ‘অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছে এমন’। (বাংলা একাডেমি, সহজ বাংলা অভিধান, মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ সম্পাদিত, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ৮৫)

এখানে তিনি আরব বণিকদেরই বুঝিয়েছেন। আরব বণিকরা দীর্ঘদিন ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বাণিজ্য করেছে এ কথা সত্য; কিন্তু তারা অন্যায়ভাবে এটা করেছেন, এ কথা ইতিহাস কিন্তু বলে না। ইতিহাস বরং বলে, বন্দুকযুদ্ধ করে, সশস্ত্র ও সহিংস পথে পর্তুগিজ বণিকরা এবং ছদ্মবেশী খ্রিস্টান বাহিনী নিরস্ত্র আরব বণিকদের হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য করেছিল। এ নিয়ে প্রচুর লেখা ও গবেষণা হয়েছে, কেমন করে পর্তুগিজ আলভারেজ কাব্রাল, ভাস্কো দা গামা, অ্যালবুকার্ক প্রমুখের সশস্ত্র খ্রিস্টীয় মিশন ভারত মহাসাগর থেকে আরবদের হটিয়ে উপমহাদেশে প্রবেশ করেছে। (পাঠক এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখতে পারেন, সুরজিৎ দাশগুপ্ত ভারতবর্ষ ও ইসলাম, (ডিএম লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৯৯১) এবং সত্যেন সেন : মসলার যুদ্ধ, (দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, ২০১৬) গ্রন্থ দুটি)

আকবর আলি খানের আরেক ভাষ্য—‘ত্রয়োদশ শতাব্দীর আগে বাংলায় উল্লেখযোগ্য মুসলমান বসতি গড়ে ওঠেনি’ প্রসঙ্গে একটি উত্তর আমরা ইতিহাসবিদ সুরজিৎ দাশগুপ্তের ভারতবর্ষ ও ইসলাম গ্রন্থে দেখতে পাই। এ ইতিহাসবিদ জানিয়েছেন, ‘সাধারণভাবে যাদের আরব বণিক বলেছি, তারা সবাই যে আরব বংশোদ্ভূত ছিল, এ কথা ভাবা ভুল হবে। আর বণিকগোষ্ঠী বলতে স্থানীয় জনসাধারণের যে অংশ আরবদের বাণিজ্যিক বিষয়ে জড়িত ছিল, তাদের সবাইকে বোঝানো উচিত। আরব বাণিজ্যে লিপ্ত স্থানীয় অধিবাসীদের অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল; আবার এদের সঙ্গে আরব শোনিতের সংমিশ্রণও ঘটে।’ (সুরজিৎ দাশগুপ্ত : ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১২১-১২২)

এতে বোঝা যায়, আরবদের প্রভাব সমাজে ভালোভাবেই পড়েছিল, আরব মুসলিমরা যেমন বসতি গড়েছিল, আবার স্থানীয় বসতিগুলো মুসলিম বসতিতে পরিণত হয়েছিল। বৈবাহিক সূত্রে সংমিশ্রণ ঘটেছিল, তারাও আরব খান্দান হিসেবেই পরিচিত ছিল।

ড. এনামুল হক ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জানিয়েছেন, প্রাচীন বাংলায় (৭৮০-৮১০ খ্রিস্টাব্দে) চট্টগ্রাম-আরাকানে একটি আরব রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। (এনামুল হক ও আবদুল করিম : আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য, কলকাতা, ১৯৩৫, পৃষ্ঠা ৪)

এটি কী অর্থে আরব রাষ্ট্র, তার বিস্তারিত না থাকলেও বাংলা অঞ্চলে সেই প্রাচীনকালে আরব বসতি বা আরব-মুসলিম প্রভাবিত বসতির অস্তিত্বের সন্ধান তো আমরা পাচ্ছি। সুতরাং আকবর আলি খানের উপরোক্ত মন্তব্য একপেশে বলে মনে হয়। লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
captcha