
হায়দরাবাদের প্রখ্যাত আলেম ড. আবদুল মাজিদ ঘুরি বহুভাষাবিদ ও বিংশ শতাব্দীর চিন্তানায়ক ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহকে ‘ইউরোপে ইসলামের দূত ও ইসলামী ঐতিহ্যের অগ্রনায়ক’ হিসেবে অভিহিত করেন। প্যারিসে পাঁচ দশক অবস্থানকালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতেন তিনি। এ সময় তাঁর হাতে ৪০ হাজারের বেশি লোক ইসলাম গ্রহণ করেন বলে মনে করা হয়। ২৩ ভাষায় পারদর্শী মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ২৫০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেন।
জন্ম ও পরিবার : ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ ১৯০৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি হায়দরাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। হিজরি অষ্টম শতাব্দীতে ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তাঁর পূর্বপুরুষ ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষে ইসলামী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় ব্যাপক অবদান রাখেন। তাঁর প্রতিপিতামহ মাওলানা মুহাম্মদ গাউস শরিফুল মুলুক আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় ৩০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর দাদা কাজি মুহাম্মদ সিবগাতাল্লাহ ছিলেন একজন খ্যাতিমান আলেম ও বিচারক। তিনি মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) প্রধান বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পিতা মুফতি আবু মুহাম্মদ খলিলুল্লাহ একজন ইসলামী আইনজ্ঞ ছিলেন। হায়দরাবাদের নিজাম সরকারের রাজস্ব পরিচালকের দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি হায়দরাবাদে সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ ছিলেন।
লেখাপড়া : ১৯২৩ সালে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ হায়দরাবাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদরাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯২৮ সালে পড়াশোনা শেষ করে উসমানীয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে স্নাতক করেন। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী আইন বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। গবেষণার কাজে তিনি হিজাজ, মিসর, সিরিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। জার্মানির বন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৩২ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর পিএইচডি ডিগ্রির শিরোনাম ছিল, ‘ইসলামের আন্তর্জাতিক আইনে নিরপেক্ষতা’। ১৯৩৪ সালে জার্মানির সরবন ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
মনীষীদের সান্নিধ্য : ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তৎকালীন সময়ের বিশ্বখ্যাত আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা মানাজির আহসান গিলানি (রহ.), মাওলানা আবদুল হক, অধ্যাপক আবদুল কাদির সিদ্দিকী, অধ্যাপক আবদুল মজিদ সিদ্দিকী বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য।
কর্মজীবনে প্রবেশ : হায়দরাবাদে ফিরে এসে ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ উসামানীয় ইউনিভার্সিটিতে ধর্ম বিভাগে অতঃপর আন্তর্জাতিক আইন বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি হায়দরাবাদ সরকারের প্রতিনিধি দলের মুখপাত্র হয়ে জাতিসংঘের সমর্থন লাভে লন্ডন ও নিউ ইয়র্কে যান। সেখানে তিনি ভারতের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদের নিজাম সরকারের স্বাধীনতা কামনা করেন। কিন্তু প্রতিনিধি দলের আলোচনা কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই জোরপূর্বক হায়দরাবাদ দখল করে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। অতঃপর প্রতিনিধি দলের সব সদস্য হায়দরাবাদে ফিরে এলেও ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। প্যারিসে ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা বৃত্তি নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এ সময় তিনি তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইউনিভার্সিটিসহ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকতা করেন। তিনি ছিলেন প্যারিসে থাকা তৎকালীন হায়দরাবাদ রাজের সর্বশেষ নাগরিক। প্রবাস জীবনে ফ্রান্স ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ তাঁকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দানের প্রস্তাব দিলেও তিনি হায়দরাবাদের বাস্তুচ্যুত নাগরিক হিসেবে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ ছাড়া তিনি স্বাধীন পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা কারিকুলাম ও সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিলাল-ই-ইমতিয়াজে ভূষিত হন। পুরস্কারের অর্থ তিনি ইসলামাবাদের ইসলামিক রিসার্চ একাডেমিকে দান করেন।
গবেষণাকর্ম : ২৩ ভাষায় পারদর্শী মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ আরবি, জার্মানি, উর্দু, ফ্রেঞ্চ, তুর্কি, ফার্সি, ইংরেজিসহ মোট সাতটি ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ রচনাসম্ভার উপহার দেন। প্রথম মুসলিম হিসেবে ফরাসি ভাষায় পবিত্র কোরআনের অনুবাদ করেন, যা অদ্যাবধি মানোত্তীর্ণ অনুবাদ হিসেবে মনে করা হয়। প্যারিসে ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করেন। সেখানকার মুসলিম শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের নিয়ে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যারা ইসলাম মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে শিক্ষাদীক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা চালাবে।
মৃত্যু : ১৯৯৬ সালে মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ জীবনের শেষ সময়টুকু কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রোরিডা রাজ্যের জ্যাকসনভিলে চলে আসেন। সেখানে বসবাসরত তাঁর ভাইয়ের নাতনি সাদিদাহ আতাউল্লাহর সঙ্গে শেষ মুহূর্ত কাটান। ২০০২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিশ্বখ্যাত এ ইসলামী পণ্ডিত ইন্তেকাল করেন।