IQNA

ইমাম হুসাইনের সংগ্রামই ছিল সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম

ইমাম হুসাইনের (আ) চিরঞ্জীব মহাবিপ্লব- (পর্ব-১০) (শামে গ্বারিবান বা অসহায় মুসাফিরদের রাত)

10:42 - August 09, 2022
সংবাদ: 3472260
শোকাবহ মহররম উপলক্ষে কারবালার শাশ্বত বিপ্লব শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনার দশম পর্ব থেকে সবাইকে জানাচ্ছি সংগ্রামী সালাম ও গভীর শোক আর সমবেদনা।

আজ দশই মহররমের দিবাগত রাত বা শামে গ্বারিবান তথা অসহায় মুসাফিরদের রাত। এ রাত বিশ্ব ইতিহাসে তথা মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে শোকের রাত। কারণ এরাতের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শহীদ হয়েছেন শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ) ও তাঁর প্রায় ৭২ থেকে ১০০ জন সঙ্গী কারবালার উত্তপ্ত মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত অবস্থায়। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০ বা ২২ জন  ছিলেন নবী-পরিবারের সদস্য। ছিল ইমামের ৬  মাস বয়সী দুধের শিশু আলী আসগর। ছিল ১৩ বছরের ভাতিজা কাসেম। ছিল ইমামের ২০-২২ বছর বয়স্ক পুত্র হযরত আলী আকবর যিনি ছিলেন দেখতে অবিকল মহানবীর মত! ছিলেন ইমামের সৎভাই সৌন্দর্য ও বীরত্বের জন্য খ্যাত হযরত আবুল ফজল আব্বাস। আরও ছিলেন মহানবীর ৭৫ বছর বয়স্ক সাহাবি হাবিবে মাজাহের। ছিলেন ইয়াজিদ বাহিনী ছেড়ে আসা ওই বাহিনীর অন্যতম বড় জেনারেল হোর।

 

 তাঁদের অপরাধ ছিল এটা যে তাঁরা ইয়াজিদের খোদাদ্রোহী ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন মেনে নেননি ও ব্যভিচারী-লম্পট ইয়াজিদকে মুসলমান ও মুমিনদের নেতা বলে মেনে নিতে পারেননি! বিপুল সংখ্যক কুফাবাসী ইমাম হুসাইনকে চিঠি লিখে বলেছিল আমরা আপনার নেতৃত্বে ইয়াজিদের তাগুতি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে প্রস্তুত, আপনি এখানে আসুন ও আমাদের মুক্তি দিন ও খাঁটি ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করুন। ইমামের প্রতিনিধি যখন কুফায় এলেন সেদিন সকালেও ইমামের প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিলকে সম্বর্ধনা জানায় কুফার ত্রিশ চল্লিশ হাজার জনগণ। 

 

কিন্তু সেদিনই যখন ধর-পাকড় ও গ্রেফতার অভিযান শুরু করে ইয়াজিদি প্রশাসন এবং নিরীহ কয়েকজন বহিরাগত ব্যবসায়ীকে হত্যা করে ইমামপন্থী হওয়ার অভিযোগ এনে তখনই এই জনগণ এমন ভয় পেলেন যে দুই তিন জন ছাড়া  সেদিন সন্ধ্যায় আকিলের পাশে আরও কেউই রইল না। আকিল নৃশংসভাবে শহীদ হন ও আকিলকে সহযোগিতা করতে গিয়ে শহীদ হন হানি। তবুও ইমাম হুসাইন কুফার দিকে সফর অব্যাহত রাখেন যা তিনি  শুরু করেছিলেন ৮ জিল হজ পবিত্র মক্কা থেকে। কারণ তিনি জানতেন তাঁর আত্মত্যাগের মাধ্যমে শহীদি আন্দোলন শুরু করা ছাড়া সে যুগের মুসলমানদের মধ্যে জাগরণ আসবে না এবং নানার উম্মতকে পরিশুদ্ধ করার জন্য তাঁর দায়িত্বই সবচেয়ে বেশি।  

 

ইমাম হুসাইন (আ) চাইলে আকিলের শাহাদাতের খবর শুনে ফিরে যেতে পারতেন নিরাপদ কোনো অঞ্চলে। হয়তো ইয়েমেনের দিকে গেলে তিনি নিরাপদ থাকতেন এবং সেখানে মহানবীর আহলে বাইতপন্থীরা বিপুল সংখ্যায় ছিল। কিন্তু তখন সবাই তাঁকে বলত কাপুরুষ বা আপোষকামী! এমনকি কৌশলের অজুহাত দেখিয়ে ইয়েমেন, বসরা ও কুফার মুসলমানদের পুনরায় সুসংগঠিত করে ইমাম হুসাইন আ. ইয়াজিদ সরকারের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন বা যুদ্ধ শুরু করে সেই যুদ্ধে জিতে একটি ইসলামী সরকার গঠন করলেও ইমাম হুসাইন ও তাঁর সঙ্গীরা আজ যে মহা-সম্মান পাচ্ছেন তা পেতেন না। কারণ তখন সবাই বলত ইমাম হুসাইন ও তাঁর সঙ্গীরা ক্ষমতা লাভের জন্যই এসব কিছু করেছেন! আর বহু সেনার এক বড় বাহিনী নিয়ে যুদ্ধে জেতার মধ্যে তেমন কোনো গৌরবও অনুভব করত না কেউ।  

 

 

ইমাম শাহাদাতের কঠিন পথই বেছে নিলেন। আর সঙ্গীদেরও আগাম জানিয়ে দিলেন যে তাঁর এই কাফেলার সঙ্গী হতে হলে সবাইকে শাহাদাত ও চরম কষ্ট বা নির্যাতন সইতে প্রস্তুত হতে হবে। ফলে সুবিধাবাদীরা ইমামকে ত্যাগ করেন। ইমাম যখন মক্কা থেকে যাত্রা শুরু করেন তখন তাঁর সঙ্গে ছিল প্রায় তিন হাজার সমর্থক বা কথিত অনুরাগী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল প্রায় শ'খানেক।

 

এ অবস্থায় কুফার ইয়াজিদি গভর্নর ইবনে জিয়াদের অনুগত বাহিনীর বাধার কারণে ইমামের কাফেলা কুফার দিকে না গিয়ে কারবালায় থামতে বাধ্য হয়। এরপর ইমামের শিবিরকে ঘেরাও করতে থাকে ইয়াজিদ বাহিনী যাদের সংখ্যা আশুরার দিনে দাঁড়ায় প্রায় ত্রিশ বা তেত্রিশ হাজার।  

 

ইমাম আশুরার রাতে নিজ কাফেলার সবাইকে দায়মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়ে বলেন, ওরা তথা ইয়াজিদ বাহিনী শুধু আমাকেই চায় ও আমাকেই তারা হয় ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকারে বাধ্য করতে অথবা  আমি তা না করলে তারা আমাকে হত্যা করতে চায়। তাই চাইলেই অন্য সবাই চলে যেতে পারেন রাতের আঁধারে। 

 

কিন্তু ইমানের আগুনে পুড়ে সোনা হওয়া সেই প্রায় ১০০ জন কিছুতেই ইমাম হুসাইনকে একাকি ছেড়ে চলে যেতে রাজি হলেন না। তিনি তখন না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন। তারা তখন যা যা বললেন তার মূল কথা হল, ইমাম-বিহীন এই নিকৃষ্ট পৃথিবীতে ইয়াজিদি শাসনের মধ্যে বেঁচে থাকার কোনো মূল্য নেই!  আর সত্যের পথে মৃত্যুটা তাঁদের কাছে মধুর চেয়েও মিষ্টি। কেউ কেউ বললেন, তাঁরা ইমামের জন্য হাজার বারও মরতে রাজি। ইমাম খুব খুশি হলেন। তিনি তাঁদেরকে দেখালেন বেহেশতে তাঁদের স্থানগুলো কোথায় কোথায় হবে। ফলে ইমামের সঙ্গীদের মধ্যে ভয় ও দুশ্চিন্তা বলে আর কিছুই ছিল না। তারা যেন বেহেশতে যাওয়ার জন্যই আকুল হয়ে ছিলেন। আর তাই তারা এমন বীর বিক্রমে লড়াই করেছেন যে শত্রুরা হতবাক হয়েছিল। শত্রু সেনাদের প্রধানরা তখন বলছিল এদের সাথে মল্ল যুদ্ধ করে লাভ নেই। বিশেষ করে নবী-পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মল্ল যুদ্ধ করে লাভ নেই। একজন একজন করে লড়াই করতে গেলে আমাদের ত্রিশ হাজার বাহিনীর সবাই মরে গেলেও নবী-পরিবারের এই বীর যোদ্ধারা সবাই বেঁচে থাকবেন। তাই তাদের ওপর হামলা করতে হবে সংঘবদ্ধভাবে ও চারদিক থেকে সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে। ফলে সংঘবদ্ধ হামলার মুখে ইমাম শিবিরের প্রায় সব যোদ্ধা শহীদ হয়ে গেলেন একে একে। সর্বশেষে শহীদ হন ইমাম হুসাইন। আশুরার বিকেলে তাঁকে শহীদ করা হয়। তখন তিনি ছিলেন রণ-ক্লান্ত ও শরীরে বহু আঘাত আর ক্ষতের কারণে এবং কারবালার প্রচণ্ড গরমে পানি অবরোধের কারণে অশেষ তৃষ্ণার্ত। সে সময় মহানবীর নাতি হিসেবে শত্রুরা তাঁকে দিতে পারত একটু পানি যা যুদ্ধ বন্দীদের ক্ষেত্রে করে থাকে অমুসলিম সেনারাও। কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনী তা করেনি। বরং জীবন্ত অবস্থায় শরীর থেকে তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করে।

 

 

ইয়াজিদি সেনারা ইমামের মস্তক মুবারকসহ শহীদদের মাথাগুলো বর্শায় বিদ্ধ করে  বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে! তারা ইমামের শিবিরের প্রতিটি তাবুতে আগুন ধরিয়ে সেখানে লুটপাট শুরু করে এবং অসহায় শিশু ও নারীদেরও নানাভাবে কষ্ট দেয়। এমনকি দুধের শিশু আলী আসগর ছাড়াও নবী-পরিবারের আরও দুই একটি শিশুকেও হত্যা করে জালিম ইয়াজিদ বাহিনী। ইমামের এক শিশু কন্যার কান থেকে দুল টেনে নেয়া হয় কানকে রক্তাক্ত করে! 

 

ইমাম হুসাইন প্রচণ্ড আহত হয়েও জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর পরিবারের তাঁবুর দিকে যেতে নিষেধ করে ইয়াজিদ বাহিনীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।  তিনি বলেছিলেন, তোমাদের যদি ধর্মও না থাকে অন্তত স্বাধীনচেতা ও মুক্ত মানুষের মত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হও! কিন্তু পাশবিক হৃদয়ের অধিকারী ও মুসলমান নামধারী সেইসব পশু হৃদয়ে ইমামের বাণী কোনো প্রভাব ফেলেনি। কারণ তারা হারাম খাদ্য খেয়ে তাদের অন্তরকে ইমানশূন্য করে ফেলেছিল। 

 

মানুষ কতটা পাশবিক হলে তাঁদের নবীর নাতিকে হত্যা করে তাঁকে পানি না দিয়ে ও তাঁর তৃষ্ণার্ত দুধের শিশুকে পানি দিতে বলায় সেই শিশুকে তিরবিদ্ধ করে হত্যা করে!   ইয়াজিদ বাহিনী ইমামের লাশসহ ইমাম শিবিরের লাশের ওপর ঘোড়া দাবড়িয়ে সেসব লাশকে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল পাশবিক উল্লাসে! সেসব লাশ নগ্ন অবস্থায় মরুভূমিতে পড়ে থাকে কাফনবিহীন অবস্থায়! এরপর হাতে ও পায়ে শেকল পরিয়ে সাধারণ চোর ডাকাতের মত বন্দি অবস্থায় পায়ে হাঁটিয়ে কুফার দিকে নিয়ে যায় নবী-পরিবারের বন্দীদেরকে যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নারী  ও শিশু। শিশুদের ওপর চড় ও বেত্রাঘাত করা হয় এবং নবী পরিবারের নারীদেরকে তাদের অভ্যাস মোতাবেক যথাথভাবে হিজাব পালন করতে দেয়া হয়নি।  বন্দিদের মধ্যে একমাত্র বয়স্ক পুরুষ ছিলেন হযরত জাইনুল আবেদিন যিনি প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় হত্যার হাত থেকে বেঁচে যান। 

 

নবী-পরিবারের সঙ্গে এমন কঠোর আচরণ করেছিল খোদাদ্রোহী উমাইয়া ইয়াজিদ গোষ্ঠী কোন্ কারণে? এটা ছিল অনেকের মতে এক ঐতিহাসিক প্রতিহিংসা। ইমাম হুসাইন জানতে চেয়েছিলেন তাঁকে হত্যায় উদ্যত ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে: কোন্‌ অপরাধে তোমরা আমাকে হত্যা করতে চাও? কিংবা আমি ইসলামের কোন হুকুমটা অমান্য করেছি? তখন তাদের কেউ কেউ বলেছিল: অপরাধ হল তোমার বাবা আলীর! সে নানা যুদ্ধে আমাদের গোত্রের বীরদের হত্যা করেছিল। কাফের বীরদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে ইয়াজিদ কারবালায়! তাই সে কবিতা আবৃত্তি করে বলেছিল: আহা! আমাদের পূর্বপুরুষরা যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে তারা দেখতেন কিভাবে আমরা হুসাইনকে হত্যা করে মুহাম্মাদের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছি।

 

কারবালায় নবী-পরিবারের সঙ্গে এমন চরম পাশবিক আচরণ বিশ্বে সন্ত্রাসী তৎপরতার সবচেয়ে বড় নজির!  ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাতের দিন যে চিহ্নগুলি দেখা গিয়েছিলো তার মধ্যে একটি ছিলো আকাশ এত কালো হয়ে গিয়েছিলো যে,দিনের বেলা তারা দেখা গিয়েছিলো। যে কোন পাথর তুললে তার নিচে তাজা রক্ত দেখা গিয়েছিলো এবং তাঁর শাহাদাতে আকাশ লাল এবং সূর্য পীচের মত কালো হয়ে গিয়েছিলো। ফলে মানুষ মনে করেছিলো কিয়ামতের দিন চলে এসেছে। 

 

 

ইমাম হুসাইন শহীদ হলে মহানবীর এক স্ত্রী  স্বপ্নে দেখেন যে মহানবীর দাড়ি ও মাথা মুবারক ধুলায় ধূসরিত-সা । তিনি কারণ জিজ্ঞেস করলে হুসাইনের শাহাদাতের কথা জানান। কোনো কোনো বর্ণনায় মহানবীর কান্নার কথাও এসেছে।  

 

 ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন:  সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম হচ্ছে নিঃসঙ্গ ও প্রবাসী অবস্থায় সংগ্রাম। বন্ধু-বান্ধব ও সঙ্গী-সাথীদের হৈ হুল্লোড়ও আর সর্ব সাধারণের প্রশংসার মাঝে নিহত হওয়া তো তেমন কঠিন কিছু নয়। যখন সত্য ও মিথ্যার দুই পক্ষ মুখোমুখি হয় আর মহানবী (সা.) ও আমীরুল মুমিনীন আলী (আ.) -এর মতো কোনো ব্যক্তি সত্যপন্থী দলের নেতৃত্বে থাকেন এবং বলেন : ‘কে ময়দানে যেতে প্রস্তুত’,তখন তো সবাইই যাবে।’ 

 

মহানবী (সা.) যারা যুদ্ধের ময়দানে যাচ্ছে তাদের জন্য দোয়া করেন। তাদের মাথায় (আশীর্বাদের) হাত বুলিয়ে দেন এবং বিদায় জানান। মুসলমানরাও তাদের জন্য দোয়া করে। এরপর তারা ময়দানে যায়,জিহাদ করে এবং শহীদ হয়। এটা হচ্ছে একধরনের নিহত হওয়া ও একধরনের জিহাদ। আরও একধরনের জিহাদ আছে যখন মানুষ যুদ্ধের ময়দানে আসে,অথচ পুরো সমাজই তাকে অস্বীকার করে অথবা তার ব্যাপারে উদাসীন অথবা তাঁর থেকে দূরে থাকে কিংবা তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। যারা তাঁকে অন্তরে অন্তরে প্রশংসা করে তাদের সংখ্যাও কম,তারা এমনকি মুখেও তাদের প্রশংসা জানানোর সাহস পায়না। অনেক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিও ইমাম হুসাইনের নামে স্লোগান দেয়ার সাহস পাননি। 

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেছেন, ইমাম হুসাইনের সংগ্রামই হল নিঃসঙ্গ ও প্রবাসী অবস্থায় সংগ্রাম তথা সবচেয়ে কঠিন সংগ্রাম। সবাই শত্রু, এমনকি  প্রায় সব বন্ধুরাও তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়! এর চেয়ে বড় নিঃসঙ্গ ও অসহায় সংগ্রাম আর আছে কি? সেই অহসায় নিঃসঙ্গ সংগ্রামে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জনদের নিজের চোখের সামনে কুরবানি হতে দেখেছেন তিনি। তাঁর পুত্রগণ, ভ্রাতুষ্পুত্রগণ, ভ্রাতৃবৃন্দ, চাচাত ভাইরা। বনী হাশেমের ফুলগুলো তাঁর সামনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ঝরে পড়ছে, এমনকি তাঁর ছয় মাসের শিশু পুত্রও নিহত হচ্ছে। তিনি এও জানেন যে,তাঁর পবিত্র দেহ থেকে প্রাণ বের হওয়া মাত্রই তাঁর নিরাশ্রয় নিরস্ত্র পরিবার-পরিজনও হামলার শিকার হবে, তাঁদের সম্পদ লুট হবে ও তাঁদের অবমাননা হবে। 

 

এ সব ক্ষুধার্ত নেকড়েরা কিশোরী ও তরুণীদের চারপাশে হানা দেবে,তাঁদের অন্তরকে ভীতসন্ত্রস্ত করবে,তাঁদের ধন-সম্পদ লুটপাট করবে,তাঁদেরকে বন্দি করবে,তাঁদের অবমাননা করবে,আর আমীরুল মুমিনীনের মহীয়সী কন্যা হযরত যাইনাবের সামনে বেয়াদবি করবে। ইমাম হুসাইন (আ.) এসব কিছুই জানেন। এ ছাড়াও তিনি নিজে এবং তার পরিবার-পরিজন সকলেই তৃষ্ণার্ত;ছোট ছোট শিশু,ছোট ছোট মেয়ে,বয়স্ক,দুগ্ধপোষ্য শিশু সকলেই তৃষ্ণার্ত। ভেবে দেখুন,এ সংগ্রাম কত বেশি কঠিন!

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মতে,  এরকম  সুমহান নুরানি ব্যক্তি যার উজ্জ্বল প্রতিভাস এক ঝলক দেখতে আকাশের ফেরেশতারা প্রতিযোগিতায় নামেন ও  যাকে একনজর দেখতে পাওয়ার আশা ও তাঁর মাকাম লাভের আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর অনেক নবী ও ওয়ালিরাও করতেন সেই মহাপুরুষ এত কঠিন ও কষ্টকর সংগ্রামেই শাহাদাত বরণ করেন। তাই কোনো মানুষের পক্ষে কি সম্ভব তাঁর জন্য বেদনার্ত না হওয়া? এ হচ্ছে শোকের অনন্ত ঝরনাধারা যা আশুরার দিন থেকে শুরু হয়েছে। সেই সময় থেকে যখন হযরত যাইনাব মহানবী (সা.) -কে সম্বোধন করে বলে ছিলেন : 

 

 ‘হে রাসূলুল্লাহ (সা.) আপনার ওপর আকাশের ফেরেশতাগণের দরুদ,এ হলো আপনার হুসাইন,রক্তরঞ্জিত-কর্তিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ,লুণ্ঠিত পাগড়ি ও বস্ত্র’ এবং আপনার কন্যারা বন্দী হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি! তখন থেকেই তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শোকগাঁথা পড়তে এবং এ ঘটনা উচ্চস্বরে বলতে শুরু করেন যদিও ক্ষমতাসীন মহল এ ঘটনাকে গোপন রাখতে চেয়েছিল। সবাইকে আবারও গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে আজকের এই আলোচনা এখানেই শেষ করছি।  পার্সটুডে

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
captcha