
ইবনু আব্বাস (রা.) (আয়াতের ব্যাখ্যায়) হজের মৌসুমে কথাটুকুও পড়লেন।
(বুখারি, হাদিস : ২০৫০)
এই তিন বাজারের মধ্যে প্রথম বাজার উকাজ। এটি তায়েফ থেকে দক্ষিণদিকে ৪০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত।
ধারণা করা হয়, এটি ৫০১ খ্রিস্টাব্দে চালু হয়। উকাজ মেলায় কবিতা ও সাহিত্যের যে আসর বসত, তার ওপর কবি ও সাহিত্যিকদের বিজয়ী ঘোষণা করে সে জন্য পুরস্কার বিতরণ করা হতো।
বিজয়ীদের কবিতা ও সাহিত্যগুলো বর্তমান সময়ের দেয়ালিকার মতো পবিত্র কাবাঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো।
তিন বাজারে বাণিজ্য শেষে হজসাহিত্য পাঠ, কবিতা আবৃত্তি, বাগ্মিতা এবং কাব্যপ্রেম ছিল উকাজ মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
সেখানে জিলকদ মাসের শুরু থেকে ২০ দিন এই বাজার চলত। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, অর্ধ মাস পর্যন্ত সেখানে থাকত।
পরে তারা মাজিন্নায় আসত। এটি মক্কার নিম্নভূমিতে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। সেখানে তারা ২০ জিলকদ থেকে মাসের শেষ অবধি অবস্থান করত।
অতঃপর তারা জিলহজ মাসে জুল-মাজাজে যেত। জুল মাজাজ আরাফার সন্নিকটে জাবালে কাবকাবের নিচে অবস্থিত।
সেখানে জিলহজ মাসের এক থেকে আট দিন অবস্থান করত। তারপর তারা হজে যেত। হজের কাজগুলো জাহেলি প্রথা অনুযায়ী শেষ করত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের সূচনালগ্নে হজের দিনগুলোতে এই বাজারে এসে মানুষকে দাওয়াত দিতেন, ‘হে মানুষ, বলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তোমরা সফল হয়ে যাবে।’
আর আবু জাহল নবীজির পেছনে পেছনে আসত আর বলত, হে মানুষ, তোমরা বলো, লাতের কসম, উজ্জার কসম, তোমরা সফল হয়ে যাবে।
জাহেলি যুগে আরবের লোকেরা হজের দিনগুলোর সূচনালগ্নে ইয়াওমুত তারবিয়াতে মিনায় চলে আসত। এখানে এসে তারা বাপ-দাদা ও বংশীয় আভিজাত্য নিয়ে পরস্পর গর্ব করত। ইসলাম ধর্মেও মিনায় অবস্থান চালু রাখা হয়েছে। এর কারণ সম্পর্কে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলভি লিখেছেন, ইসলাম যেকোনো গণজমায়েত ও মানুষের ঐক্য সমর্থন করে। মুসলমানদের ঐক্য ও জমায়েত ইসলামের শক্তি ও শান-শওকত প্রকাশ করে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) হজের শুরুতে মিনায় অবস্থানকে বৈধ ঘোষণা করেছেন। তবে জাহেলি যুগের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও বংশীয় দাম্ভিকতা প্রকাশের পরিবর্তে মিনায় বেশি বেশি আল্লাহর নাম নেওয়া নির্দেশ দিয়েছেন। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা : ২/৯৩)
এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতঃপর যখন তোমরা হজের অনুষ্ঠান সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহকে এমনভাবে স্মরণ করবে যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করতে অথবা তার চেয়ে বেশি স্মরণ...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০০)
আলোচ্য আয়াতে পিতৃপুরুষের মতো আল্লাহকে স্মরণ করার কথা বলে জাহেলি প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কেননা হজ শেষ হলে তারা মিনায় একত্র হয়ে কবিতা, লোকগাথা ইত্যাদির মাধ্যমে পূর্বপুরুষদের শৌর্যবীর্য বর্ণনার প্রথা ছিল। পরে নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করতে বলা হয়েছে।
ইসলামের আগমনের পরে লোকেরা উকাজ, মাজিন্না ও জুল মাজাজ বাজারে যাওয়া এবং হজের মাসে ব্যাবসায়িক কাজ করা পাপ মনে করতে লাগল। এই মর্মে অবতীর্ণ হলো, ‘তোমাদের রবের অনুগ্রহ তালাশে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৯৮)