
হজ ইসলামের ফরজ ইবাদত। সারা পৃথিবীর মানুষ হজব্রত পালন করার জন্য মক্কা-মদিনায় উপস্থিত হন। বিভিন্ন যুগে মানুষ নানা উপায়ে হজ যাত্রা করেছেন। ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় এসব হজ যাত্রার বিবরণে উঠে এসেছে হাজিদের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা।
উঠে এসেছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি তাদের ভালোবাসা, দীর্ঘ সফরের কষ্ট, বিপদ-আপদের আশঙ্কা ও ভয়, পবিত্র ভূমি স্পর্শ করার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। যেদিকে ইঙ্গিত করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৭)
স্পেন থেকে হজ যাত্রা
স্পেন থেকে হাজি কিভাবে মক্কায় পৌঁছত তার বর্ণনা ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ ইবনে জুবায়ের আন্দুলুসি তাঁর ‘আদাবুর রিহলাত’ গ্রন্থে দিয়েছেন। ৮ শাওয়াল ৫৭৮ হিজরি ইবনে জুবায়ের স্পেনের গ্রানাডা থেকে হজ যাত্রা শুরু করেন।
এ সফরে বন্ধু আহমদ বিন হাসান তাঁর সঙ্গী হন। তাঁরা গ্রানাডা থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে মরক্কো হয়ে মিসরের ইস্কান্দারিয়া শহরে পৌঁছান। পথে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ অতিক্রম করেন। সেখান থেকে লোহিত সাগর অতিক্রম করে জেদ্দায় বন্দর করেন।
তিনি তাঁর বইয়ে উত্তাল সমুদ্রের বর্ণনা দেন। সমুদ্র অনবরত জাহাজে আঘাত করছি। সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার কারণে স্পেনের একটি হজযাত্রী দলের প্রায় ছয় মাস লেগেছিল স্পেনে পৌঁছাতে।
ইবনে জুবায়ের কয়েক মাস মক্কায় এবং কয়েক সপ্তাহ মদিনায় অবস্থান করেন। তিনি তাঁর বইয়ে মক্কা-মদিনার অবস্থা বর্ণনা করেন।
হেরেমের বাজার স্থাপনকারীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফেরার সময় তিনি নাজদ, কুফা, বাগদাদ, মসুল, তিকরিত হয়ে শামের পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছান। শামের বিভিন্ন শহর পরিদর্শন করে বাণিজ্যিক জাহাজে সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। সেখান থেকে সমুদ্র পথে গ্রানাডা যান। তার এই সফর ছিল প্রায় তিন বছরব্যাপী।
আফ্রিকা থেকে হজ যাত্রা
আফ্রিকার হজযাত্রীরা সবচেয়ে দূরত্বের ও বিপত্সংকুল পথ অতিক্রম করে মক্কা-মদিনায় পৌঁছাতেন। প্রাচীনকালে আফ্রিকার বেশির ভাগ হজযাত্রী স্থলপথে মরক্কো, লিবিয়া ও আলজেরিয়ার সামুদ্রিক বন্দরে উপস্থিত হতো। অতঃপর ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে মিসরের ইস্কান্দারিয়াতে পৌঁছাত। সেখান থেকে লোলিত সাগর পাড়ি দিয়ে জেদ্দায় পৌঁছাত। আফ্রিকার অন্য হজযাত্রীরা সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করে সুদানে পৌঁছাত। সেখান থেকে তারা মিসরে আসত। আফ্রিকান হজযাত্রীদের সবাই নৌপথে মক্কা-মদিনায় যেত না। তাদের একদল মিসর হয়ে স্থল পথে সেখানে যেত। তবে ক্রুসেড যুদ্ধের সময় তারা স্থল পথের পরিবর্তে নৌপথ ব্যবহার করত।
তুর্কিদের হজ যাত্রা
ঐতিহাসিকভাবে উসমানীয়দের হজ যাত্রা শুরু হতো ইস্তাম্বুল থেকে। হজ কাফেলা আনাতোলিয়া ও সিরীয় মালভূমি অতিক্রম করে দামেস্ক হয়ে মক্কায় পৌঁছাত। এটা ছিল একটি রাজকীয় হজ যাত্রা। কয়েক মাস আগে থেকে এর প্রস্তুতি শুরু হতো। উসমানীয় সুলতান হাজিদের উপহার দিতেন এবং মক্কা-মদিনার জন্য নির্ধারিত নজরানাও তাদের কাছে বুঝিয়ে দিতেন। সুলতান নিজে উপস্থিত থেকে তাদের বিদায় দিতেন। সুলতানের পক্ষে সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী নিযুক্ত করা হতো। নিরাপত্তা ও সার্বিক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে বলকান, ককেসাস, সিরিয়া, ইরাক—এমনকি মধ্য এশিয়ার হাজিরা এই কাফেলার সঙ্গে যুক্ত হতো। হাজিরা স্থল ও নৌপথে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দামেস্কে এসে কাফেলার জন্য অপেক্ষা করত। কেউ কেউ রমজানেই দামেস্ক পৌঁছে যেত। দামেস্কে হাজিদের অবস্থানের জন্য বিশেষ মেহমানখানা ও আশ্রয়কেন্দ্র ছিল। কাফেলার সার্বিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য একজন আমিরুল হজ নিযুক্ত করা হতো। ১৯০০ সালে হাজিদের সুবিধার্থে সুলতান আবদুল হামিদ আনাতোলিয়া থেকে মদিনা পর্যন্ত রেললাইন তৈরির নির্দেশ দেন। দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত যার নির্মাণকাজ শেষ হয়। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রেললাইনের কাজ থেমে যায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে হজ যাত্রা
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হাজিরা প্রধানত সমুদ্র হতে হজে যেতেন। তাঁরা সিঙ্গাপুর, মোম্বাই, কলকাতা, করাচি, জাভা প্রভৃতি বন্দর থেকে হজ যাত্রা শুরু করতেন। পথে এডেন, মাস্কাট, কুসাইর ও পোর্ট সুদান প্রভৃতি বন্দরে যাত্রা বিরতি দিতেন। অতঃপর জেদ্দা সমুদ্রবন্দর থেকে মক্কায় যেতেন। ভারতের মোগল সম্রাটরাসহ অন্য মুসলিম শাসকরা হজ কাফেলা ও হাজিদের বহনকারী জাহাজগুলোকে আর্থিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা করতেন। করাচি ও মোম্বাই বন্দর থেকে সবচেয়ে বেশি হাজি যাত্রা শুরু করতেন। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে হাজিরা আরব সাগর ও লোহিত সাগর হয়ে জেদ্দা যেতেন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ভুপালের রাজকন্যা স্কান্দারিয়া বেগম এক হাজার সহযাত্রী নিয়ে হজে যান। তিনি মোম্বাই থেকে তিনটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন এবং তিন সপ্তাহ পর বড় ধরনের বিপদ ছাড়াই জেদ্দা পৌঁছান। তিনি মক্কার অভিজাত ও সাধারণ মানুষকে উপহার দেওয়ার জন্য চারটি নৌকা বোঝাই করে ধন-সম্পদ নিয়ে যান এবং সেখানে ছয় সপ্তাহ অবস্থান করেন। হজ যাত্রায় আটজন যাত্রী পথে ইন্তেকাল করেন।
ছিল নিরাপত্তা ঘাটতি ও বিরল মর্যাদা
প্রাচীনকালে যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় পথে হাজিরা বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতেন। শহর অঞ্চলে তাদের যেমন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান হতো, গ্রাম ও মরু অঞ্চলে তাদের সর্বস্ব লুট করে নেওয়া হতো। বিশেষত মরু অঞ্চলে যাযাবর উপজাতিগুলো হজকাফেলা ডাকাতি করত। শাসকরাও ছিল তাদের কাছে অসহায়। এ ছাড়া মরুভূমিতে যারা পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করত, তারাও নানা উপায়ে হাজিদের অর্থ হাতিয়ে নিত। এ জন্য হাজিরা সাধারণ স্থলপথ এড়িয়ে চলত। হাজিদের বহনকারী জাহাজে জলদস্যুরা হানা দিলেও তা ছিল স্থল ভাগের তুলনায় অনেক কম। তবে যারা এত কষ্ট ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে হজ সম্পন্ন করে দেশে ফিরত, তারা বিরল সম্মাননা লাভ করত। আমৃত্যু তাদের মর্যাদার চোখে দেখা হতো।
ইসলাম অনলাইন ডটনেট অবলম্বনে