IQNA

বাংলাদেশের আদিবাসী পাঙাল মুসলমান

23:16 - December 23, 2023
সংবাদ: 3474822
ইকনা: বাংলাদেশি পাঙালরা বিশ্বাসে মুসলমান হলেও পরিচিতিতে আদিবাসী। বাঙাল শব্দের বিকৃত রূপ। ঐতিহাসিকভাবে মৈতৈ আদিভাষার শব্দ পাঙাল, পানগাহাল অর্থ মুসলিম বা মণিপুরি মুসলিম। ভারতের আসাম, কাছাড়ে, তারা ‘মেই-মোগলাই’ (মুঘল মৈতৈ) নামে পরিচিত।
পাঙালদের বসবাস বৃহত্তর সিলেটে। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল গ্রামে আছে পাঙালদের প্রথম মসজিদ, যা ৩০০ বছরের প্রাচীন।
জনশ্রুতি আছে, পাঙালদের আদি পিতা মুসলিম এবং আদি মাতা মণিপুরি। পাঙালি ধমনিতে প্রবাহিত মুঘল বা তুরকো-মঙ্গোল তৈমুরি, আফগানি, ইরানি বংশধারা।
আদিতে সাদা চামড়াযুক্ত, কথা বলত চীনা-তিব্বতি ভাষায়, তারা বড় পাগড়ি, বড় পিতলের কানের দুল (টুনকাল) পরত।
মণিপুরে কখন ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটে তা নিয়ে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে, ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে। অনেকের মতে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে।
 
ভাষাগত ও ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশে মণিপুরিরা তিনটি শাখায় বিভক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙন। এর মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়ার সংখ্যাই বেশি। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ হিন্দু ধর্মে এবং পাঙনরা মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী। সব মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার।
শাখা তিনটি হলেও সব মণিপুরির প্রায় একই সংস্কৃতি। তাদের ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এ দেশে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। বাংলাদেশ মণিপুরি মুসলিম ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন কর্তৃক ২০১৯ সালের শুমারি অনুযায়ী, পাঙালের জনসংখ্যা ১০ হাজার ৯৪৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ পাঁচ হাজার ৬৩৮ জন ও নারী পাঁচ হাজার ৩০৯ জন। নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য আজও বজায় রেখেছে তারা, রয়েছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মণিপুরিদের সঙ্গে তাদের মিল আছে। তাদের ধর্ম ইসলাম। পাঙালদের ঘরবাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্র্যময়। এই সমাজে ভিক্ষুক নেই। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা থাকে সব সময়ই। বেশির ভাগ পাঙাল কৃষিকাজে নিয়োজিত এবং নারীরা তাঁতে কাপড় বুনিয়ে টাকা উপার্জন করে।
পাঙালদের বৈশিষ্ট্য
১. গোত্র বা সাগৈ : পাঙালদের ৭৩টি গোত্রের মধ্যে আছে- আরিবম, ময়চিং, ময়নাম, নবাব, সারা, লাবুকতং, সাংগমসুম্বা, কাইথেল ইত্যাদি।
২. ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ি: সব বাড়িই কারুকার্যমণ্ডিত কাঠের। পূর্ব-পশ্চিমমুখী বাড়িকে ‘সাংগাই’ এবং উত্তর-দক্ষিণমুখী বাড়িকে ‘সাংফাই’ বলে। কক্ষগুলোর নাম পিবা কা (ছেলের কক্ষ), নিঙোল কা (মেয়ের কক্ষ), মাইবা কা (মা-বাবার কক্ষ), ফামুং কা (বাসর ঘর), ফুংগা (রান্না ঘর)।
৩. বিয়েশাদি : পাঙাল বিবাহরীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমাজে ঘটক নেই। আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও দেনমোহরসংক্রান্ত কথাবার্তাকে ‘হায়জাবা কাবা’ বলে। বাগদান অনুষ্ঠান ‘কাপুবা’ বা পানচিনি।
বিয়ের আগে রাতব্যাপী বর-কনের বাড়িতে আলাদাভাবে ‘পুরজাক’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কনের পরনে ‘কমিন’ (বিশেষ ধরনের পোশাক), খেমচি ব্লাউজ ও মাথায় ফুলের ঝালরের ‘লৈত্রে’ সঙ্গে থাকে স্বর্ণালংকার। যুবক-যুবতীদের গানের উৎসব ‘থাবালচোংবা’ (নৃত্য)।
পরের দিন বর পায়জামা, পাঞ্জাবি, শেরোয়ানি ইত্যাদি পরিধান করে। মা-বাবা ও মুরব্বিদের দোয়া নিয়ে ঐতিহ্যবাহী চাদর ‘কাংথমফিদা’য় পা দিয়ে বন্ধুবান্ধব ও বাধ্যতামূলকভাবে পঞ্চায়েতের লোকজন নিয়ে বরযাত্রী রওনা দেয়। কনের বাড়ির উঠানে কাংথমফিদায় বরযাত্রী বসে। মসজিদের ইমাম মুসলিম রীতিতে বিয়ে পড়ান। তিনজন ‘গাওয়া-উকিল’  (১ জন উকিল, ২ জন সাক্ষী) থাকে। এরপর হয় ‘ঙাইসেল-খাংনাবা’ অর্থাৎ অতিথিদের দাওয়াত ও পরিচয়পর্ব।
৪. পোশাক-পরিচ্ছদ: পাঙাল পুরুষরা শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি, পায়জামা, লুঙ্গি ইত্যাদি পরিধান করে। নারীরা তাঁতের তৈরি ফানেক (পরনের কাপড়), খুদাই/ইন্নাফি (ওড়না), ব্লাউজ পরিধান করে। অবিবাহিত নারীরা লাই, সালু, হাংগামপাল, সোনারং, চুমহাপ্পা, মাকং ইত্যাদি ফানেক পরে। বিবাহিত মহিলারা রংবেরঙের- লৈফানেক আরোলবা, মায়ায়রনবি, সালু ফানেক আরোলবা, লৈচিল, হৈরেং আরোলবা, উরেং চুমহাপ্পা ইত্যাদি পরিধান করে। কোমরে প্যাঁচানো খোয়াং নাম্ফি (ছোট কাপড়), বিবাহিত মহিলারা বোরকা ও ছাতার মাধ্যমে অপরের দৃষ্টির আড়ালে থাকে।
৫. শিশুদের নামকরণ : পাঙাল শিশুদের নামকরণে আছে নিজস্বতা। ছেলেদের নাম- আচাউ, আবুং, আমুদল, আমুচাউ, আঙাউ, চাউরেল, মুরেল, মাজাউ, পিশাক, মুথই ইত্যাদি। মেয়েদের নাম- ইবেমহাল, ইবেথই, সানাতম্বি, সানানু, সানারাই, থরো, লেহাউ, জাউবি ইত্যাদি। বর্তমানে অগ্রসর পরিবারে শিশুদের আরবি নামও রাখা হচ্ছে।
৬. গানবাজনা : পাঙালদের ঐতিহ্যবাহী গান-কাসিদা (ফারসি ভাষা), ইন্দারসাফা (উর্দু ভাষা), খুনুং, খুলং, জাগোই, থাবাল, মারিফত, কাওয়ালি, নাত, গজল, আসেমবা (স্বরচিত), ওয়ারি লিবা (গল্প বলা) ইত্যাদি। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া গান পরিবেশন ও পাল্টাপাল্টি গানের প্রতিযোগিতা হতো।
৭. পাঙাল খেলাধুলা : খেলাধুলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুক্না (কুস্তির মতো), কাংজাই (হকির মতো), কাং ইত্যাদি।
৮. পঞ্চায়েত ব্যবস্থা : পাঙাল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা খুবই সুদৃঢ়। সব অনুষ্ঠান, যেমন- আকিকা, চল্লিশা (নুফনি), গর্ভবতী মহিলার খানা (থা মাপ্পাল), বার্ষিক শিরনি (কুম), তোসা শিরনি (চিনি ময়দা ঘিয়ের তৈরি) মাঙাম, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গরু ও মুরগির মাংসের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী তরকারি ‘য়ামথাকপা’ (হালিমের মতো), ‘এরি’ (মাংসের ঝোল) পরিবেশন পঞ্চায়েতের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। সব শিরনিতে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই মাদুরে (ফিদা) বসে এবং পঞ্চায়েতের মুরব্বির বিসমিল্লাহ বলার পর, বিসমিল্লাহ পড়ে সবাই খাওয়া শুরু করে। অনুষ্ঠানের উপাদানাদি সব কিছু পঞ্চায়েতের উদ্যোগে জোগাড় হয়।
৯. মৃত্যু সংবাদ প্রচার : পাঙালদের কেউ মারা গেলে সবাইকে সংবাদ পৌঁছানো পঞ্চায়েতের দায়িত্ব। মানুষ মারা গেলে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা, গরিব-দুঃখীদের মধ্যে চাল, টাকা বিতরণ এবং রাতের বেলা কেউ মারা গেলে রাত জেগে দোয়া-দরুদ পড়া, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দাফন-কাফনসহ সব কিছু পঞ্চায়েত সম্পাদন করে।
১০. নারীদের পর্দা : মণিপুরি মুসলিম নারীরা চেহারা ও সারা শরীর পুরোপুরি ঢেকে বোরকা পরিধান করে। ক্ষেত্রবিশেষে বোরকার চোখের অংশে জাল দেওয়া থাকে, যাতে তারা দেখতে পারে। কালো ছাড়াও বিভিন্ন রঙের বোরকা হয়।
পরিশেষে কালের বিবর্তনে পাঙাল ঐতিহ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাদের প্রাচীনতম মসজিদটিও নদীগর্ভে বিলীনের অপেক্ষায়। পাঙাল ভাইদের রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ সময়ের দাবি।
সূত্র : ১. Manipur, Past and Present: The Heritage and Ordeals of a Civilization. Mittal Publications।
২. মণিপুরি মুসলিম বিডি
৩. গণচিত্র, বাংলাদেশের ‘পাঙ্গাল’ জাতিগোষ্ঠী
৪. বাংলাদেশের বিপন্ন আদিবাসী (ফেব্রুয়ারি ২০০৪) – সঞ্জীব দ্রং
৫. বিবিধ
 
 
captcha