IQNA

ইমাম আলীর (আ) বিশেষ দশ ফযীলত ( শ্রেষ্ঠ ও অনবদ্য গুণ ও বৈশিষ্ট্য )

10:38 - January 15, 2025
সংবাদ: 3476708
ইকনা- সাইয়েদ আল আওহাদ আবূ হামযাহ ইবনে মুহাম্মাদ আয যাইদী আমাদেরকে বর্ণনা ( তাহদীস ) করেছেনঃ আমাদেরকে আবুল হাসান  আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মেহরাভেইহ আল – ক্বাযভীনী আল – ক্বাত্ত্বান বর্ণনা করেছেনঃ আমি আবূ হাতেম আর – রাযীকে বলতে শুনেছিঃ আহমাদ ইবনে হাম্বলের বর্ণনা থেকে  ( হযরত আলীর ) এতসব ফযীলতের সন্ধান পাওয়াটা তাদেরকে ( রাবী ও হাদীস শাস্ত্রবিদগণ ) অত্যন্ত আশ্চর্য্যাম্বিত ও বিস্মিত করত ।

আমর ইবনে মাইমূন বলেছেনঃ আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের কাছে উপবিষ্ট ছিলাম । ঠিক তখন ৯ জন পুরুষ ব্যক্তির একটি দল  তাঁর কাছে এসে বললঃ হে ইবনে আব্বাস ! হয় আপনি আমাদের সাথে উঠুন অথবা এদের মধ্য থেকে ( আলাদা হয়ে) আমাদের সাথে একান্ত নিভৃতে বৈঠক ( খালওয়াত ) করুন । আমর বলেনঃ অতঃপর ইবনে আব্বাস বললেনঃ বরং আমি তোমাদের সাথেই উঠছি । তিনি ( আমর ) বলেনঃ তিনি ( ইবনে আব্বাস ) তখন সুস্থ দৃষ্টি শক্তির অধিকারী ছিলেন অর্থাৎ ( এ ঘটনা ) তাঁর অন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে ।  আমর ইবনে মাইমূন বলেনঃ তারা কথা বলা শুরু করল , আমরা জানি না যে তারা কী বলেছিলে ?  আমর বলেনঃ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কাপড় ঝাড়া দিয়ে এ কথা বলতে বলতে ফিরে আসলেনঃ হায় আক্ষেপ ! এরা এমন এক ব্যক্তিকে গালি দিচ্ছে যাঁর ৯-১০টা এমন ফযীলত ( গুণ , বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ) আছে যেগুলো অন্য কারো নেই । এরা এমন এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছে যাঁর সম্পর্কে মহানবী ( সা ) বলেছেনঃ “ আমি এমন এক ব্যক্তিকে ( খায়বারের রণাঙ্গনে ) পাঠাচ্ছি যাঁকে মহান আল্লাহ কখনোই হেয় ও অপদস্থ করবেন না , তিনি মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসেন এবং মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাঁকে ভালোবাসেন । “ সম্মান লাভের আকাঙ্খী ব্যক্তিরা এ দুর্লভ সম্মান পাওয়ার আকাঙ্খী হলে তিনি ( সা ) বললেনঃ “ আলী কোথায় ? “ তখন বলা হলঃ “ তিনি যাঁতাকলে গম পিসে আটা করছেন । “ তিনি ( সা ) বললেনঃ “ যাঁতাকলে গম পিসে আটা করার জন্য কেউ নেই কি ? “  ইবনে আব্বাস বলেনঃ “ অতঃপর তিনি ( আলী ) আগমন করলেন সেখানে এমন অবস্থায় যে তিনি চোখ ওঠা রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না । “  ইবনে আব্বাস  বললেনঃ “ অতঃপর রাসূলুল্লাহ ( সা) তাঁর দুচোখে মুখের লালা লাগিয়ে দিলেন এবং এরপর তিনবার পতাকা ঝাকিয়ে তাঁর হাতে সোপর্দ করলেন । আর আলী (আ) ( খাইবর দুর্গ জয় করে ) সাফীয়া বিনতে হুওয়াইকে নিয়ে (মহানবীর সা কাছে ) প্রত্যাবর্তন করলেন ।” ইবনে আব্বাস বললেনঃ অতঃপর রাসূলুল্লাহ ( সা ) অমুক ব্যক্তিকে সূরা-ই তওবা সহ পাঠালেন । কিন্তু তিনি ( সা ) আলীকে তাঁর পিছনে পাঠিয়ে দিলেন , অতঃপর তিনি ( আলী ) সূরা - ই তওবা তার কাছ থেকে নিয়ে নিলেন এবং রাসূলুল্লাহ ( সা ) তখন বললেনঃ “ একমাত্র ঐ ব্যক্তি পারবে এই সূরা নিয়ে যেতে ( ও তা প্রচার করতে ) যে আমার থেকে এবং আমিও তার থেকে । “
    ইবনে আব্বাস বললেনঃ মহানবী ( সা) তাঁর পিতৃব্য পুত্রদেরকে বললেনঃ “ তোমাদের মধ্য থেকে কে আমাকে দুনিয়া ও আখেরাতে  আমার সাথী ও  সহযোগী হবে ? “ আর আলীও তখন তাদের সাথে সেখানে উপবিষ্ট ছিলেন । এ কথা বলার পর রাসূলুল্লাহ ( সা ) তাদের প্রত্যেকের কাছে এসে বলতে লাগলেনঃ “ তোমাদের মধ্য থেকে কে আমার সহযোগী ও সাহায্যকারী হবে ? “  কিন্তু তারা সবাই প্রত্যাখান করলে তিনি ( সা) আলীকে বললেনঃ “ তুমি দুনিয়া ও আখেরাতে আমার ওয়ালী  ( সহযোগী , সহকারী ও সাহায্যকারী ) । “
أنت ولیي في الدنيا و الآخرة .
ইবনে আব্বাস বললেনঃ খাদীজার পরে  আলী ছিলেন জনগণের মধ্যে যারা ঈমান এনেছিল তাদের ( মধ্যে ) প্রথম ব্যক্তি ।
و کان علي أوّل من آمن من الناس بعد خديجة ( رض ) 
ইবনে আব্বাস বললেনঃ রাসূলুল্লাহ ( সা ) স্বীয় বস্ত্র ( চাদর ) আলী , ফাতিমা , হাসান ও হুসাইনের ওপর টেনে ও ঢেকে দিয়ে বলেছিলেনঃ “ নিশ্চয়ই আল্লাহ চান হে আহলুল বাইত ! তোমাদের থেকে পাপপঙ্কিলতা ( রিজস ) দূর করতে এবং তোমাদেরকে পবিত্র করার মতো ( পূর্ণ রূপে ) পবিত্র করতে । “
ইবনে আব্বাস বললেনঃ আর আলী স্বীয় জীবনকে বেঁচে দিয়ে ( অর্থাৎ বিপন্ন করে ) মহানবীর ( সা ) বিছানায় শুয়েছিলেন ( হিজরতের রাতে [ লাইলাতুল মাবীত ] ) । ইবনে আব্বাস বললেনঃ আর মুশরিকরা সেই রাতে রাসূলুল্লাহকে ( সা ) ঢিল ছুড়ে মারছিল । আলী রাসূলুল্লাহর ( সা ) বিছানায় যখন শুয়ে ছিলেন তখন হযরত আবু বকর সেখানে আসলেন । তিনি ( ইবনে আব্বাস ) বললেনঃ আর আবু বকর ভেবেছিলেন যে তিনি ( আলী ) রাসূলুল্লাহ । ইবনে আব্বাস বললেনঃ আবু বকর বললেনঃ “ হে নবীয়াল্লাহ ! “ তখন  তাঁকে আলী বললেনঃ “ মাইমূনার কূঁয়োর দিকে রাসূলুল্লাহ ( সা ) বের হয়ে গেছেন । অতঃপর আপনি সেখানে গিয়ে তাঁর সাথে মিলিত হন । “ তিনি ( ইবনে আব্বাস ) বললেনঃ অতঃপর আবুবকর চলে গেলেন এবং তাঁর ( সা ) সাথে গুহায় প্রবেশ করলেন । ইবনে আব্বাস বললেনঃ অতঃপর যেমন ভাবে মহানবীকে ( সা ) পাথর মারা হত ঠিক তেমন ভাবে আলীকেও পাথর মারা হচ্ছিল ( সেই রাতে ) । তিনি ( আলী ) পার্শ্ব দেশ পরিবর্তন করছিলেন । তবে তিনি চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছিলেন এবং ভোর হওয়া পর্যন্ত চাদর থেকে মাথা বের করেন নি । অতঃপর ভোর হলে তিনি চাদর সড়ালেন এবং তখন মুশরিকরা বললঃ আমরা ঢিল নিক্ষেপ করা সত্ত্বেও তোমার সংগী ( রাসূলুল্লাহ তোমার মত ) পার্শ্বদেশ পরিবর্তন ( এপাশ ওপাশ ) করত না  অথচ তুমি পার্শ্বদেশ পরিবর্তন করছিলে যা আমরা অপছন্দ করেছি ।
অতঃপর ইবনে আব্বাস বললেনঃ রাসূলুল্লাহ ( সা ) তাবুকের গাযওয়ায় ( যুদ্ধ ) বের হলেন এবং লোকজনও তাঁর সাথে বের হল । তিনি ( ইবনে আব্বাস ) বলেনঃ অতঃপর আলী তাঁকে ( সাঃ ) বললেনঃ “আমি কি আপনার সাথে বের হব ? “ তিনি ( ইবনে আব্বাস ) বলেনঃ অতঃপর নবী ( সাঃ ) তাঁকে বললেনঃ “না । “ অতঃপর আলী কাঁদলেন এবং তিনি ( মহানবী ) তাঁকে বললেনঃ তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে  মূসার কাছে হারূনের মর্য্যাদা ও অবস্থান ঠিক যেমন ঠিক তেমন আমার কাছে তোমার মর্য্যাদা ও অবস্থান হোক তবে আমার পরে কোনো নবী নেই ?! তুমি যে আমার খলীফা ( প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত ) তা (বাস্তবায়িত হওয়া ) ব্যতীত আমার প্রস্থান করা অনুচিৎ ( অর্থাৎে তোমাকে আমার খলীফা  ও স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত  করা ব্যতীত আমার কোথাও যাওয়া ও প্রস্থান করা অনুচিৎ ) । “
أما ترضِی أن تکون منّي بمنزلة هارون من موسی إلا وأنه لیس بعدي نبي ، إنّه لا ينبغي أن أذهب إلّا و أنت خليفتي .
ইবনে আব্বাস বললেনঃ আর তাঁকে ( আলী ) রাসূলুল্লাহ ( সা ) বলেছিলেনঃ “ তুমি আমার পরে প্রত্যেক মুমিন নর নারীর ওয়ালী ( অর্থাৎ কর্তৃত্বশীল কর্তৃপক্ষ , অভিভাবক ও তত্ত্বধায়ক ) । “
 
أنت وليّ کلّ مؤمن من بعدي و مؤمنة . 
 
ইবনে আব্বাস বললেনঃ আর রাসূলুল্লাহ ( সা ) কেবল আলীর ঘরের দরজা ব্যতীত মসজিদের সকল দরজা বন্ধ করে দেন ( অর্থাৎ মসজিদের দিকে উন্মুক্ত অন্য সকল ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন ) । হযরত আলী জুনুব ( যৌন কারণে নাপাক ) অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করতেন এবং এটা ব্যতীত তাঁর জন্য ঘরে প্রবেশের আর কোনো পথ ছিল না ।
   ইবনে আব্বাস বললেনঃ আর রাসূলুল্লাহ ( সা ) বলেছিলেনঃ আমি যার মওলা ( নেতা , কর্তৃপক্ষ , পরিচালক ও প্রশাসক )  তার মওলা হচ্ছেন আলী ।
من کنت مولاه فإنّ مولاه عليّ
ইবনে আব্বাস বললেনঃ মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে তিনি বৃক্ষের নীচে বাইআতকারীদের ( আসহাব-ই শাজারাহ্ ) ব্যাপারে সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তিনি তাদের অন্তরে যা আছে সে সম্পর্কে জ্ঞাত ও অবগত আছেন । মহান আল্লাহ কি আমাদের জানিয়েছেন যে তিনি এরপর তাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন ? 
ইবনে আব্বাস বললেনঃ “ আর যখন উমর বললেনঃ আমাকে অনুমতি দেন , আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই । “ তখন মহানবী ( সা ) তাকে বললেনঃ “ আর তুমি এটা করতে যাচ্ছিলে তোমার কি জানা আছেঃ অবশ্যই মহান আল্লাহ আহলে বদরের ( অর্থাৎ বদরের যোদ্ধাদের ) অন্তর্যামী এবং তাদের ব্যাপারে জানেন দেখেই তিনি বলেছেনঃ “ তোমরা যা চাও ( ও ইচ্ছা কর ) তা করে যাও বা করতে পার ( اعملوا ما شئتم ) “ [ তবে নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ সব কিছুর সম্যক দ্রষ্টা এবং তিনি রোয হাশরে সবকিছুর হিসাব নিবেন । ] 
হাকিম নিশাপুরী বলেনঃ এটা সহীহুল ইসনাদ হাদীস এবং এই সিয়াকাহ ( বাক্যের ধারা ও বাচনরীতি ) সহ তারা ( বুখারী ও মুসলিম ) তা রিওয়ায়ত করেন নি ।
সাইয়েদ আল আওহাদ আবূ হামযাহ ইবনে মুহাম্মাদ আয যাইদী আমাদেরকে বর্ণনা ( তাহদীস ) করেছেনঃ আমাদেরকে আবুল হাসান  আলী ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মেহরাভেইহ আল – ক্বাযভীনী আল – ক্বাত্ত্বান বর্ণনা করেছেনঃ আমি আবূ হাতেম আর – রাযীকে বলতে শুনেছিঃ আহমাদ ইবনে হাম্বলের বর্ণনা থেকে  ( হযরত আলীর ) এতসব ফযীলতের সন্ধান পাওয়াটা তাদেরকে ( রাবী ও হাদীস শাস্ত্রবিদগণ ) অত্যন্ত আশ্চর্য্যাম্বিত ও বিস্মিত করত ।
সূত্রঃ আল-হাকিম আননিশাপূরী , আল-মুস্তাদ্রাক আলাস্ সহীহাইন , খঃ ৩ , পৃঃ ৩৪৪-৩৪৫ ; হাদীস নং ৪৭১০ , দারুল ফিকর , বৈরুত লেবানন  , মুদ্রণ কাল : ২০০২ খ্রী: ; আর আল্লামা যাহাবী আত-তালখীস গ্রন্থে তাঁর সাথে ( হাকিম নিশাপুরী ) সাথে একমত পোষণ করে বলেছেনঃ ( হাদীসটি ) সহীহ ।
অনুবাদঃ ইসলামী চিন্তাবিদ এবং গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান
 
 
captcha