
আমি যখন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম, সেখানে ব্রিটেনের নিজস্ব কোনো সাংস্কৃতিক নিদর্শন খুঁজে পাইনি—প্রতিটি আর্টিফ্যাক্টই যেন ইতিহাসের গর্ভ থেকে ছিনিয়ে আনা নিদর্শন: ভারতের টিপু সুলতানের তরবারি, মিশরের মমি, আফ্রিকার ভাস্কর্য, মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রকর্ম। একদা অস্ত্রের মুখে লুট করে যা নিয়েছিল, এখন তা ‘ঐতিহাসিক সম্পদ’ হিসেবে প্রদর্শন করছে। আর আমাদের কাছ থেকে লুট করা জিনিসগুলো আমরাই টাকা খরচ করে গিয়ে দেখে আসছি!
কিন্তু কেবল ইতিহাসেই নয়—এই লুটতন্ত্র এখনো টিকে আছে, রূপ পাল্টে। এক সময় ব্রিটিশরা সরাসরি লুট করে নিয়ে যেতো; এখন তারা এমন এক লুটপাটের কাঠামো এবং নৈতিকতা রেখে গেছে, যেখানে তাদের আর সরাসরি লুট করতে হয় না। এখন স্থানীয় লুটেরারাই সেই কাজ করে—সম্পদ পাচার করে নিয়ে যায়, অফশোর একাউন্টে জমা রাখে, পশ্চিমা বিশ্বে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে।
এই প্রক্রিয়াই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার স্বরূপ। ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইনের ‘ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থিওরি’ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ একটি কেন্দ্র-প্রান্ত (core-periphery) ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে core (মেট্রোপলিটান দেশসমূহ) সর্বদা সম্পদের উপরে অধিকার রাখে, আর periphery (উপনিবেশ, উত্তর-ঔপনিবেশিক ও দরিদ্র দেশসমূহ) চিরকাল শোষণের শিকার হয়। চারশো বছরের পুঁজিবাদী ইতিহাসে আমরা এই core-এর পরিবর্তন দেখতে পাই—ইউনাইটেড প্রভিন্সেস অব ইউরোপ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র—এবং ভবিষ্যতে হয়তো সেই ভূমিকায় আসবে চীন।
এই ব্যবস্থায় সম্পদের প্রবাহ সর্বদা periphery থেকে core-এ প্রবাহিত হয়, আর রাজনৈতিক চাপ ও ক্ষমতার প্রক্ষেপন ঘটে উল্টোভাবে—core থেকে periphery-তে। ফলে periphery দেশগুলোর জনগণের শোষণ ও বঞ্চনা যেন চিরস্থায়ী এক নিয়তি। গত পনের বছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটা বড় অংশ রয়েছে ব্রিটেনে।
এই প্রেক্ষাপটে, দেশের বাইরে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য ড. ইউনুসের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়—ঔপনিবেশিক আমলে লুট করা ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার যেমন কখনো ফেরত আসেনি, তেমনি আজকের পাচারকৃত অর্থও আদৌ ফিরে আসবে কি না—সে ব্যাপারে গভীর সন্দেহ থেকেই যায়। হয়তো কিছুমাত্রায় বিচারের নামে বিচার হবে—কিছু রাজনীতিক ও কর্মকর্তার মন্ত্রিত্ব যাবে, তদন্ত হবে, প্রতিবেদন প্রকাশ হবে, কিছু সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে। কিন্তু সেই অর্থ ফেরত দিতে ব্রিটেন আদৌ রাজি হবে কি?
এই প্রশ্নই হয়তো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ড. ইউনুসের সঙ্গে দেখা করতে অনাগ্রহী করে তুলেছে। কারণ প্রশ্নটা শুধু পাচারের নয়—এটা ঐতিহাসিক দায়, পুঁজিবাদী শোষণ, এবং নৈতিক দায়মুক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর প্রশ্ন।