IQNA

ইসলামী সভ্যতায় ডাকব্যবস্থার ইতিহাস

মুসলিম সমাজে ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রযাত্রা

14:32 - October 12, 2025
সংবাদ: 3478235
ইকনা- ইসলামপূর্ব জাতি ও সভ্যতাগুলোর ভেতর ডাকব্যবস্থার প্রচলন ছিল। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে চীনা সমাজে এবং খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে অ্যাসেরিয়ান ও ব্যাবিলনিক সভ্যতায় ডাকব্যবস্থার প্রচলন ছিল। ডাকব্যবস্থার প্রথম বর্ণনা পাওয়া যায় মিসরের দ্বাদশ রাজপরিবারের একটি ফারাও নথিতে। খ্রিস্টপূর্ব ২১১১ অব্দের এই নথিতে বলা হয়েছে, ‘বার্তাবাহক ভারী বোঝা বহন করে।
সে গন্তব্যের উদ্দেশে বের হওয়ার আগে অসিয়ত লিখে রেখে যায়, কেননা হিংস্র প্রাণী ও এশীয়দের পক্ষ থেকে বিপদ ঘটতে পারে।’ এই বর্ণনায় ডাকব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। (নিজামুল বারিদ, পৃষ্ঠা ২৫-২৬)
ডাকব্যবস্থার উন্নয়নে পারস্যের অবদান সবচেয়ে বেশি। পারস্য সম্রাট সাইরাস তার শাসনাধীন অঞ্চলে একটি শক্তিশালী ডাকব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
 
 
তিনি পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলো থেকে ডাকব্যবস্থার ধারণা গ্রহণ করেন এবং তার উন্নয়নে অবদান রাখেন। এ ক্ষেত্রে সম্রাট দারা বিন কাম্বিজ, যিনি দারিয়াস নামেই বেশি পরিচিত, তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ডাকব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের ভেতর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তিনি ডাকব্যবস্থার জন্য রুট বা পথরেখা তৈরি করেন এবং এই কাজের জন্য লেজ কাটা প্রাণী ব্যবহার শুরু করেন।
 
 
তাঁর সময়ে ডাকব্যবস্থা শুধু পত্র বহনে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকার পর্যবেক্ষণ, পরামর্শ ও নির্দেশনা বিনিময় হতো। যা অনেকটা গোয়েন্দাগিরির মতো। (তারিখুত তামাদ্দুনিল ইসলামী : ১/২৪৩)
রোমানরাও ডাকব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিল। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ডাকব্যবস্থাকে সুসংহত করেন। পরবর্তী সময়ে রোমানরা ডাকব্যবস্থাকে আরো সুসংহত করতে প্রত্যেক প্রশাসনিক অঞ্চলের জন্য পৃথক ডাকব্যবস্থা, ডাক প্রশাসক এবং ডাক চৌকিগুলোতে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়।
 
 
(নিজামুল বারিদ, পৃষ্ঠা ৩১)
মহানবী (সা.) যুগে ডাকব্যবস্থা
 
মুসলিমরা ডাকব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের নতুনত্ব আনলেও এর মৌলিক ধারণা পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলো থেকেই গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে পারস্য সভ্যতা থেকে। ফলে ইসলামী ডাকব্যবস্থার পরিভাষায় ফারসি শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন—ফ্রাংক, ফায়িজ, শাকরি, আসিকদার ইত্যাদি।
 
মুসলিম সভ্যতায় ডাকব্যবস্থার প্রচলন মহানবী (সা.)-এর যুগেই হয়েছিল। তিনি নিজে বিশ্বের বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের কাছে বার্তাবাহকের মাধ্যমে সিলমোহরযুক্ত চিঠি পাঠান। তিনি এ ব্যাপারে বলেন, ‘তোমরা যখন আমার কাছে কোনো বার্তাবাহককে পাঠাও, তখন সুন্দর নাম ও অবয়ববিশিষ্টকে পাঠাবে।’ (লিসানুল আরব : ৩/৮৬)
 
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মানুষকেই বার্তাবাহক হিসেবে বিভিন্ন গোত্র, সম্প্রদায়, শাসক ও সম্রাটদের পাঠানো হতো এবং তাদের মাধ্যমে ইসলামের বার্তা ও নবীজি (সা.)-এর সিদ্ধান্ত পৌঁছে দেওয়া হতো। ষষ্ঠ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হুদাইবিয়ার সন্ধির আগে ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে নিজের বার্তাবাহক হিসেবে মক্কায় প্রেরণ করেন। গবেষকদের দাবি, নবীজি (সা.) ১০ জন শাসক, পাঁচজন প্রশাসক ও একাধিক সাহাবিসহ মোট ২০০ মানুষের কাছে চিঠি প্রেরণ করেন।
 
মহানবী (সা.) তাঁর রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলমোহর হিসেবে একটি আংটি ব্যবহার করতেন। আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আংটি ছিল রুপার তৈরি এবং তাঁর নাগিনাও ছিল রুপার। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮৭০)
 
আংটিতে অঙ্কিত তিনটি শব্দের মধ্যে সবার ওপরে ‘আল্লাহ’, এর নিচে ‘রাসুল’ এবং তার নিচে মুহাম্মদ লেখা ছিল। নিচ থেকে পড়লে হয় মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৭৪৭)
 
সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পত্রবাহকদের সম্পর্কে লেখেন, ‘তিনি প্রত্যেক সম্রাটের জন্য এমন সব দূত নির্বাচিত করেন, যাঁরা তাদের সম্মান ও মর্যাদা মোতাবেক কথাবার্তা বলতে পারেন এবং সেখানকার ভাষা। তা ছাড়া দেশের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল।’ (নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা ২৮৮)
 
যেমন—তিনি দিহয়াতুল কালবি (রা.)-কে রোম সম্রাট কায়সারের কাছে, আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা সাহমি (রা.)-কে পারস্য সম্রাট কিসরার কাছে এবং আমর বিন উমাইয়াম দামেরি (রা.)-কে হাবশার বাদশাহ নাজ্জাসির কাছে প্রেরণ করেন।
আতাউর রহমান খসরু
captcha