
আফগান গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, এই মসজিদটি উত্তর আফগানিস্তানের শহর মাজার শরীফে অবস্থিত এবং স্থানীয়দের কাছে এটি হাজরত ইমাম আলী (আ.)–এর হারাম নামেও পরিচিত। নীল-সবুজ টাইলস, ফারোজা গম্বুজ এবং নিখুঁত সিরামিক নকশার জন্য এটি দেশটির সবচেয়ে সুন্দর ও বিখ্যাত মসজিদগুলোর একটি।
মসজিদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৮০ মিটার উচ্চতায় এবং রাজধানী কাবুল থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ইতিহাস ও শিকড়
মসজিদে কাবুদ বা জিয়ারত-এ সাখি—মাজার শরীফে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নির্মাণ, যা স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী ইমাম আলী (আ.)–এর মাজার হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবছর হাজারো মানুষ দেশ-বিদেশ থেকে এখানে জিয়ারত করতে আসেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে বর্ণিত হয় যে ষষ্ঠ হিজরি শতাব্দীতে এখানে মাজার আবিষ্কৃত হয় এবং পরে দশম হিজরি শতকে এর পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণ ঘটে। যদিও কবরটির প্রকৃত সংযুক্তি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে ভিন্নমত রয়েছে।
‘মাজার শরীফ’ নামটিই এসেছে “মুকাদ্দাস মাজার” অর্থ থেকে।
মসজিদটির প্রথম কাঠামো মঙ্গোল আক্রমণের সময় (১২২০ খ্রিস্টাব্দ) ধ্বংস হয়ে যায়। পরে তিমুরীয় যুগে এটি পুনরায় আবিষ্কৃত হয় এবং পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়।
পঞ্চদশ শতকে, তিমুরীয় শাসক সুলতান হুসাইন বায়কারা এর মহৎ স্থাপত্যশৈলী পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। হেরাত, সমরকন্দ ও বুখারা থেকে আনা দক্ষ স্থপতি ও কারিগরেরা এর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সময়ের সাথে সাথে এতে প্রাঙ্গণ, উদ্যান ও যাত্রীসেবা কেন্দ্র যোগ করা হয়, যা একে একটি বড় আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও এর বিভিন্ন অংশ সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপক পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এর সৌন্দর্য পুনরুদ্ধার করা হয় এবং পরবর্তীতে এটি আফগানিস্তানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
স্থাপত্যশৈলী ও শিল্পসজ্জা
মসজিদে কাবুদ মধ্য এশিয়ার ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ, যা তিমুরীয় শিল্পরীতির সর্বোচ্চ পর্যায়কে উপস্থাপন করে।
স্থাপত্য নকশাটি সম্পূর্ণ জ্যামিতিক সামঞ্জস্যে নির্মিত, যা ইসলামী দর্শনে আধ্যাত্মিক জগত ও সৌরজগতের সুশৃঙ্খলতার প্রতীক।
কুফি ও সুলুস লিপিতে লেখা কুরআনের আয়াত দিয়ে সাজানো নীল, ফারোজা ও লাজুর্দি টাইলসের বাহ্যিক দেয়াল একে সারা বিশ্বের কাছে অনন্য সৌন্দর্য প্রদান করেছে।
গম্বুজদ্বয়—একটি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ও অপরটি বাহ্যিক সজ্জিত গম্বুজ—সূর্যালোকে ঝিলমিল করে এবং রাতে চাঁদের আলোয় রূপালি আভা ছড়ায়।
চারটি উঁচু ও সরু মিনার তিমুরীয় স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর অন্যতম।
ভেতরে মার্বেল স্তম্ভ, অলংকৃত খিলান ও সুরা নূরের আয়াতখচিত সুন্দর মিহরাব রয়েছে। কাঠের হাতে খোদাই করা খুতবার মিনবার স্থানীয় শিল্পীদের দক্ষতার দৃষ্টান্ত।
আজ মসজিদে কাবুদকে আফগানিস্তানে ইসলামী স্থাপত্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ইরান, সমরকন্দ ও মাওরান্নাহর অঞ্চলের স্থাপত্যপ্রভাবের এক অনন্য সমন্বয়।
জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক
মসজিদটি ধর্মীয় গুরুত্ব ছাড়াও আফগান জাতীয় ঐক্যের এক বিশেষ প্রতীক। বহুজাতি ও বহু মতবিশ্বাসের দেশ আফগানিস্তানে এটি সব গোষ্ঠীর কাছে সম্মানীয় স্থান।
ইউনেসকোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ভূমিকম্প ও জলবায়ুজনিত ক্ষতি থেকে রক্ষায় এর টাইলস ও কাঠামো সংরক্ষণে সহায়তা করছে।
নিচে এই পবিত্র স্থানের ভিডিও চিত্র তুলে ধরা হলো।4316257#