
ইরাক সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে লেবাননের হিযবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি আন্দোলন)-কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় দেশটির রাজনৈতিক ও জনমানসে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘প্রতিরোধ অক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত’ হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে যে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি দেখা দিয়েছে:
১. নির্বাচনের আগে গোপনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কয়েক মাস আগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি গেজেট ‘আল-ওয়াকায়ে আল-ইরাকিয়া’য়া’য় প্রকাশ করা হয়নি — যাতে নির্বাচনে প্রভাব না পড়ে।
২. সিদ্ধান্ত এখন অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী, নির্বাহী, বিচার ও আইনসভার অনুমোদন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত গেজেটে প্রকাশ হয় না। তাই এখন কেউ একে ‘কারিগরি ভুল’ বলে পার পাবে না।
৩. সরকার জেনে-বুঝেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সিদ্ধান্ত প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এর পক্ষে সোচ্চার হয়ে ওঠেন — যা প্রমাণ করে পুরো বিষয়টি পূর্বপরিকল্পিত।
৪. প্রতিরোধ শক্তি ও জনগণের তীব্র প্রতিবাদ। হাশদ আশ-শা’বী, প্রতিরোধ শক্তি, রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ নাগরিকরা এই সিদ্ধান্তকে ‘আমেরিকা-ইসরাইলের চাপে নেওয়া লজ্জাজনক পদক্ষেপ’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
৫. ইরাকের জনমত প্রতিরোধের পক্ষে। ইরাকের অধিকাংশ মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং প্রতিরোধ অক্ষের সমর্থক। তাই এই সিদ্ধান্ত জনগণের মনের সঙ্গে সাংঘর্ষে গেছে।
৬. সরকারের পিছু হটা ও আন্তর্জাতিক সম্মানহানি। সরকার এখন একে ‘ভুল’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে এবং ‘তদন্ত কমিটি’ গঠনের কথা বলছে — যা দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে।
৭. প্রতিবাদ ছিল জাতীয় মর্যাদা রক্ষার লড়াই। প্রতিরোধ শক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ শুধু হিযবুল্লাহ-আনসারুল্লাহর পক্ষে নয়, বরং ইরাকের জাতীয় সম্মান ও ঐতিহাসিক অবস্থান রক্ষার প্রশ্ন ছিল।
৮. পুরোনো সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হলে নতুন সিদ্ধান্ত লাগবে। আইন অনুযায়ী, গেজেটে প্রকাশিত কোনো সিদ্ধান্ত শুধু নতুন সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই বাতিল করা যায়।
৯. তদন্ত কমিটি = সময়ক্ষেপণ কৌশল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘তদন্ত কমিটি’ গঠন শুধুই বিষয়টি ঠান্ডা করার একটি কৌশল। 4320957#
১০. এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেকে এই সিদ্ধান্তকে সরকারের পূর্ববর্তী পদক্ষেপগুলোর ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন: কাতার-সংযুক্ত আমিরাত সফর, জোলানি সরকারের প্রতিনিধিকে বাগদাদে আমন্ত্রণ, শার্ম আল-শেখ সম্মেলনে অংশগ্রহণ, কাতাইব হিযবুল্লাহর বিরুদ্ধে বিবৃতি, ট্রাম্পকে ‘শান্তির প্রার্থী’ বলে প্রশংসা — এ সবই একটি ‘প্রতিরোধ-বিরোধী প্রকল্পের’ অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
১১. প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান। বিশ্লেষকরা বলছেন, চারটি শক্তিকে এখন আরও সোচ্চার হতে হবে: প্রতিরোধ গোষ্ঠী, মিডিয়া, সমন্বয় কাঠামো (الإطار التنسيقي) এবং দেশপ্রেমিক দলগুলো — বিশেষ করে আগামী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের সময়।
১২. প্রতিরোধ অক্ষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব। লেবানন ও অঞ্চলের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর কাছে ইরাক সবসময় ‘প্রতিরোধের পিঠ’ বলে পরিচিত ছিল। এই সিদ্ধান্ত তাদের মনে আঘাত হেনেছে।
১৩. খলিজি মিডিয়ার উল্লাস। সৌদি, আমিরাত ও অন্যান্য খলিজি মিডিয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘ইসরাইলের পক্ষে বড় জয়’ এবং ‘স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ’ বলে উদযাপন করছে।
১৪. ইরাকি জাতির অটল অবস্থান। জনগণের ব্যাপক প্রতিবাদ প্রমাণ করেছে — ইরাকের মানুষ এখনো তাদের ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও নৈতিক অবস্থানে অটল। তারা কোনো চাপের কাছে মাথা নত করে না।
বিশ্লেষক বলেছেন: এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে, প্রতিরোধ অক্ষের প্রশ্নে যে কোনো আঘাত ইরাকি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারকে অবশ্যই এই ধরনের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত সতর হতে হবে, কারণ এটি কেবল দুটি গোষ্ঠীর বিষয় নয় — এটি ইরাকের জাতীয় পরিচয় ও গর্বের প্রশ্ন।