
ইকনা’র বরাতে San Diego Union-Tribune জানায়, গত ১৮ মে সান দিয়েগোর ইসলামিক সেন্টার একটি সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
হামলায় মসজিদ ও ইসলামিক স্কুলসম্বলিত এই কেন্দ্রটিতে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, যার ফলে কয়েকজন নিরীহ মানুষ নিহত ও আহত হন।
ইমান সালেম নামের এক নারী ১৮ মে সকালে ইসলামিক সেন্টারের দিকে যাওয়ার সময় নাদের আওয়াদকে দৌড়ে মসজিদের দিকে যেতে দেখেন। আওয়াদ তাকে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করার ইঙ্গিত দেন।
তিন সন্তানের জননী ও পেশায় চিকিৎসক সালেম আতঙ্কিত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় দেখেন, এক ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে নিথর হয়ে পড়ে আছেন। তিনি ছিলেন মসজিদের নিরাপত্তারক্ষী আমিন আবদুল্লাহ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নাদের আওয়াদকেও প্রাণঘাতী গুলিতে আহত করা হয়।
হামলার পর থেকে ইমান সালেম অনিদ্রায় ভুগছেন। তিনি বারবার সেই ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছেন। তবে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, অন্যদের সহায়তা, কান্না, কথোপকথন এবং আশার মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন।
ক্লেয়ারমন্ট এলাকার এই মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নাদের আওয়াদ, আমিন আবদুল্লাহ এবং মনসুর কাজিহা নিহত হওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। এ সময় হাজারো মানুষ তাদের স্মরণে শোক প্রকাশ করছেন এবং সম্প্রদায়কে এগিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজছেন।
গত সপ্তাহান্তে ইসলামিক সেন্টারে “একটি নিরাময়ের দিন” শীর্ষক একটি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে শিশুদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ধর্মীয় নেতাদের সহায়তা প্রদান করা হয়।
নিহতদের পরিবারের সহায়তায় খাদ্য সংগ্রহ ও অর্থ সহায়তা কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প বাতিল করা হলেও মসজিদ পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করছেন।
একই সঙ্গে কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি জেলা অ্যাটর্নি সামার স্টেফান এবং অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি সারা জ্যাকবস ইসলামিক সেন্টারটি পরিদর্শন করেন।
সান দিয়েগোর মুসলিমরা এখনো বিস্মিত হয়ে ভাবছেন, কী ধরনের ঘৃণা ও বিদ্বেষ দুই তরুণকে এই পবিত্র স্থানে হত্যাযজ্ঞ চালাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এদিকে, এই শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যেই মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা পালিত হয়েছে।
ইসলামিক সেন্টার এক ফেসবুক বার্তায় উৎসব, শোক এবং আত্মত্যাগের বিষয়গুলোর মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরে জানায়, হামলাকারীদের প্রতিরোধ করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জীবন রক্ষায় যারা সাহসিকতা দেখিয়েছেন, তারা প্রকৃত নায়ক।
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের তিন শহীদের অনুপস্থিতিতে ঈদ আর কখনো আগের মতো হবে না। তাদের অভাব মসজিদ, সমাজ ও আমাদের হৃদয়ে গভীরভাবে অনুভূত হবে। তবুও শোকের মাঝেও আমরা আমাদের ঈমানের ওপর অটল রয়েছি।”
আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস কাউন্সিল (CAIR)-এর সান দিয়েগো শাখার নির্বাহী পরিচালক তাজিন নিযাম বলেন, এই ট্র্যাজেডির প্রভাব হয়তো দীর্ঘদিন ধরে থেকে যাবে।
তিনি বলেন, “এটি আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত বিধ্বংসী একটি সহিংস ঘটনা। শোকের প্রকাশ একসময় কমে আসতে পারে, কিন্তু এর বেদনা থেকে যাবে এবং আমাদের হৃদয়ে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা হয়তো কখনো পুরোপুরি সেরে উঠবে না।”
তিনি আরও বলেন, শিশুদের স্কুলে ফিরে এসে আমিনকে না দেখতে পাওয়ার মধ্যেও সেই বেদনা অনুভূত হবে।
গত বুধবার হাজারো মুসলিম ঈদুল আজহার নামাজ ও উদ্যাপনে সান দিয়েগো কনভেনশন সেন্টারে সমবেত হন। সেখানে বিপুলসংখ্যক ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল এবং ইসলামিক সেন্টারের বাইরে টহল গাড়িও অবস্থান করছিল।
মসজিদের সদস্য ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ বাইলুনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, মুসলিমরা সমাজের জন্য কাজ করলেও এখনও নানা ধরনের কুসংস্কার ও বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন।
দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি নিজেকে একজন আমেরিকান মনে করি। আমি এই শহরেই জন্মেছি, যে হাসপাতালে জন্মেছি সেখানেই কাজ করি। তবুও শৈশব থেকেই আমাকে বোমা তৈরির মতো বিষয় নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য শুনতে হয়েছে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঘৃণার জবাব আরও বেশি ভালোবাসা দিয়েই দিতে হবে।
সান দিয়েগো ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক তাহা হাসান বলেন, “আমাদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় নিহত তিন প্রিয় ভাইকে হারানোর কারণে এবারের ঈদ সবার কাছেই ভিন্ন অনুভূতির।”
তিনি আরও বলেন, মানুষের সহমর্মিতা ও উদ্বেগকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত করতে হবে।
তার ভাষায়, “বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যই সেই গুলিতে পরিণত হয়েছে, যা নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। আপনাদের কর্মকাণ্ড কিংবা নীরবতা আমাদের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।”
তিনি বলেন, “মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন জরুরি।” 4355463#