তৃতীয় রাতের বক্তৃতায় হুজ্জাতুল ইসলাম আলভী তেহরানী ইমামতকে আল্লাহর নেয়ামত এবং ধর্মীয় জীবনের মূল কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মুহররমের মজলিসগুলো ধর্ম শেখার জন্য অপরিহার্য কর্মশালা। তিনি আরও বলেন, আমাদের ধর্মীয় জীবন ইমাম যামান (আ.)-এর সঙ্গে গভীর সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল।
তিনি বাস্তব কর্মপন্থা হিসেবে বলেন, রিযিকের প্রশস্ততার জন্য নিয়মিত ইস্তেগফার এবং নেয়ামতের ধারাবাহিকতার জন্য হামদ ও শুকরিয়া আদায় করা উচিত। এতে আমরা দোয়াকে শুধু স্বার্থপরতার সরঞ্জাম না বানিয়ে, বরং দোয়ার প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করে ইমাম (আ.)-এর হক আদায়ের দিকে অগ্রসর হতে পারব।
সবশেষে তিনি একটি নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন: আমরা যদি সত্যিই দ্বীনদার হই এবং যোগ্যতার দাবি করি, তাহলে আমাদের কর্ম ও জীবনযাপন দিয়ে কেন আমরা ইমাম যামান (আ.)-এর যুহুরকে ত্বরান্বিত করার পরিবর্তে বিলম্বিত করছি?
বক্তৃতার বিস্তারিত অনুবাদ:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা খাইরি খালকিহি মুহাম্মাদিন ওয়া আলিহিত তাহিরীন, ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম।
আজ রাতে আমি এই মজলিসে কারবালার মুজাহিদ ও শহীদদের পবিত্র নাম উল্লেখ করার তাওফিক লাভ করেছি। আশা করি, তাঁদের পবিত্র আত্মাকে এই মজলিসে উপস্থিত করতে পারব এবং তাঁদের নামে সালাত ও সালাম পেশ করব। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সংশোধনের জন্য তাঁদের পবিত্র আত্মার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করব। তাঁদের কয়েকজনের নাম নিম্নরূপ:
হাইয়ান বিন হারিস সালমানী আযদী, জুন্দুব বিন হাজার কিন্দী খাওলানী, জাওন বিন হুয়াই (হযরত আবু যরের গোলাম), জুয়াইন বিন মালিক বিন কায়স বিন সা’লাবা, হারিসা কিন্দী, হারিস বিন নাবহান (হযরত হামজা সাইয়্যেদুশ শুহাদার গোলাম), হাব্বাব বিন আমির বিন কা’ব বিন সা’লাকা তায়মী, হাওশাব বিন কায়স নাহমী, হাবীব বিন মুযাহির আসাদী কাহিলী, হাজ্জাজ বিন ইয়াযীদ সা’দী, হাজ্জাজ বিন মাসরুক জু’ফী, হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহী, কা’নাবা বিন উমর আযদী রাসিবী, খালিদ বিন উমর আযদী, রাফে’ বিন আবদুল্লাহ (মুসলিমের গোলাম), সাঈদ বিন আবদুল্লাহ হানাফী, শাবীব বিন আবদুল্লাহ আবু আমর নাহশালী, উমর বিন আবদুল্লাহ জুনদাঈ।
তাঁদের পবিত্র আত্মার উদ্দেশ্যে সালাত পেশ করুন। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলি মুহাম্মাদ।
রেওয়ায়েত আছে যে, একদিন ইবনে আব্বাস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কোনো উপদেশ দিন।” রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “আলাইকা বি মাওয়াদ্দাতি আলিয়্যিবনি আবী তালিব” — “তোমার উপর আলী ইবনে আবি তালিবের মুহাব্বত অপরিহার্য।” (সালাত)। তারপর নবী (সা.) কসম করে বললেন, “সেই সত্তার কসম যিনি আমাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আল্লাহ কোনো বান্দার কোনো নেক আমল গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ না তিনি তাকে আলী ইবনে আবি তালিবের মুহাব্বত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।”
এই ভিত্তিতে কিয়ামতের দিন আমাদের ফাইলের শিরোনাম থাকবে “সহীফাতুল মু’মিন হুব্বু আলী ইবনে আবী তালিব”। যে ব্যক্তি ওলায়াতে আলী (আ.) নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে, তার কাছ থেকে কোনো হিসাব নেওয়া হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি এই ওলায়াত ছাড়া হাজির হবে, তার ছোট ছোট নেক আমল থেকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
নবী (সা.) আরও বললেন, “হে ইবনে আব্বাস! আলী (আ.)-এর শত্রুর প্রতি জাহান্নামের আগুনের ক্রোধ আল্লাহর শত্রুর প্রতি ক্রোধের চেয়েও প্রচণ্ড।” তারপর বললেন, “যদি মুকাররাব ফেরেশতা ও সকল নবী-রাসূলও আলী (আ.)-এর প্রতি বাগ (শত্রুতা) পোষণ করে একত্রিত হয়, তবুও আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবেন।”
সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “এমন কেউ কি আছে যে আলী (আ.)-এর প্রতি বাগ পোষণ করে?” নবী (সা.) বললেন, “হ্যাঁ, এমন লোক আছে যারা নিজেদেরকে আমার উম্মত বলে দাবি করে, কিন্তু ইসলামের স্বাদ পায়নি।” হে ইবনে আব্বাস! তাদের বাগের নিদর্শন হলো — তারা নিম্নমানের লোকদেরকে আলী (আ.)-এর উপর প্রাধান্য দেয়।
কী সুন্দর বলেছেন সেই কবি: “না খোদা তাওয়ানাম খান্দ, না বশর তাওয়ানাম গুফত / মুতাহাইয়্যিরাম চে নামাম শাহে মুলক লা ফাতা রা” (তাঁকে না খোদা বলতে পারি, না মানুষ বলতে পারি। আমি বিস্মিত — এই বাদশাহে লা ফাতাকে কী নামে ডাকব!)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: «وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً» — তিনি তোমাদের উপর তাঁর নেয়ামতসমূহকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে পূর্ণ করে দিয়েছেন। ইমাম কাজেম (আ.) প্রকাশ্য নেয়ামতকে ‘দৃশ্যমান ইমাম’ এবং অপ্রকাশ্য নেয়ামতকে ‘ইমাম যামান (আ.)’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং কিয়ামতের দিন ইমামত সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যেমন সূরা সাফফাতে এসেছে: «وَقِفُوهُمْ إِنَّهُمْ مَسْئُولُونَ»। নবী (সা.) বলেছেন, সেই মহাসমাবেশে সবাইকে আলী (আ.)-এর ওলায়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
এই মজলিসগুলোর কদর করুন। আমাদের ধর্মীয় জীবন এই মজলিসের উপর নির্ভরশীল। শত্রুরা কেন এই মজলিসের বিরোধিতা করে? কারণ এগুলো ইমাম-পরিচিতির কর্মশালা। শত্রুরা কখনো রওজা নিয়ে বিদ্রূপ করে, কখনো মাদাহের সমালোচনা করে এই মজলিস বন্ধ করার চেষ্টা করে। অথচ আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসে অংশগ্রহণ শুধু মুস্তাহাব নয়, বরং মুহাব্বত প্রকাশ ও ধর্ম শিক্ষার কারণে ওয়াজিব।
সূরা রা’দের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন: «إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ» — আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আমরা যেহেতু ইমামতের নেয়ামত লাভ করেছি, তাই এই নেয়ামত ছিনিয়ে নেওয়ার আশঙ্কায় রয়েছি, যদি না আমরা এর হক আদায় করি। আর হক আদায়ের জন্য প্রথম শর্ত হলো এর পরিচয় লাভ করা।
যদি আপনার রিযিক সংকীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে অবৈধ পথ অবলম্বন না করে কুরআনের আশ্রয় নিন। সূরা নূহে আল্লাহ বলেন: «اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُم مِّدْرَارًا» — তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। ইস্তেগফার রিযিকের চাবিকাঠি। আমিরুল মু’মিনীন (আ.) প্রতিদিন এর উপর আমল করতেন।
নেয়ামতের ধারাবাহিকতা প্রসঙ্গে ইমাম সাদেক (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যদি তোমরা আল্লাহর দেওয়া কোনো নেয়ামত (স্ত্রী, সন্তান, ব্যবসা বা অন্য কোনো নেয়ামত) চিরস্থায়ী করতে চাও, তাহলে হামদ ও শুকরিয়া বৃদ্ধি করো।
সবশেষে মূল বিষয়ে আসি — ইমাম যামান (আ.)-এর হক আদায়। দোয়ায়ে নুদবায় আমরা পড়ি: «اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى تَأْدِيَةِ حُقُوقِهِ إِلَيْهِ» — হে আল্লাহ! আমাকে ইমাম যামান (আ.)-এর হক আদায়ে সাহায্য করো। লক্ষ্য করুন, “হুকুক” শব্দটি বহুবচন, যা একাধিক দায়িত্বের ইঙ্গিত দেয়।
আমরা দুনিয়াবী সফরে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে হালাল করে নিই, কিন্তু ইমাম যামান (আ.)-এর হক সম্পর্কে কি কখনো ভেবেছি? যতক্ষণ না আমাদের প্রধান চিন্তা ইমামের হক আদায় হয়, ততক্ষণ আরবাইন বা হজ্জের কোনো সফরই পূর্ণ ফলপ্রসূ হবে না।
শেষ কথা: আমরা সবাই নিজেদেরকে আল্লাহর ভালো বান্দা মনে করি। কিন্তু এই রাতগুলোতে সত্যিকারভাবে চিন্তা করি — যদি আমরা সত্যিই যতটা দাবি করি যোগ্য হই, তাহলে ইমাম যামান (আ.)-এর যুহুর এত বিলম্বিত হচ্ছে কেন?
আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্যিকারের ইমাম-পরিচিতি ও তাঁর হক আদায়ের তাওফিক দান করুন। 4359016#