ইকনা’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সমসাময়িক ইতিহাসের এই তিক্ত ও ভারী দিনগুলোতে, যখন বিপ্লবের নেতার শাহাদাতের জ্বালাময় অনুপস্থিতিতে ইতিহাসের পাতা গভীর শোকে ভারাক্রান্ত, তখন এক ঐতিহাসিক বেদনা সমাজের গলা টিপে ধরেছে। তাঁর শাহাদাত কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা বা প্রশাসনিক কর্ণধারের চলে যাওয়া ছিল না; বরং একজন হাকীম, একজন সর্ববিষয়ক মনীষী এবং একজন সভ্যতা-নির্মাতা তাত্ত্বিকের অনুপস্থিতি ছিল, যিনি বিশ্বব্যাপী প্রবল বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের ঝড়ের মাঝেও ইসলামী বিপ্লবের জ্ঞানময় ও পরিচয়গত কাঠামোর সুরক্ষা করছিলেন।
এখন যখন সমাজ তাঁর শারীরিক উপস্থিতি, সরাসরি নির্দেশনা ও উষ্ণ বাণী থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন মিডিয়ার উপর আগের চেয়েও অনেক ভারী দায়িত্ব এসে পড়েছে— তাঁর চিন্তার উত্তরাধিকারকে সঠিকভাবে পুনরায় উপস্থাপন করার দায়িত্ব, যাতে এই মহামূল্যবান মণি সময়ের ধুলোয় বিকৃত বা বিস্মৃত না হয়। এই লক্ষ্যে ইকনা ধারাবাহিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই শহীদ নেতার চিন্তার জগতের পর্যালোচনা করছে।
নিম্নে যা পড়ছেন, তা হযরত সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আজাদারী সম্পর্কে শহীদ নেতার দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশ্লেষণমূলক ও দলিলভিত্তিক বর্ণনা। এতে তাঁর নিজস্ব শব্দচয়ন, সাহিত্যিক ভঙ্গি ও সরাসরি উক্তিগুলো তারকার মতো ছড়িয়ে আছে, যাতে ইতিহাসের পাতায় তাঁর স্পষ্ট কণ্ঠস্বর চিরকাল জীবন্ত থাকে।
শিয়া ও ইসলামী সমাজের গঠনে আজাদারীর অপরিসীম গুরুত্ব
সমাজ গঠনের সকল স্তম্ভ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো ঘটনাই হযরত সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আজাদারীর মতো এতটা গভীর প্রভাব ও ইতিহাস গঠনের ক্ষমতা রাখে না। শহীদ নেতার চিন্তার জগতে আজাদারী ও হুসাইনী শা‘আয়েরের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কোনো সনাতন, সংকীর্ণ বা ক্ষণস্থায়ী আবেগ নিষ্কাশনের বিষয় ছিল না। তিনি আজাদারী মজলিসগুলোকে জাতির মৌলিক পরিবর্তনের কেন্দ্র, বসীরতের ইনজেকশনের কেন্দ্রস্থল এবং জ্ঞানীয় যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ হিসেবে দেখতেন।
শিয়া আজাদারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গবেষণাযোগ্য ঘটনা
যে বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই শুধুমাত্র আচার-অনুষ্ঠানিক আচরণে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়, শহীদ নেতা তার সমাজতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত মূল উন্মোচন করেছেন এবং সমাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, বরং এক বিশাল সম্পদ।
তিনি বলেন: «আহলে বাইত (আ.)-এর জন্য আজাদারী বা মুসীবত পাঠের মূল বিষয়, যা সাধারণত উপদেশ, নসীহত, মা‘রিফাত, সমসাময়িক ইস্যু এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত, শিয়াদের বৈশিষ্ট্য। এটি ইমামগণের (আ.) যুগ থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে। অন্যত্র এটি নেই এবং তারা এর শূন্যতা অনুভব করে। তারা এর শূন্যতা অনুভব করে এবং কোনো না কোনোভাবে পূরণ করার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না। মাদ্দাহী, নগমাসরায়ী, মদহ, মুসীবত, মারসিয়া, যিকির ইত্যাদিও শিয়াদের বৈশিষ্ট্য। এটিও অন্য কোথাও এমনভাবে নেই। এত ব্যাপকতা— সংখ্যাগত ব্যাপকতা এবং অর্থ ও ধারণাগত ব্যাপকতা— অন্য কোথাও নেই। এই ঘটনা বৈজ্ঞানিক গবেষণার যোগ্য; অর্থাৎ আমাদের ছাত্র, অধ্যাপক ও গবেষকদের বসে এই বিষয় নিয়ে চিন্তা করা, গবেষণা করা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা এবং এর বৈজ্ঞানিক সম্প্রসারণের পথ দেখানো উচিত। আমরা আসলে এই ঘটনাকে খাটো করে দেখেছি; অথচ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।»
কেন কান্না ও আজাদারী ধর্মীয় যুক্তির পরিপূরক?
আধুনিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রায়ই ‘আবেগ ও অশ্রু’কে ‘যুক্তি ও বিবেক’-এর বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। কিন্তু শহীদ নেতার দৃষ্টিতে এ দুটি পরস্পরবিরোধী নয়, বরং আবেগই যুক্তির চালিকাশক্তি ও শক্তিশালী ভিত্তি। আজাদারী তাঁর কাছে কুরআনী মুওয়াদ্দাতকে সক্রিয় করার প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন: «কেউ কেউ হয়তো বলবে, ইমাম হুসাইনের নেহজত ব্যাখ্যা করতে চাও, ঠিক আছে, ব্যাখ্যা করো। তাহলে রওজা-খানি, কান্নাকাটি, বিলাপ করার দরকার কী? বসে বলো যে, হযরত এ কাজ করেছেন, সে কাজ করেছেন, উদ্দেশ্য ছিল এটি। এটি খুবই ভুল চিন্তা, ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। আল্লাহর অলী ও দ্বীনের অলীদের প্রতি এই আবেগীয় সম্পর্ক চিন্তাগত ও কর্মগত সম্পর্কের অত্যন্ত মূল্যবান ভিত্তি। এই ভিত্তি ছাড়া পথ চলা খুব কঠিন। এই আবেগীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম খোমেইনী (রহ.) যে বলেছেন ‘প্রচলিত ধারার আজাদারী’— এটি অভ্যাসবশত বলা কথা নয়; এটি অত্যন্ত গভীর ও দূরদর্শী কথা… তৃতীয় বিষয় হলো মুওয়াদ্দাত… এই মুওয়াদ্দাত আবেগীয় সম্পর্কের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। তাঁদের মুসীবতের ঘটনা বর্ণনা করা এক ধরনের আবেগীয় সম্পর্ক সৃষ্টি করে; তাঁদের মানাকিব ও ফযীলত বর্ণনা করা আরেক ধরনের আবেগীয় বন্ধন।»
হেইয়াতে ধর্মীয় সমাজের মৌলিক ইস্যু থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না
শহীদ নেতার দৃষ্টিতে আজাদারী মজলিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কাজ হলো মানুষের মনে হামাসা ও সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা। তিনি বলেন:
«বিপ্লবের চিন্তা, ইসলামের চিন্তা, ইমাম (রহ.) যে পথ এ দেশে চিহ্নিত করে গেছেন, সেগুলো হেইয়াত ও রওজা মজলিসগুলোতে উপস্থিত থাকতে হবে। যে ইমাম হুসাইনের প্রেমিক, সে ইসলামে রাজনৈতিক, জিহাদী, কুরবানীময় ও শাহাদাতময় ইসলামের প্রেমিক।»
মজলিসে আজায়ে হুসাইন অবশ্যই মা‘রিফাতের উৎস হতে হবে
তিনি বলেন: «হুসাইন (আ.)-এর আজাদারী মজলিস এমন মজলিস যা অবশ্যই মা‘রিফাতের উৎস হতে হবে… আমার বিশ্বাস, হুসাইনী আজাদারী মজলিসগুলো তিনটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া উচিত: প্রথম বৈশিষ্ট্য: আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি মহব্বত বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: আশুরার ঘটনা সম্পর্কে মানুষের আরও স্পষ্ট ও উজ্জ্বল মা‘রিফাত সৃষ্টি করা। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: মানুষের মধ্যে ঈমান ও ধর্মীয় মা‘রিফাত বৃদ্ধি করা।»
কোনো মাধ্যমই সমৃদ্ধ-সামগ্রীসম্পন্ন হেইয়াতের মোকাবিলা করতে পারবে না
«শত শত মাধ্যম, শত শত ভাষা ও নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে আমাদের শত্রুরা বিশ্বাস, কর্ম ও পথ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে… এর বিপরীতে আমাদের কাছে কিছু অনন্য সুবিধা আছে… তার মধ্যে একটি হলো এই মাদ্দাহ সমাজ। মুখোমুখি, মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ এবং শিল্পের মাধ্যমে ধারণা প্রচার… এটি এমন একটি অনন্য মাধ্যম যা আমাদের আছে, তাদের নেই… যদি আমাদের মিম্বর, মাদ্দাহী, হেইয়াত ও নৌহা-খানির বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ হয়, তাহলে কোনো মাধ্যমই তাদের মোকাবিলা করতে পারবে না।»
আজাদারীকে উদ্দেশ্যহীন ও হালকা আচরণে নামিয়ে আনা যাবে না
তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন যে, কিছু মাদ্দাহীতে লাফালাফি, অশ্লীল সুর ব্যবহার বা অসার কথা বলা আজাদারীর মর্যাদার পরিপন্থী। তিনি বলেন, মজলিস যেন যুবকদের কর্মক্ষম, চিন্তাশীল ও আশাবাদী করে তোলে, অলস ও অর্থহীন না করে।
উপসংহার
শহীদ নেতার চিন্তার জগতের পুনরালোচনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামী বিপ্লবের বয়ানে আজাদারী মজলিস কেবল শোকসভা নয়; বরং দেশের আধ্যাত্মিক সম্পদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত আমানতদার, গায়রত ও শজাআতের খনি উত্তোলনকারী, ইসলামী ও হামাসী পরিচয়ের স্থপতি এবং শত্রুর জ্ঞানীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সমাজের অগ্রগতির জাগ্রত কমান্ডার।
যে সমাজ ইতিহাসের কঠিন গিরিপথ অতিক্রম করে উজ্জ্বল সভ্যতা গড়তে চায়, তার জন্য এই ‘অনন্য মাধ্যম’-এর মর্যাদা, অবস্থান ও বিষয়বস্তুকে সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করা এবং এর মূল সত্তা রক্ষা করা অপরিহার্য। দেশের আধ্যাত্মিক অগ্রগতি ও জাতীয় ক্ষমতা মূলত মুনবির ও মাদ্দাহদের হিম্মত, হিকমত ও বসীরতের উপর নির্ভরশীল, যাঁরা হেইয়াতে যুবকদের হৃদয়কে আশুরার মকতবের সাথে যুক্ত করছেন। 4359115#