আল্লাহর শত্রু,মাল'ঊন ও গযবপ্রাপ্ত ইয়াহূদীদের বিকৃত কিতাব সমূহে একটু মনোযোগ দিলেই আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারব যে মৃতদের শোকে কাঁদতে বারণ ও নিষেধ করার বিধানের উৎস মূল হচ্ছে তৌরাত।যেহেতু আহল-ই কিতাব বিশেষ করে আল্লাহর শত্রু,মাল'ঊন ও গযবপ্রাপ্ত ইয়াহূদীদের সাথে হযরত উমরের সম্পর্ক, যোগাযোগ ও উঠাবসা ছিল এবং তিনি তাদের কিতাব ও গ্রন্থ সমূহ পাঠ ও অধ্যয়ন করতেন সেহেতু তৌরাত ও ইয়াহূদীদের ধর্মীয় গ্রন্থাদি দিয়ে প্রভাবিত হয়ে তিনি (উমর) এই হুকুম (মৃতের জন্য কান্নাকাটি হারাম ও নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান) মুসলমানদের মধ্যে প্রবর্তন ও প্রচলন করেছেন ও এর প্রসার ঘটিয়েছেন।
মাল'ঊন গযব প্রাপ্ত ইয়াহূদীদের কিতাবে বিদ্যমান আছে:"হে বৎস! আমি তোমার দুই চোখের শাহওয়াত (দর্শনেন্দ্রিয়ের কামনা-বাসনা এবং রিপু ও প্রবৃত্তির তাড়না) এক আঘাতেই ছিনিয়ে নেব।অতএব,আর তোমরা বিলাপ ও ক্রন্দন করো না এবং স্বীয় অশ্রু প্রবাহিত করো না।শান্ত ও ধীর স্থির হয়ে যাও এবং চুপচাপ থাকো।আর মৃতের জন্য বিলাপ ও শোক (নাওহা বা নিয়াহা) করো না।[দ্রঃ সিফর-ই হিযক্বিয়াল (হিযক্বিয়ালের পুস্তক),ইসহাহ্:২৪,১৬-১৮ফাকারাহ বা প্যারা]
**হাকিম নিশাপুরী স্বীয় সনদ সহ হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে নকল (বর্ণনা) করেছেন যে তিনি (আবূ হুরায়রা) বলেছেন যে মহানবী (সা.) (দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া) একটি জানাযার মিছিলে হাঁটছিলেন। ঠিক ঐ সময় হযরত উমর ইবনুল খাত্তাবও (রা.) তাঁর (সা.) সাথে ছিলেন। তিনি (হযরত উমর) কতিপয় মহিলাকে কান্নাকাটি করতে শুনলেন এবং তাদেরকে ধমকালেন (তিরস্কার ও বকাঝকা করে কান্নাকাটি করতে নিষেধ করলেন)।তখন হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:"হে উমর!এদেরকে (ক্রন্দন কারী মহিলাদেরকে) ছেড়ে দাও (তাদেরকে কাঁদতে দাও এবং তাদেরকে কাঁদতে বারণ ও নিষেধ করো না)। কারণ চোখ অশ্রু সজল (এবং তা অশ্রুপাত করছে শোকে);আর প্রাণ ও হৃদয় সমূহ মুসীবত (বিপদ)গ্রস্ত (শোকাভিভূত) এবং (মৃত্যুর)প্রতিশ্রুত সময় (আহদ)ও অতি নিকটবর্তী।" হাকিম নিশাপুরী বলেন:শাইখাইন অর্থাৎ ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের শর্তানুযায়ী এটি সহীহ (বিশুদ্ধ) হাদীস এবং তাঁরা দুজন এ হাদীসটি ইখরাজ (নিজ নিজ গ্রন্থে সনদ সহ উল্লেখ) করেন নি।আর আল্লামা যাহাবী আত্-তালখীস গ্রন্থে তাঁর (হাকিম নিশাপুরী) সাথে একমত পোষণ করেছেন:"তাঁদের দুজনের (ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম) শর্তের ভিত্তিতে [হাদীসটি সহীহ]।"
عن أبي هریرة قال:«خرج النبي (ص) علیٰ جنازة و معه عمر بن الخطاب،فسمع نساءً یبکین،فزبرهنّ عمرُ فقال رسول الله (ص):یا عمر دعهنّ فإنّ العینَ دامعةٌ،والنفسُ مُصابةٌ والعهدُ قریبٌ.»هذا حدیث صحیح علَی شرط الشیخین و لم یُخرِجاه.
وافقه الذهبيُّ في التلخیص:علیٰ شرطهما.
(দ্রঃহাকিম নিশাপুরীর আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন,খ:১,পৃ:৪৮৯-৪৯০, হাদীস নং ১৪৩৭);
**ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন:যখন উসমান ইবনে মায্'ঊন (রা.) মৃত্যু বরণ করেন তখন তাঁর স্ত্রী বললেন:"হে উসমান ইবনে মায্'ঊন! তোমার জন্য বেহেশত সুখকর ও মুবারক হোক।"অত:পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন:"তোমার কি তা জানা আছে (যে সে অবশ্যই বেহেশতী হবে)?"তখন উসমান ইবনে মায্'ঊনের স্ত্রী বললেন:"হে রাসূলাল্লাহ!সে তো আপনার অশ্বারোহী সৈনিক এবং আপনার সাহাবী ছিল।"এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:"আমি মহান আল্লাহর রাসূল এবং আমিও জানি না যে আমার সাথে কেমন আচরণ করা হবে?"অত:পর লোকেরা সবাই উসমানের প্রতি মায়া-মমতা বোধ ও সহমর্মিতা প্রকাশ করলেন (শোক করলেন এবং তার জন্য মহান আল্লাহর কাছে রহমত ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করলেন)।এরপর হযরত যাইনাব বিনতে রাসূলিল্লাহ (রা.) মৃত্যু বরণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:"আমাদের ভালো পূণ্যবান অগ্রবর্তী (সালাফ) উসমান ইবনে মায্'ঊনের পাশে তাঁকে সমাহিত কর।"অত:পর মহিলারা ক্রন্দন করলে উমর তাদেরকে দুররা (চাবুক) মারতে লাগলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাত পাকড়াও করলেন,ধরলেন এবং তাকে বললেন:"হে উমর!শান্ত ও বিনম্র হও।"
আল্লামা যাহাবী আত্-তালখীস গ্রন্থে বলেছেন:এ হাদীসটির সনদ ভালো এবং এ সম্পর্কে হাকিম কিছু না বলে নীরব থেকেছেন (অর্থাৎ কিছু বলেন নি)।"
(দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন,খ:৩,পৃ:৪০০,হাদীস নং ৪৯৩২)
ح۴۹۳۲--عن ابن عباس (رض) قال:لما مات عثمان بن مظنون قالت امرأته:«هنیئاً لک الجنة یا عثمان بن مظعون»فنظر إلیها رسول الله (ص) و قال:«وما یدریک؟»قالت:«یا رسول الله!فارسک و صاحب.»فقال رسول الله (ص):«إني رسول الله و ما أدري ما یفعل بي؟!»فأشفق الناس علیٰ عثمان.فلما مات زینب بنت رسول الله (ص) قال رسول الله (ص):ألحقوها بسلفنا الخیِّر عثمان بنِ مظنون.فبکت النساء فجعل عمرُ یضربُهن بطوطه فأخذ رسول الله (ص) یده و قال: مهلاً یا عمرُ!»
قال الذهبي في التلخیص:سند صالح و سکت عنه الحاکم.
**সালামাহ্ ইবনুল আরযাক্ব বলেন: আমি হযরত আবূ হুরায়রাকে (রা.) বলতে শুনেছি:আল-ই রাসূলুল্লাহর (রাসূলুল্লাহর আত্মীয়দের) মধ্য থেকে এক ব্যক্তির মৃত্যু হলে মহিলারা একত্রিত হয়ে তার জন্য কাঁদতে থাকেন।অত:পর হযরত উমর (রা.) উঠে তাদেরকে (কাঁদতে) নিষেধ করতে এবং তাদেরকে তাড়াতে লাগলেন।তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন:তাদেরকে ছেড়ে দাও হে উমর!কারণ,চোখ অশ্রু সজল ( চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে),হৃদয় (দিল) হচ্ছে মুসীবত গ্রস্ত (বিপদে ও মৃত্যুতে শোকাভিভূত) এবং (মৃত্যুর) প্রতিশ্রুত সময় (আহদ) অতি নিকটবর্তী।
أن سلمة بن الأرزق قال: سمعت أبا هریرة قال:مات میت من آل رسول الله (ص),فاجتمع النساء یبکین علیه،فقام عمر ینهاهن و یطردهن،فقال رسول الله (ص):دعهن یا عمر!فإن آلتین دامعة،و القلب مصاب،والعهد قریب.
সুনান-ই নাসায়ী,পৃ;৩২৪-৩২৫, হাদীস নং ১৮৫৮,মৃতের জন্য ক্রন্দনের অনুমতি সংক্রান্ত অধ্যায়;
মুসনাদ-ই আহমাদ,খ:২,পৃ:৩৩৩
আজ ওয়াহহাবী সালাফিস্টরা কথায় কথায় বলে যে মৃতের জন্য কান্নাকাটি ও শোক প্রকাশ ইত্যাদি বিদ'আত ও হারাম।আর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের (রা.) এবং স্বয়ং হযরত উমরের দৃষ্টিতে এ কাজ করলে অর্থাৎ মৃতের আত্মীয় স্বজন মৃতের জন্য কাঁদতে থাকলে মৃতের নাকি আযাব হয় (তাকে শাস্তি দেওয়া হয়)!! অথচ হযরত আয়েশা (রা.) হযরত উমর ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের এ কথা ও অভিমত খণ্ডন করেছেন নিম্নোক্ত হাদীস সমূহে:
**ইবনে উমর থেকে বর্ণিত। তিনি (হযরত ইবনে উমর) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:"মৃত ব্যক্তি (মাইয়িত) অবশ্যই তার জন্য তার পরিবারের ক্রন্দনের কারণে আযাব (শাস্তি) প্রাপ্ত হয়!!!" অত:পর তা হযরত আয়েশার কাছে উল্লেখ করা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন:"আর মহানবী (সা.) কি একটি কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিলেন যে এ কবরে শায়িত ব্যক্তি অবশ্যই আযাব পাচ্ছে এবং তার পরিবার-পরিজন তার জন্য কাঁদছে?!"এরপর "কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করে না।"---এ আয়াতটি তিনি (হযরত আয়েশা) তিলাওয়াত (পাঠ) করলেন।(সুনান-ই নাসায়ী,কিতাবুল জানায়িয,পৃ:৩২৪, হাদীস নং ১৮৫৪)
عن ابن عمر قال:قال رسول الله (ص):«إن المیِّت لیعذَّب ببکاء أهله علیه» فذُکرَ ذلک لعائشة فقالت: و هل إنّما مرّ (ص) علیْ قبر فقال:صاحب القبر لیعذَّب،و إنّ أهله یبکون علیه،ثمّ قرأت:«ولا تزر وازرة وزیر أخریٰ.
**আব্দুল্লাহ ইবনে আবী বকর থেকে যিনি নিজ পিতা আবূ বকর থেকে যিনি আমরাহ্ থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি (আমরাহ) তাঁকে (আবূ বকরকে) জানিয়েছেন যে তিনি (আমরাহ্) হযরত আয়েশাকে (রা) বলতে শুনেছেন ঐ সময় যখন তাঁর (আয়েশা) কাছে উল্লেখ করা হল যে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর বলেন যে মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতের কাঁদার কারণে ঐ মৃত ব্যক্তিকে অবশ্যই আযাব (শাস্তি) দেওয়া হবে।তখন হযরত আয়েশা (রা.) বললেন: মহান আল্লাহ আবূ আব্দির রহমানকে ক্ষমা করুন। তিনি মিথ্যা বলেন নি,তবে তিনি ভুলে গেছেন (forgot) অথবা ভুল করে (এ কথা) বলেছেন!!! রাসূলুল্লাহ (সা.) এক ইয়াহূদী নারীর জানাযার (লাশ) পাশ দিয়ে গমন করছিলেন এবং তার (মৃত ইয়াহূদীয়াহ নারী) জন্য কান্নাকাটি করা হচ্ছিল।তখন তিনি (সা.) বললেন: "তার জন্য কান্নাকাটি করা হচ্ছে (তার আত্মীয় স্বজনরা তার জন্য কাঁদছে) এবং সে আযাব প্রাপ্ত হচ্ছে।"(দ্রঃ সুনান-ই নাসায়ী,কিতাবুল জানায়িয,পৃ:৩২৪, হাদীস নং ১৮৫৫)
عن عبد الله بن أبي بکر عن أبيه عن عمرة أنها أخبرته أنها سمعت عائشة و ذکر آنها أن عبد الله بن عمر بقول: إن المیت لیعذب ببکاء الحي علیه،قالت عائشة یغفر الله لأبي عبد الرحمن،أما إنه لم یکذب،ولکن نسي أو أخطأ،إنما مرّ رسول الله (ص) علیْ یهودیة یبکیٰ علیها فقال:إنهم یبکون علیها،و إنها لتعذَّب.
যা হোক, এ সব কথার উৎস হচ্ছেন স্বয়ং হযরত উমর (রা.) যিনি এ বিধানের ক্ষেত্রে তৌরাত দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনে করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.) মৃতের জন্য কাঁদতে নিষেধ করেছেন এবং মৃতের জন্য জীবিত আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতরা কাঁদলে মৃতের আযাব ও শাস্তি দেওয়া হয়।
মুসলমানদের ওপর গযবপ্রাপ্ত মাল'ঊন ইয়াহূদীদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের কারণ হল যে হযরত উমর সহ অনেক সাহাবা মদীনায় মহানবীর (সা.) জীবদ্দশায় মুমিন -মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু,মাল'ঊন ও গযবপ্রাপ্ত ইয়াহূদীদের তৌরাত পাঠ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিভ্রান্তকর ধর্মীয় কিসসা-কাহিনী বয়ানের আসর ও জলসায় যোগ দিতেন যা মিশকাত শরীফে উল্লেখিত হয়েছে।যেমন:
১৬৮-(৩৬) হযরত জাবের (রা:) নবী করীম (সা.) হইতে বর্ণনা করেন যে একদিন যখন হযরত উমর (রা.) নবী করীমের নিকট আসিয়া বলিলেন,"হুযূর!আমরা ইহুদীদের নিকট তাহাদের অনেক ধর্মীয় কাহিনী শুনিয়া থাকি যাহা আমাদের নিকট 'অতি চমৎকার' বোধ হয়;উহা কিছু লিখিয়া রাখার জন্য হুযূর আমাদের অনুমতি দেন কি?*১"হুযূর বলিলেন,"তোমরাও কি (দ্বীন সম্পর্কে) দ্বিধাগ্রস্ত রহিয়াছ?খোদার কসম!আমি তোমাদের নিকট
সম্পূর্ণ উজ্জ্বল ও পরিস্কার দ্বীন আনিয়াছি।(ইহুদীদের নবী হযরত মূসাও যদি বাঁচিয়া থাকিতেন, তাহা হইলে তাহার পক্ষেও আমার অনুসরণ ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।---আহমদ স্বীয় হাদীস গ্রন্থে এবং বায়হাক্বী এ হাদীসটি শু'আবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেন)
সূত্র:মিশকাত শরীফ খ:৯,পৃ:১২৯
۱۶۸-(۳۶) و عن جابر عن النبي (ص) حین أتاه عمر فقال:إنّا نسمع أحادیثَ من یهود تُعجِبُنا أفتریٰ أن نکتبَ بعضَها فقال: أ متهوِّکون أنتم کما تهوَّکت الیهود و النصاریٰ لقد جئتکم بها بیضاءَ نقیَّةً و لو کان موسیٰ حیَّاً ما وسِعَهُ إِلَّا اتِّباعي (رواه أحمدُ و البیهقي في شُعَبِ الإِیمان)
এ হাদীস থেকে স্পষ্ট লক্ষ্যণীয় যে মাল'ঊন গযব প্রাপ্ত ইয়াহূদীদের এ সব বাতিল মিথ্যা বিভ্রান্ত কর কিসসা-কাহিনী, ঐতিহ্য ও রেওয়ায়ত অর্থাৎ ইসরাঈলীয়াত মহানবীর (সা.) যুগে সাহাবাদের কাছে এমনকি হযরত উমরের (রা.) মত নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছেও 'অতি চমৎকার' বলে মনে হত অর্থাৎ তারা এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং এর ফলে ইয়াহূদীদের তৌরাতের দার্স ও শিক্ষা এবং তাদের এ সব অল্প কাহিনী ও ঐতিহ্য প্রচ্ছন্ন ও অবচেতন ভাবে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।আর ইয়াহূদীরা এই সুযোগে মুসলমানদের মাঝে সুকৌশলে নিজেদের বাতিল মিথ্যা কল্পকাহিনী ও ঐতিহ্য (ইসরাঈলীয়াত) বর্ণনা করেছে,ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং এগুলোর প্রসার ঘটিয়েছে।খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে হযরত উমর মহানবীর (সাঃ) কাছে এসে বলেছিলেন যে ইয়াহূদীদের এই সব বাতিল কল্পকাহিনী ও উপাখ্যান (আসাত্বীর اساطیر) তাদের কাছে অতি চমৎকার লাগে এবং সেগুলো লিখে রাখার জন্য রাসূলের (সা.) কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন।তখন রাসূল (সা.) হযরত উমরের এ কথায় বলেছিলেন," ইয়াহূদীরা যেমন দ্বীনের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত গ্রস্ত হয়েছে ঠিক তোমরাও কি দ্বীনের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত (মুতাহাওওয়িক مُتَهَوِّک) আছ?"এরপর তিনি উমরকে বলেছিলেন যে তিনি তাদের কাছে সম্পূর্ণ উজ্জ্বল ও পরিস্কার (পবিত্র, বিশুদ্ধ ও অবিকৃত) দ্বীন এনেছেন যার অর্থ হচ্ছে ইয়াহূদীদের ধর্ম ও ধর্মীয় গ্রন্থ সঠিক,উজ্জ্বল,পরিস্কার,স্বচ্ছ,বিশুদ্ধ ও অবিকৃত নয় বরং ইয়াহূদীরা তাদের ধর্মে সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়েছে ও বিকৃতি সাধন (তাহরীফ) করেছে যা পবিত্র কুরআনেও স্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে।যেমন:
فویل للذین یکتبون الکتاب بأیدیهم ثم یقولون هذا من عند الله لیشتروا به ثمناً قلیلاّ ،فویل لهم ممّا کتبت أیدیهم و ویل لهم ممّا یکسبون(البقرة:۷۹)
সুতরাং দুর্ভোগ তাদের (ইয়াহূদী পণ্ডিত ও আলেমগণ) জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে,"এটা আল্লাহর নিকট থেকে (অবতীর্ণ)।"তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য (আছে) শাস্তি তাদের এবং যা তারা উপার্জন করে তার জন্য (আছে) শাস্তি তাদের।(সূরা-ই বাকারা:৭৯)
বিচ্যুত পথভ্রষ্ট ইয়াহূদী আলেম ও পণ্ডিতরা নিজেদের মনগড়া অনেক কিছু রচনা করে বলে ও দাবী করে যে তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আবার তৌরাতের অনেক কিছুই যেমন: তৌরাতে উল্লেখিত আমাদের মহানবীর চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যাবলী মিটিয়ে ও হটিয়ে দিয়ে তদস্থলে নিজেদের থেকে মনগড়া চারিত্রিক গুণাবলী সংযোজন করেছে যাতে বনী ইসরাইল এবং আহলে কিতাব সম্প্রদায়ের সত্যান্বেষী ব্যক্তিরা যেন তৌরাতে মহানবীর (সা.) গুণাবলী খুঁজে না পায়।অতএব এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তারা (ইয়াহূদী উলামা ও আহবার) তৌরাতের মূল পাঠ অর্থাৎ মতনেও (text) বিকৃতি (তাহরীফ) ঘটিয়েছে।আর এটা তৌরাতের অর্থগত বিকৃতি হতে ভিন্ন। আরেকটি আয়াতে এসব বিচ্যুত পথভ্রষ্ট অভিশপ্ত ইয়াহূদী আলেম ও পণ্ডিতরা তৌরাতের অর্থগত বিকৃতিও (তাহরীফে মা'নাভি) সাধন করেছে।যেমন:
من الذین هادوا یحرفون الکلم عن مواضعه.......
ইয়াহূদীদের মধ্যে কতক লোক কথা ও বাণী সমূহের অর্থ বিকৃত করে ......(সূরা-ই নিসা:৪৬)।কথা সমূহ বলতে সাধারণ কথাবার্তা ও কথোপকথন (কালিম کلم) হতে পারে এবং তৌরাতও হতে পারে। খুবই আশ্চর্যের বিষয় যে হযরত উমরের মতো নেতৃত্ব স্থানীয় সাহাবারা ইয়াহূদীদের বিকৃত তৌরাত এবং তাদের মিথ্যা,অলীক,বাতিল ও কাল্পনিক কিসসা কাহিনী (ইসরাঈলীয়াত) ও ঐতিহ্য শুনতে যেতেন যা নীচের এ দুটো হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে।
ক) ১৪৮(১৬) হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন," আহলে কিতাবগণ তাওরাত হিব্রু ভাষায় পাঠ করিত এবং মুসলমানদের (অর্থাৎ সাহাবাদের; কারণ তখনকার অর্থাৎ মহানবীর (সাঃ) যামানায় মদীনার মুসলমানরা ছিলেন সাহাবা) উহা আরবী ভাষায় বুঝাইত।(ইহা জানিতে পারিয়া) রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন,"আহলে কিতাবদের সমর্থন করিও না এবং তাহাদের মিথ্যুক ও মনে করিও না।(কারণ তাওরাত আল্লাহর কিতাব।ইহাতে যাহা অবিকৃত রহিয়াছে তাহা সত্য ও সমর্থনযোগ্য।আর যাহা তাহারা যোজনা করিয়াছে তাহা মিথ্যা ও সমর্থনের অযোগ্য।) সুতরাং তাহাদেরকে বল,"আমরা আল্লাহতে বিশ্বাস করিয়াছি।আর যাহা আমাদের প্রতি নাযিল করা হইয়াছে আয়াতের শেষ পর্যন্ত।
عن أبي هریرة رضي الله عنه.قال:کان أهل الکتاب یقرؤون التوراة بالعبرانیة و یفسرونها بالعربیة لأهل الاسلام،فقال رسول الله (ص) لا تصدِّقوا أهل الکتاب و لا تکذٌّبوهم و قول:«آمنّا بالله و ما أنزل إلینا البقرة:۱۳۶ الآیة.
(দ্রঃ সহীহুল বুখারী,কিতাবু তাফসীরিল কুর'আন(২) সূরা-ই বাক্বারা,বাব১১/১১),পৃ:১০৯৫, হাদীস নং ৪৪৮৫
এবং মিশকাত শরীফ,আ:৯,পৃ:১১৬)
খ).১৮৪---(৫২) হযরত জাবের (রা.) বলেন:একদিন হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট তাওরাত কিতাবের একটি কপি আনিয়া বলিলেন,"ইয়া রাসূলাল্লাহ!ইহা তাওরাতের একটি কপি।হুযূর চুপ রহিলেন।ওমর উহা পড়িতে আরম্ভ করিলেন;আর এ দিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা বিবর্ণ (পরিবর্তিত) হইতে লাগিল।ইহা দেখিয়া হযরত আবুবকর বলিলেন,"ওমর! তোমার সর্বনাশ হউক (তোমার জন্য বিলাপ কারিনীগণ বিলাপ করুক)। তুমি কি দেখিতেছ না যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা কি রূপ ধারণ করিতেছে?"তখন ওমর (রা.) রাসূলুল্লাহর (সা.) চেহারার প্রতি তাকালেন এবং (চেহারায় ক্রোধের ভাব লক্ষ্য করিয়া) বলিলেন,"আমি আল্লাহর ক্রোধ ও তাহার রাসূলের ক্রোধ হইতে আল্লাহর নিকট পানাহ চাহিতেছি এবং আমরা আল্লাহকে রব্ব,ইসলামকে দ্বীন ও মুহাম্মাদ (সা.)কে নবী হিসাবে পাইয়া খুশী হইয়াছি।*২
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলিলেন,"আল্লাহর কসম!যাহার অধিকারে আমার জীবন রহিয়াছে এ সময় যদি তোমাদিগের নিকট (তাওরাতের নবী স্বয়ং) মূসাও যাহির (আবির্ভূত) হইতেন,আর তোমরা আমাকে ছাড়িয়া তাহার অনুসরণ করিতে,তাহা হইলেও তোমরা নিশ্চয়ই সরল পথ হইতে গোমরাহ হইয়া যাইতে।এমন কি তিনি যদি জীবিত থাকিতেন;আর আমার যামানা পাইতেন তাহা হইলে তিনিও নিশ্চয়ই আমার অনুসরণ করিতেন।---দারেমী
و عن جابر أن عمر بن الخطاب رضي الله عنه أتیٰ رسول الله (ص) بنسخة من التوراة فقال: یا رسول الله هذه نسخة من التوراة فسکت فجعل یقرأ و وجه رسول الله (ص) یتغیَّر فقال أبو بکر:ثکلتک الثواکل ما تریٰ ما بوجه رسول الله (ص)؟فنظر عمرُ إلیٰ وجه رسول الله (ص) فقال:أعوذ بالله من غضب الله و غضب رسوله رضینا بالله ربّاً و بالإسلام دیناً و بمحمَّد نبیّاً فقال رسول الله (ص):والذي ونفس محمد بیده لو بدأ لکم موسیٰ فاتٌَبعتموه.......
*২ রাসূলুল্লাহর (সা.) সামনে তৌরাত পড়ার কারণে মহানবী (সা.) হযরত উমরের প্রতি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট,ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিত হলে ঈমান বরবাদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় হযরত উমর আল্লাহর কাছে আল্লাহর ক্রোধ ও তাঁর রাসূলের ক্রোধ থেকে পানাহ চাইলেন এবং পুনরায় ঈমান আনলেন যা উক্ত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে!!আর মহানবী (সা) হযরত উমরকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন যে মহানবীর বে'সাত (নবী-রাসূল হিসেবে প্রেরিত হওয়া) এবং পবিত্র কুরআন নাযিল হওয়ার পর কেউ যদি তাওরাত এবং হযরত মূসার (আ) অনুসরণ করে তাহলে সে সরল পথ হতে গোমরাহ হয়ে যাবে এবং মূসাও যদি আবির্ভূত হতেন তাহলে তিনিও হযরত রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করতেন!!!!
১.কিন্তু অত্যন্ত তাজ্জবের বিষয় হল যে হযরত উমর (রা.) যিনি ইয়াহূদীদের বাতিল মিথ্যা ধর্মীয় কিসসা-কাহিনী (ইসরাইলীয়াত) ও ঐতিহ্য যেগুলো তার কাছে অতি চমৎকার ও আকর্ষণীয় বলে মনে হত মহানবীর কাছে (সাঃ) সেগুলো লিখে রাখার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং সত্য দ্বীন সম্পর্কে ইয়াহূদী ও নাসারা যেমন দ্বিধাগ্রস্ত ঠিক তেমনি তোমরাও কি দ্বিধাগ্রস্ত?-- মহানবী (সা.) এ প্রশ্ন উত্থাপন করে বাতিল মিথ্যা ইসরাইলীয়াত লেখার অনুমতি দেন নি অথচ তিনি (হযরত উমর) ও তার আগে পবিত্র কুরআনের সাথে হযরত রাসূলুল্লাহর (সা.) হাদীসের (মুখনিঃসৃত বাণী) সংমিশ্রণ ঘটা এবং জনগণ যে পবিত্র কুরআন বাদ দিয়ে অথবা এর প্রতি কম গুরুত্ব আরোপ করে রাসূলুল্লাহর হাদীস ও সুন্নাহ চর্চায় বেশি বেশি ব্যস্ত হয়ে যাবে এ ধরনের ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে ও দোহাই দিয়ে হযরত রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র হাদীস ও সুন্নাহ বর্ণনা ও রেওয়ায়েত করা সংক্রান্ত ১ম খলীফা হযরত আবু বকরের নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোর ভাবে বহাল রাখেন এবং নিজেও সাহাবাদেরকে মহানবীর (সা.) হাদীস কম রেওয়ায়েত (বর্ণনা) করতে বলতেন।*
কুরাযা ইবনে কা'ব বলেছেন:আমরা ইরাকের উদ্দেশ্যে বের হলাম এবং হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব আমাদের সাথে সিরার পর্যন্ত হেঁটে আসলেন।এরপর তিনি ওযূ করলেন এবং বললেন:আপনাদের কি জানা আছে যে কেন আমি আপনাদের সাথে এ পর্যন্ত হেঁটে এসেছি?তারা বললেন: হ্যাঁ,আমরা রাসূলুল্লাহর (সা.) সাহাবা;তাই আপনি আমাদের সাথে হেঁটেছেন। তিনি বললেন: আপনারা এমন এক জনপদের অধিবাসীদের কাছে গমন করছেন যারা মৌমাছির গুঞ্জনের মতো পবিত্র কুরআন গুঞ্জন করে তিলাওয়াত করে।তাই তাদের কাছে প্রথমেই হাদীস বর্ণনা করবেন না যাতে তারা আপনাদেরকে হাদীস বর্ণনার মধ্যে মশগুল করে ফেলবে (পবিত্র কুরআন চর্চা বাদ দিয়ে তারা আপনাদেরকে হাদীস বর্ণনা করতে বলবে)।তাই আপনারা কুরআনকে (হাদীস বর্ণনা ও চর্চা থেকে) মুক্ত করবেন ও রাখবেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে হাদীস বর্ণনা কম করবেন।আপনারা যান এবং আমি আপনাদের শরীক হব (আপনাদের সাথে মিলিত হব)।অত:পর কুরাযা যখন ঐ জনপদে পৌঁছালেন তখন উক্ত জনপদের অধিবাসীরা তাকে বলল: আমাদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সা.) হাদীস বর্ণনা করুন।তখন তিনি বললেন: উমর ইবনুল খাত্তাব আমাদেরকে নিষেধ করেছেন।"
এটা সহীহুল ইসনাদ হাদীস।এর বেশ কিছু সূত্র রয়েছে যেগুলোর ওপর ঐকমত্য পোষণ করা এবং যেগুলো নিয়ে পারস্পরিক আলোচনাও করা যায়......।
যাহাবী আত-তালখীস গ্রন্থে হাকিম নিশাপুরীর সাথে একমত পোষণ করেছেন: হাদীসটি সহীহ এবং এর বেশ কিছু সনদ সূত্র রয়েছে। (দ্রঃ আল-মুস্তাদরাক আলাস সাহীহাইন, খ:১,পৃ:২০৩, হাদীস নং ৩৫০)
ইসলামী চিন্তাবিদ এবং গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলেমিন মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান