হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলভী তেহরানী মসজিদে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এ আয়োজিত সাপ্তাহিক বক্তৃতা সিরিজে ভিলায়েতের সত্যতাকে হেদায়েতের সারবস্তু ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনকে রক্ষা করা এবং নববী ও আলভী সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে ইমামত বিলোপ ও ধর্মীয় পরিচয় বিলোপের প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইমামতের ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
এই বক্তৃতার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: «إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ…»
“যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েত গোপন করে, যা আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি…”
এরপর আল্লাহ বলেন: «أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ» — আল্লাহ তাদের লানত করেন এবং সকল লানতকারীও তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কুরআন নিজেই গোপন করার কথা বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে «مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ» অর্থাৎ সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েতের উপায়সমূহ। সুতরাং কথা হচ্ছে এমন এক সত্যের যা কুরআন মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই সত্যের দুটি মৌলিক কাজ: একটি বাইয়্যিনাত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) এবং অপরটি হেদায়েত (পথপ্রদর্শন)।
ইমাম সাদেক (আ.) থেকে ইবনে আবী হামজার একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতের অর্থ হলো আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)। অর্থাৎ মানুষ তাঁর ভিলায়েত ও ইমামতের সত্যতা গোপন করেছে। সেই মহান সত্তা ছিলেন একইসাথে বাইয়্যিনাহ ও হেদায়েত। সুতরাং বিষয়টি শুধু কুরআনের শব্দ নয়, বরং সেই সত্যের যা কুরআন উপস্থাপন করেছে।
কিছু আরবি কবিতা ও রজজেও এই অর্থ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় হযরত যুহাইর ইবনে কায়ন বাজালী সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত লাভ করেছেন এবং তাঁর পথে শাহাদাতবরণ করা তাঁর জন্য হেদায়েতেরই নামান্তর। সুতরাং ইমামতের বিষয়টি মূলত হেদায়েতের বিষয়।
আলোচনা এখান থেকে শুরু হয় যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ধরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য মজলিস, আজাদারী ও স্মরণসভা আয়োজন করে? কেন এই ঐতিহ্য স্থায়ী? এবং কেন এটি শুধুমাত্র মুস্তাহাব নয়, বরং একাধিক দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি ও ওয়াজিব?
এই মজলিসগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো জনগণের মধ্যে দ্বীনদারির মূল স্তম্ভকে সংরক্ষণ করা। সমাজে যে পরিমাণ দ্বীনদারি, নামাজ, রোজা এবং ধর্মীয় মা‘রিফাতের সাথে সম্পর্ক অবশিষ্ট রয়েছে, তার এক বড় অংশই এই মজলিসগুলোরই ফল। তাই শত্রুরাও এই মাহফিলগুলোর বিরোধিতা করে; কারণ এই জলসাগুলো হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল।
কখনো কখনো বলা হয়, এই মজলিসের পরিবর্তে শুধু দান-সদকা ও অসহায়দের সাহায্য করাই যথেষ্ট, অথবা মা‘রিফাত শিক্ষার পরিবর্তে অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। অথচ বাস্তবতা এই যে, যেসব সুস্থ ও কার্যকর দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সমাজে গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশই এই আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসগুলো থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং হেদায়েত ও মা‘রিফাত— সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
মানবসমাজ যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে, তেমনি হেদায়েতেরও প্রয়োজন রয়েছে। কেউ যদি বলে যে, জীবিকা বা স্বাস্থ্যসেবার কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা ও হেদায়েতের ক্ষেত্র বন্ধ করে দিতে হবে, অথবা সব সামর্থ্য শুধু একটি খাতে ব্যয় করতে হবে— এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। উভয় ক্ষেত্রই অপরিহার্য এবং পরস্পর পরিপূরক। তদুপরি, সমাজে যেসব কল্যাণমূলক ও সেবামূলক কাজ চলছে, তার অনেকগুলোই আসলে এই ধর্মীয় মজলিস ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাহফিল থেকেই জন্ম নিয়েছে।
মানুষ সত্যিই তাদের জন্য অন্তর থেকে দুঃখ অনুভব করে; কারণ ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি আহলে বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁদের চেয়ে এই লোকেরা অনেক ছোট। আজ তাঁদের নামও অবশিষ্ট নেই। মু‘আবিয়া ও সেই যুগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যতই ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ছিলেন, চলে গেছেন এবং তাঁদের কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নাম ও পথ আজও জীবন্ত ও প্রবাহমান। আল্লাহর ওয়াদাও তো এটাই: «يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ… وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ» — তারা আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দানকারী।
এই ভিত্তিতে আমরা এই আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য স্মরণসভা ও আজাদারী মজলিস আয়োজন করে। এর উত্তরে দুটি মৌলিক বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, মহান আল্লাহ যখন দ্বীনের নে‘মতের কথা বলেন, তখন তিনি ‘মিন্নাত’ শব্দটি ব্যবহার করেন; অর্থাৎ অত্যন্ত মহান নে‘মত। পবিত্র কুরআন বলে: «لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ…» — নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। এই বাচনভঙ্গি প্রমাণ করে যে, হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের নে‘মত অত্যন্ত মহান ও মৌলিক। অন্য অনেক নে‘মতের ক্ষেত্রে, যেমন পৃথিবী ও সমুদ্রকে মানুষের অধীন করে দেওয়া, এমন ‘মিন্নাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং দ্বীন একটি অত্যন্ত মহান ও মৌলিক নে‘মত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তাঁর কাছেই চায়। কিন্তু একই সাথে তিনি নিজেই আমাদেরকে সর্বোত্তম চাওয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন কোনো বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনো কখনো বিশেষ কোনো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তেমনি আল্লাহ তা‘আলাও নামাজের মধ্যে আমাদেরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদেরকে প্রতিদিন নামাজে বারবার বলতে হয়: «اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ»
এটি হেদায়েতের দোয়া; অর্থাৎ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহর হেদায়েত। এখান থেকেই সূরা আন‘আমের পবিত্র আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন: «قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا…»
“বলো, নিশ্চয় আমার রব আমাকে সরল পথের দিকে হেদায়েত করেছেন; এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী দ্বীন।”
সুতরাং সিরাতে মুস্তাকীম বলতে আল্লাহর দ্বীনকেই বোঝানো হয়েছে— যা মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নে‘মত।
আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.) মালিক আশতারকে লিখিত পত্রে বলেন: «فَإِنَّ هَذَا الدِّينَ قَدْ كَانَ أَسِيرًا فِي أَيْدِي شِرَارِ النَّاسِ»
“এই দ্বীন একসময় নিকৃষ্টতম মানুষদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছিল।”
দ্বীনের বাহ্যিক রূপ অবশিষ্ট ছিল, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সত্যতা মানুষের প্রবৃত্তির কবলে পড়ে গিয়েছিল। দ্বীন প্রথমে সাকীফার ধারার এবং পরে বনী উমাইয়্যার খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই এমন কাউকে কিয়াম করতে হবে যিনি এই বন্দি দ্বীনকে মুক্ত করবেন।
এ প্রসঙ্গে আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি বসরার নেতৃবৃন্দের প্রতি লিখিত পত্রে বলেছিলেন: «وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ…»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করছি।”
এই বাক্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এই মহান আন্দোলন ছিল দ্বীনের সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সমাজকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। যদি এই মহান কিয়াম না ঘটত, তাহলে হয়তো সেই যুগের বিভ্রান্তি ও বিকৃতির অন্ধকারে দ্বীনের সত্যতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেত।
হযরত আরও বলেন: «أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ نَبِيِّهِ»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি।”
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সেই সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ভুলে যাওয়া হয়েছিল এবং বিদ‘আতগুলো জীবিত হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ দ্বীনের বাহ্যিক রূপ টিকে ছিল, কিন্তু তার আসল সত্যতা ও সারবস্তু ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছিল। সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে যদিও নামাজ ও রোজার বাহ্যিক রূপ চালু ছিল, কিন্তু দ্বীনের আসল সত্যতা বন্দিত্বের শিকার হয়েছিল। অনেক সময় দ্বীনের নামে এমন কাজ করা হতো যা দ্বীনের সঠিক রূপেও ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, নফল নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হতো, অথচ নববী সুন্নাতে এর কোনো স্থান ছিল না।
সুতরাং যখন ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন, “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি”, তখন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দ্বীনের আসল সত্যতার দিকে ফিরিয়ে আনা, শুধু তার বাহ্যিক রূপ নয়। অনেক সময় এই বাহ্যিক রূপই মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কেউ হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, ধর্মীয় মজলিসে উপস্থিত থাকে অথবা ইবাদতগুজার হয়, কিন্তু এই বাহ্যিকতা একা দ্বীনের অভ্যন্তরীণ সত্যতা ও সুস্থতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দ্বীনের মূল সারবস্তু এই বাহ্যিকতার চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্যটি সেই চিঠিতে রয়েছে, যা তিনি হযরত মুসলিম ইবনে আকীল (আ.)-এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত ‘ইমাম’ এর সত্য স্বরূপকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমাম বলেন:
«فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের কসম! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কুরআনের উপর আমল করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, সত্য দ্বীনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। অতএব, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হিজরত ও কিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনকে দুষ্টদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা।
১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) আসলে কোন সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? তিনি কি শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও হজ্জের হেফাজতের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি এর চেয়ে অনেক গভীর ও মৌলিক কোনো বিষয় ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর ফিরে যায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠ (কিরাআত) গঠনের ইতিহাসে। নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজে ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠের উদ্ভব ঘটে।
প্রথম পাঠটি সাকীফার ঘটনায় আবির্ভূত হয়। সেই ধারার পরিকল্পনাকারীরা ইমামকে সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ‘সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়বিচার’ ও ‘সকল সাহাবীর সমান মর্যাদা’র মতো শ্লোগান দিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে শুধু আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করে সব সাহাবীকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। এই পন্থার ফল ছিল ইমামকে কোণঠাসা করে দেওয়া এবং সমাজের মূল হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সত্যিকারের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া।
সাকীফার ঘটনায় মূল প্রচেষ্টা ছিল আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-কে ইসলামী সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তাই এ কথা ভাবা ঠিক হবে না যে, তিনি ও তাঁর মহান সন্তানগণ সেই যুগের যুদ্ধ পরিচালনা বা ক্ষমতা কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত সেই ধারার লক্ষ্য ছিল এই পবিত্র খান্দানকে সমাজের হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া, তাঁদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা নয়। কারণ এমনটি করা তাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী ছিল।
অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর কাছে পরামর্শ চাওয়া হতো এবং তিনি হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করে উত্তর দিতেন। এটি ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়; কারণ ইমামের দায়িত্ব হলো হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেওয়া। এমনকি মু‘আবিয়া বা ইয়াযীদের মতো ব্যক্তি কোনো প্রশ্ন করলেও ইমাম সত্য গোপন করতেন না। কারণ যদি আল্লাহর হুজ্জাত প্রকাশ না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন কেউ যেন অজুহাত দেখাতে না পারে যে, তাকে হেদায়েতের পথ দেখানো হয়নি।
রেওয়ায়েতেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন, কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, যখন ইবলিস হযরত মূসা (আ.)-এর সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আমার জন্য কি ফিরে আসার কোনো পথ আছে?” তখন হযরত মূসা (আ.) বললেন, “যদি আল্লাহর নির্দেশ মেনে নাও এবং হযরত আদম (আ.)-এর কবরের সামনে সিজদা করো, তাহলে তোমার জন্য তওবার পথ খুলে যাবে।” কিন্তু ইবলিস অহংকারবশত সেই নির্দেশ মেনে নেয়নি। এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো— আল্লাহর অলীগণ হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেন, যদিও কেউ কেউ অহংকারের কারণে তা গ্রহণ করে না।
প্রথম পাঠের বিপরীতে, যা ইমামতকে কোণঠাসা করার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় পাঠ বনী উমাইয়্যার যুগে গড়ে ওঠে। এই দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য ছিল যে, প্রথম ধারাটি মূলত ইমামকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উমাইয়্যারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইমামতকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। এই যুগ থেকেই ইমামদের শারীরিকভাবে নির্মূল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়: আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর শাহাদাত, ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত এবং অতঃপর আশুরার ঘটনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত।
সেই ধারার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী সমাজে ইমামত নামক কোনো বিষয় যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতে মু‘আবিয়া ও মুগীরার মধ্যকার সংলাপের কথা এসেছে। মুগীরা মু‘আবিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসেন। যখন তাঁর কাছে কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন: আমি মু‘আবিয়াকে বলেছিলাম, এখন ক্ষমতা তোমার হাতে, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই বনী হাশেমের সাথে নম্র আচরণ করো এবং কঠোরতা পরিহার করো। কিন্তু মু‘আবিয়া এমন একটি কথা বলেন যা তাঁর আসল উদ্দেশ্য উন্মোচিত করে দেয়। তিনি বলেন: আমার আগে যারা এসেছিলেন, কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং চলে গেছেন, তাঁদের কোনো নামই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই ব্যক্তি অর্থাৎ ইসলামের নবী (সা.)-এর নাম এখনও প্রতিদিন বহুবার মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। আজানে বলা হয়: «أشهد أن محمدًا رسول الله»। অতঃপর তিনি তীব্র বিদ্বেষের সাথে বলেন, যতক্ষণ এই নাম উচ্চারিত হবে, ততক্ষণ আমাদের কোনো শান্তি নেই।
এই ঐতিহাসিক বর্ণনা স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের মূল সমস্যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ছিল না; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)-এর স্মৃতি ও বার্তাকে ম্লান করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একেবারে মুছে ফেলা। এখান থেকেই সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদি শত্রু এই পথের নাম ও সত্যতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে ইমামের কিয়াম ছিল সেই সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা; দ্বীন ও রাসূলের বার্তাকে জীবন্ত রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে বনী উমাইয়্যার যুগে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মিম্বর স্থাপন করে সেখানে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হতো। এছাড়া তাঁর অনুসারীদের উপর প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হতো। এতটাই যে, অনেক শিয়া তাদের সন্তানের নাম আলী রাখার সাহস পেতেন না। এমনকি যিনি আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর মহব্বত ও অনুসরণের জন্য পরিচিত হতেন, তাঁকে অনেক সময় কিছু সামাজিক অধিকার ও বাইতুল মালের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল না; বরং ইসলামী সমাজ থেকে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা ছিল। তাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে এই ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয় বুঝতে হবে— ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার মধ্যকার সংঘাত।
সেই যুগে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার জন্য গুরুতর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদি আহলে সুন্নাতের হাদীসগ্রন্থসমূহের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায় যে, আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরিমাণ অন্যান্য কিছু রাবীর তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ আবূ হুরায়রা যিনি শুধু নবী করীম (সা.)-এর জীবনের শেষ কয়েক বছর দেখেছিলেন, তিনি অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর ফযীলতসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে গুরুতর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। অথচ অন্য কিছু ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ফযীলত রচনা করে প্রচার করা হতো। এই ঐতিহাসিক প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, সমাজের ধর্মীয় স্মৃতিতে আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা ছিল।
এমনকি পবিত্র ভূগোলের ক্ষেত্রেও এক ধরনের রাজনৈতিক পবিত্রীকরণ লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়্যা শাসনের কেন্দ্রস্থল শাম অঞ্চলকে কৃত্রিম রেওয়ায়েত ও ফযীলত দিয়ে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। অথচ ইসলামের পরবর্তী ঘটনাবলির আগে সেই ভূমি ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ কোনো পবিত্র মর্যাদার অধিকারী ছিল না। এসব পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং আহলে বাইত (আ.)-কেন্দ্রিক ধারাকে দুর্বল করার একই প্রকল্পের অংশ।
এমন পরিবেশে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে— দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইমামতের সত্যতা সংরক্ষণ করা, ইমামত বিলোপের প্রকল্পের বিপরীতে। কারবালার ঘটনার পরও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল। বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম ইবনে তালহা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-কে ব্যঙ্গাত্মক সুরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: «مَنِ الغالِب؟» — “কে বিজয়ী হয়েছে?”
হযরত উত্তরে বললেন: «إِذَا دَخَلَ وَقْتُ الصَّلَاةِ فَأَذِّنْ وَأَقِمْ»
“যখন নামাজের সময় হয়, তখন আজান দাও এবং ইকামত বলো।”
আজানে বলো: «أشهد أن محمدًا رسول الله» — দেখো, নবী (সা.)-এর নাম কি মুছে ফেলা হয়েছে?
এই উত্তরের সূক্ষ্মতা এখানে যে, হযরত শুধু বলেননি “নামাজ পড়ো”, বরং আজান ও ইকামতের উপর জোর দিয়েছেন— যেখানে নবী (সা.)-এর নাম ও রেসালাত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ যদি লক্ষ্য এই নাম ও এই পথকে মুছে ফেলা হতো, তাহলে কি তারা সফল হয়েছে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের মূল সারবস্তু হলো ইমামত ও ভিলায়েত। অসংখ্য রেওয়ায়েতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভিলায়েত ও আহলে বাইত (আ.)-এর মহব্বত ছাড়া ইবাদতগুলো পূর্ণতা লাভ করে না। এসব রেওয়ায়েত বিভিন্ন উৎসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের কাছে ইমাম সাদেক (আ.)-এর কথাই মানদণ্ড, যিনি আয়াতে তাতহীরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর কথা নববী হেদায়েতের ধারাবাহিকতা। এই ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) নৌকা নাজাত হয়েছিলেন, যাতে ইমামতের সত্যতা টিকে থাকে।
১৪৪৫ হিজরিতেও একটি রূপক অর্থে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, রেওয়ায়েতে এসেছে— আল্লাহর নবীগণ বরজখ জগতে কারবালা যিয়ারতে আসেন। এই বক্তব্য সেই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে, তাওহীদ ও নবুয়্যতের ধারা সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আত্মত্যাগের আলোয় অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ যদি সেই কিয়াম না ঘটত, তাহলে ধর্মের ইতিহাসের পথ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্ধারিত হতো।
১৪৪৬ ও ১৪৪৭ হিজরিতেও তিনটি মৌলিক অক্ষ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমত, ইমামের মদীনা থেকে মক্কা এবং তারপর কারবালার দিকে যাত্রাপথ; কেন এবং কীভাবে তিনি মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন, মক্কায় কী ঘটেছিল, কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি তাঁর কিয়ামের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ইমামের শাহাদাত সম্পর্কে জ্ঞানের বিষয়। ইমাম হুসাইন (আ.) কি জানতেন যে তিনি শাহাদাতবরণ করবেন? আর যদি জেনে থাকেন, তাহলে কি এই জ্ঞান তাঁর তাকলীফ (দায়িত্ব) বাতিল করে দেয়? এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, ইমামের গায়েবী জ্ঞান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়, কিন্তু তাঁর সামাজিক জীবন স্বাভাবিক ও সাধারণ নিয়ম অনুসারেই চলে। ইমাম যদিও সকল বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে অবগত, তথাপি সামাজিক কর্মক্ষেত্রে তিনি তাকলীফের স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করেন। তাই আমরা কারবালায় এমন কোনো অলৌকিক হস্তক্ষেপ দেখি না যা ঘটনার বাহ্যিক পরিণতি পরিবর্তন করে দেয়। কারণ আল্লাহর সুন্নাত (নিয়ম) হলো কার্যকারণের স্বাভাবিক প্রবাহ।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরেকটি বক্তব্যের অংশে, যা একটি ওসিয়তনামার মতো এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহর উদ্দেশ্যে লেখা, একই অর্থ আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ, যেমন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং ইমামের সাথে সঙ্গী হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য ছিল না। তথাপি ইমাম তাঁর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং তাতে নিজের আন্দোলনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেন।
হযরত সেই চিঠিতে বলেন যে, আমার মদীনা থেকে বের হয়ে আসা কোনো খেল-তামাশা বা বিনোদনের জন্য নয়, না কোনো প্রবৃত্তির অনুসরণে, আর না কোনো ফাসাদ বা জুলুমের উদ্দেশ্যে। তারপর তিনি কিয়ামের উদ্দেশ্য এভাবে ব্যক্ত করেন: «إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الْإِصْلَاحِ فِی أُمَّةِ جَدِّی»
“আমি তো শুধু আমার দাদার উম্মতের মধ্যে সংস্কারের অন্বেষণে বের হয়েছি।”
এরপর তিনি বলেন: «أُرِیدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْکَرِ»
“আমি চাই আমর বিল মা‘রূফ (সৎকাজের আদেশ) করতে এবং নাহী আনিল মুনকার (অসৎকাজ থেকে নিষেধ) করতে।”
এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে, «আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার» এর অর্থ শুধু সেই সীমিত ও সাধারণ ধারণা নয় যা কখনো কখনো মনে গড়ে ওঠে। রেওয়ায়েতসমূহেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি কেউ অপরকে বলে “নামাজ পড়ো”, “হিজাব পালন করো” বা কিছু ধর্মীয় আমল করো, তাহলে এটি মূলত এক ধরনের খায়েরখাহী ও নসীহত। এটি অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু কুরআনী ও রেওয়ায়েতী দৃষ্টিকোণ থেকে “আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার”-এর প্রকৃত অর্থ এর চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে একটি রেওয়ায়েতে এসেছে যে, যদি সকল ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তাদের অনুপাত হবে এক ফোঁটা লালা বনাম বিশাল সমুদ্রের মতো। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের কাঠামো সংরক্ষণে একটি মৌলিক সত্য, শুধু ব্যক্তিগত ও সীমিত উপদেশ নয়। তাই এর আসল অর্থে আমর বিল মা‘রূফ একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত বিষয়, যা সমাজের হেদায়েতের স্তরে অর্থবহ হয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে বলেননি যে, আমরা এসেছি কয়েকটি খুঁটিনাটি বিধান স্মরণ করিয়ে দিতে; বরং বলেছেন: আমাদের পথ্থই আমার দাদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমার পিতা আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর পথ্থ: «وَأَسِیرَ بِسِیرَةِ جَدِّی وَأَبِی عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِب»
“এবং আমি আমার দাদা ও আমার পিতা আলী ইবনে আবী তালিবের সীরাত অনুসরণ করব।”
অর্থাৎ মানদণ্ড হলো সমাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর সীরাতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্য রয়েছে সেই চিঠিতে যা তিনি জনাব মুসলিম ইবনে আকীলের মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত “ইমাম”-এর সত্যিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন: «فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের শপথ! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কিতাবুল্লাহ অনুসারে আমল করেন, ন্যায়বিচার কায়েম করেন, হক দ্বীনের প্রতি অনুরক্ত থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। সুতরাং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বের হয়ে আসা ও কিয়াম ছিল দ্বীনকে জালিমদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। ১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) যে সত্যের জন্য নিজের জান কুরবান করেছিলেন, তা কী ছিল? তিনি কি শুধু নামাজ, রোজা ও হজ্জ সংরক্ষণের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি আরও গভীর কোনো বিষয় ছিল?
তৃতীয়ত, কুফাবাসীদের আহ্বানের বিষয়। কুফা শহরটি ১৭ হিজরিতে দ্বিতীয় খলিফার নির্দেশে এবং সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি সামরিক শহর, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজয় অভিযান সংগঠিত করা এবং ইসলামী খিলাফতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। তাই এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন ছিল বিশেষ ধরনের এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম কোনো আবেগীয় বা সাময়িক আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল ইমামতের সত্যতা বিলোপের ঐতিহাসিক প্রকল্প এবং দ্বীনের পাঠ বিকৃতির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিক্রিয়া। কুফা শহরটি মূলত সামরিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, শহরটিতে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে যা চল্লিশ হাজার মানুষ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম থেকেই সেখানে সৈন্য সমাবেশ ও সংগঠনের জন্য কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। বাস্তবে কুফা ছিল একটি সামরিক ছাউনি শহর।
এমন একটি শহরে জনসংখ্যার গঠনও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে শক্তিশালী সামাজিক সংহতি গড়ে না ওঠে। বিভিন্ন গোত্রকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ বন্ধন একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদল অভিবাসীও ছিল, যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি, যাঁরা শিল্প ও পেশাগত দক্ষতার কারণে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। এই গোষ্ঠীগুলোকে কোনো কোনো সূত্রে ‘মাওয়ালী’ বলা হয়েছে। একই সাথে, প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে ‘শী‘আ’ শব্দটি আজকের ব্যবহার থেকে অনেকাংশে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতো।
কোনো কোনো প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর ঐতিহাসিক ও কালামী গ্রন্থে যাঁরা আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতেন কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী খিলাফতকেও মেনে নিতেন, তাঁদেরকেও কখনো কখনো শী‘আ বলে গণ্য করা হতো। এটি প্রমাণ করে যে, সেই যুগের সমাজের আকীদাগত কাঠামো আজকের সরল বিভাজনের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। কুফায় এমন কিছু গোত্র ছিল যাদের জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, বনী মুরাদ গোত্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন হানী ইবনে উরওয়া, তাদের জনসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। আরব সংস্কৃতিতে রক্তের বদলা ও গোত্রীয় সমর্থনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই লাইলাতুল মাবিতের ঘটনাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হত্যায় অংশ নেবেন, যাতে হত্যার দায়িত্ব গোত্রগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয় এবং বনী হাশেম রক্তের বদলা নিতে না পারে।
তথাপি কুফার ঘটনায় আমরা দেখি যে, এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই শক্তির অনেকাংশই শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল শহরের প্রশাসনিক পরিবর্তন। প্রথমদিকে কুফার গভর্নর ছিলেন নু‘মান ইবনে বশীর, যিনি রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় ছিলেন না এবং ইয়াযীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে শহরের পরিবেশ কিছুটা উন্মুক্ত ছিল এবং মুসলিম ইবনে আকীল কিছু লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু যখন পরিস্থিতি বদলে যায় এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে কুফার শাসক নিযুক্ত করা হয়, তখন অবস্থা দ্রুত পাল্টে যায়। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, যিনি পূর্বে বসরার গভর্নর ছিলেন, অত্যন্ত নির্মমতা ও ভীতি সৃষ্টির নীতি নিয়ে কুফায় প্রবেশ করেন এবং শহরের পরিবেশকে অত্যন্ত নিরাপত্তামূলক করে তোলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর নির্মম আচরণের কিছু উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে, যা দেখায় তিনি কীভাবে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিরোধীদের দমন করতেন। তাঁর আগমনের পর যাঁরা আগে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সন্দেহ বা ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। অবশ্য এই ভয় সকলের মধ্যে সমান ছিল না। কিছু বড় শী‘আ ব্যক্তিত্ব, যেমন মুসলিম ইবনে আওসাজা ও হাবীব ইবনে মুজাহির বিপদের ঝুঁকি নিয়েও ইমামের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুফার সমাজের এক বড় অংশ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক চাপের সামনে পিছু হটে যায়।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। কারণ আমাদের জন্য মূল বিষয় হলো নিজেদেরকে চেনা। ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আমাদের আজকের অবস্থার আয়না হয়ে ওঠে। যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে— আমরা এই ঘটনার কোন পক্ষে থাকব? কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও বিদ্যমান? যদি থাকে, তাহলে সেই একই ভুলগুলো আবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আলভী তেহরানী বলেছেন: সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আজাদারীর প্রদীপ কখনো নিভবে না
একজন মাদরাসা শিক্ষক বলেন, আশুরার নেহজতের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। মূল বিষয় হলো আমাদের নিজেদের যুগকে চেনা। কারণ ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আজকের দিনের আয়না হয়ে ওঠে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে আমাদের বুঝতে হবে ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো— যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে আমরা কোন পক্ষে অবস্থান নেব? আর কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ও ভুল ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলভী তেহরানী মসজিদে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এ আয়োজিত সাপ্তাহিক বক্তৃতা সিরিজে ভিলায়েতের সত্যতাকে হেদায়েতের সারবস্তু ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনকে রক্ষা করা এবং নববী ও আলভী সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে ইমামত বিলোপ ও ধর্মীয় পরিচয় বিলোপের প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইমামতের ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
এই বক্তৃতার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: «إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ…»
“যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েত গোপন করে, যা আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি…”
এরপর আল্লাহ বলেন: «أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ» — আল্লাহ তাদের লানত করেন এবং সকল লানতকারীও তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কুরআন নিজেই গোপন করার কথা বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে «مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ» অর্থাৎ সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েতের উপায়সমূহ। সুতরাং কথা হচ্ছে এমন এক সত্যের যা কুরআন মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই সত্যের দুটি মৌলিক কাজ: একটি বাইয়্যিনাত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) এবং অপরটি হেদায়েত (পথপ্রদর্শন)।
ইমাম সাদেক (আ.) থেকে ইবনে আবী হামজার একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতের অর্থ হলো আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)। অর্থাৎ মানুষ তাঁর ভিলায়েত ও ইমামতের সত্যতা গোপন করেছে। সেই মহান সত্তা ছিলেন একইসাথে বাইয়্যিনাহ ও হেদায়েত। সুতরাং বিষয়টি শুধু কুরআনের শব্দ নয়, বরং সেই সত্যের যা কুরআন উপস্থাপন করেছে।
কিছু আরবি কবিতা ও রজজেও এই অর্থ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় হযরত যুহাইর ইবনে কায়ন বাজালী সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত লাভ করেছেন এবং তাঁর পথে শাহাদাতবরণ করা তাঁর জন্য হেদায়েতেরই নামান্তর। সুতরাং ইমামতের বিষয়টি মূলত হেদায়েতের বিষয়।
আলোচনা এখান থেকে শুরু হয় যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ধরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য মজলিস, আজাদারী ও স্মরণসভা আয়োজন করে? কেন এই ঐতিহ্য স্থায়ী? এবং কেন এটি শুধুমাত্র মুস্তাহাব নয়, বরং একাধিক দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি ও ওয়াজিব?
এই মজলিসগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো জনগণের মধ্যে দ্বীনদারির মূল স্তম্ভকে সংরক্ষণ করা। সমাজে যে পরিমাণ দ্বীনদারি, নামাজ, রোজা এবং ধর্মীয় মা‘রিফাতের সাথে সম্পর্ক অবশিষ্ট রয়েছে, তার এক বড় অংশই এই মজলিসগুলোরই ফল। তাই শত্রুরাও এই মাহফিলগুলোর বিরোধিতা করে; কারণ এই জলসাগুলো হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল।
কখনো কখনো বলা হয়, এই মজলিসের পরিবর্তে শুধু দান-সদকা ও অসহায়দের সাহায্য করাই যথেষ্ট, অথবা মা‘রিফাত শিক্ষার পরিবর্তে অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। অথচ বাস্তবতা এই যে, যেসব সুস্থ ও কার্যকর দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সমাজে গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশই এই আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসগুলো থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং হেদায়েত ও মা‘রিফাত— সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
মানবসমাজ যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে, তেমনি হেদায়েতেরও প্রয়োজন রয়েছে। কেউ যদি বলে যে, জীবিকা বা স্বাস্থ্যসেবার কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা ও হেদায়েতের ক্ষেত্র বন্ধ করে দিতে হবে, অথবা সব সামর্থ্য শুধু একটি খাতে ব্যয় করতে হবে— এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। উভয় ক্ষেত্রই অপরিহার্য এবং পরস্পর পরিপূরক। তদুপরি, সমাজে যেসব কল্যাণমূলক ও সেবামূলক কাজ চলছে, তার অনেকগুলোই আসলে এই ধর্মীয় মজলিস ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাহফিল থেকেই জন্ম নিয়েছে।
মানুষ সত্যিই তাদের জন্য অন্তর থেকে দুঃখ অনুভব করে; কারণ ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি আহলে বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁদের চেয়ে এই লোকেরা অনেক ছোট। আজ তাঁদের নামও অবশিষ্ট নেই। মু‘আবিয়া ও সেই যুগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যতই ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ছিলেন, চলে গেছেন এবং তাঁদের কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নাম ও পথ আজও জীবন্ত ও প্রবাহমান। আল্লাহর ওয়াদাও তো এটাই: «يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ… وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ» — তারা আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দানকারী।
এই ভিত্তিতে আমরা এই আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য স্মরণসভা ও আজাদারী মজলিস আয়োজন করে। এর উত্তরে দুটি মৌলিক বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, মহান আল্লাহ যখন দ্বীনের নে‘মতের কথা বলেন, তখন তিনি ‘মিন্নাত’ শব্দটি ব্যবহার করেন; অর্থাৎ অত্যন্ত মহান নে‘মত। পবিত্র কুরআন বলে: «لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ…» — নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। এই বাচনভঙ্গি প্রমাণ করে যে, হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের নে‘মত অত্যন্ত মহান ও মৌলিক। অন্য অনেক নে‘মতের ক্ষেত্রে, যেমন পৃথিবী ও সমুদ্রকে মানুষের অধীন করে দেওয়া, এমন ‘মিন্নাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং দ্বীন একটি অত্যন্ত মহান ও মৌলিক নে‘মত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তাঁর কাছেই চায়। কিন্তু একই সাথে তিনি নিজেই আমাদেরকে সর্বোত্তম চাওয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন কোনো বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনো কখনো বিশেষ কোনো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তেমনি আল্লাহ তা‘আলাও নামাজের মধ্যে আমাদেরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদেরকে প্রতিদিন নামাজে বারবার বলতে হয়: «اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ»
এটি হেদায়েতের দোয়া; অর্থাৎ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহর হেদায়েত। এখান থেকেই সূরা আন‘আমের পবিত্র আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন: «قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا…»
“বলো, নিশ্চয় আমার রব আমাকে সরল পথের দিকে হেদায়েত করেছেন; এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী দ্বীন।”
সুতরাং সিরাতে মুস্তাকীম বলতে আল্লাহর দ্বীনকেই বোঝানো হয়েছে— যা মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নে‘মত।
আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.) মালিক আশতারকে লিখিত পত্রে বলেন: «فَإِنَّ هَذَا الدِّينَ قَدْ كَانَ أَسِيرًا فِي أَيْدِي شِرَارِ النَّاسِ»
“এই দ্বীন একসময় নিকৃষ্টতম মানুষদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছিল।”
দ্বীনের বাহ্যিক রূপ অবশিষ্ট ছিল, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সত্যতা মানুষের প্রবৃত্তির কবলে পড়ে গিয়েছিল। দ্বীন প্রথমে সাকীফার ধারার এবং পরে বনী উমাইয়্যার খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই এমন কাউকে কিয়াম করতে হবে যিনি এই বন্দি দ্বীনকে মুক্ত করবেন।
এ প্রসঙ্গে আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি বসরার নেতৃবৃন্দের প্রতি লিখিত পত্রে বলেছিলেন: «وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ…»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করছি।”
এই বাক্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এই মহান আন্দোলন ছিল দ্বীনের সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সমাজকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। যদি এই মহান কিয়াম না ঘটত, তাহলে হয়তো সেই যুগের বিভ্রান্তি ও বিকৃতির অন্ধকারে দ্বীনের সত্যতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেত।
হযরত আরও বলেন: «أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ نَبِيِّهِ»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি।”
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সেই সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ভুলে যাওয়া হয়েছিল এবং বিদ‘আতগুলো জীবিত হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ দ্বীনের বাহ্যিক রূপ টিকে ছিল, কিন্তু তার আসল সত্যতা ও সারবস্তু ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছিল। সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে যদিও নামাজ ও রোজার বাহ্যিক রূপ চালু ছিল, কিন্তু দ্বীনের আসল সত্যতা বন্দিত্বের শিকার হয়েছিল। অনেক সময় দ্বীনের নামে এমন কাজ করা হতো যা দ্বীনের সঠিক রূপেও ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, নফল নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হতো, অথচ নববী সুন্নাতে এর কোনো স্থান ছিল না।
সুতরাং যখন ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন, “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি”, তখন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দ্বীনের আসল সত্যতার দিকে ফিরিয়ে আনা, শুধু তার বাহ্যিক রূপ নয়। অনেক সময় এই বাহ্যিক রূপই মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কেউ হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, ধর্মীয় মজলিসে উপস্থিত থাকে অথবা ইবাদতগুজার হয়, কিন্তু এই বাহ্যিকতা একা দ্বীনের অভ্যন্তরীণ সত্যতা ও সুস্থতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দ্বীনের মূল সারবস্তু এই বাহ্যিকতার চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্যটি সেই চিঠিতে রয়েছে, যা তিনি হযরত মুসলিম ইবনে আকীল (আ.)-এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত ‘ইমাম’ এর সত্য স্বরূপকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমাম বলেন:
«فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের কসম! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কুরআনের উপর আমল করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, সত্য দ্বীনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। অতএব, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হিজরত ও কিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনকে দুষ্টদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা।
১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) আসলে কোন সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? তিনি কি শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও হজ্জের হেফাজতের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি এর চেয়ে অনেক গভীর ও মৌলিক কোনো বিষয় ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর ফিরে যায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠ (কিরাআত) গঠনের ইতিহাসে। নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজে ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠের উদ্ভব ঘটে।
প্রথম পাঠটি সাকীফার ঘটনায় আবির্ভূত হয়। সেই ধারার পরিকল্পনাকারীরা ইমামকে সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ‘সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়বিচার’ ও ‘সকল সাহাবীর সমান মর্যাদা’র মতো শ্লোগান দিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে শুধু আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করে সব সাহাবীকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। এই পন্থার ফল ছিল ইমামকে কোণঠাসা করে দেওয়া এবং সমাজের মূল হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সত্যিকারের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া।
সাকীফার ঘটনায় মূল প্রচেষ্টা ছিল আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-কে ইসলামী সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তাই এ কথা ভাবা ঠিক হবে না যে, তিনি ও তাঁর মহান সন্তানগণ সেই যুগের যুদ্ধ পরিচালনা বা ক্ষমতা কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত সেই ধারার লক্ষ্য ছিল এই পবিত্র খান্দানকে সমাজের হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া, তাঁদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা নয়। কারণ এমনটি করা তাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী ছিল।
অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর কাছে পরামর্শ চাওয়া হতো এবং তিনি হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করে উত্তর দিতেন। এটি ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়; কারণ ইমামের দায়িত্ব হলো হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেওয়া। এমনকি মু‘আবিয়া বা ইয়াযীদের মতো ব্যক্তি কোনো প্রশ্ন করলেও ইমাম সত্য গোপন করতেন না। কারণ যদি আল্লাহর হুজ্জাত প্রকাশ না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন কেউ যেন অজুহাত দেখাতে না পারে যে, তাকে হেদায়েতের পথ দেখানো হয়নি।
রেওয়ায়েতেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন, কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, যখন ইবলিস হযরত মূসা (আ.)-এর সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আমার জন্য কি ফিরে আসার কোনো পথ আছে?” তখন হযরত মূসা (আ.) বললেন, “যদি আল্লাহর নির্দেশ মেনে নাও এবং হযরত আদম (আ.)-এর কবরের সামনে সিজদা করো, তাহলে তোমার জন্য তওবার পথ খুলে যাবে।” কিন্তু ইবলিস অহংকারবশত সেই নির্দেশ মেনে নেয়নি। এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো— আল্লাহর অলীগণ হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেন, যদিও কেউ কেউ অহংকারের কারণে তা গ্রহণ করে না।
প্রথম পাঠের বিপরীতে, যা ইমামতকে কোণঠাসা করার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় পাঠ বনী উমাইয়্যার যুগে গড়ে ওঠে। এই দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য ছিল যে, প্রথম ধারাটি মূলত ইমামকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উমাইয়্যারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইমামতকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। এই যুগ থেকেই ইমামদের শারীরিকভাবে নির্মূল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়: আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর শাহাদাত, ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত এবং অতঃপর আশুরার ঘটনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত।
সেই ধারার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী সমাজে ইমামত নামক কোনো বিষয় যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতে মু‘আবিয়া ও মুগীরার মধ্যকার সংলাপের কথা এসেছে। মুগীরা মু‘আবিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসেন। যখন তাঁর কাছে কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন: আমি মু‘আবিয়াকে বলেছিলাম, এখন ক্ষমতা তোমার হাতে, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই বনী হাশেমের সাথে নম্র আচরণ করো এবং কঠোরতা পরিহার করো। কিন্তু মু‘আবিয়া এমন একটি কথা বলেন যা তাঁর আসল উদ্দেশ্য উন্মোচিত করে দেয়। তিনি বলেন: আমার আগে যারা এসেছিলেন, কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং চলে গেছেন, তাঁদের কোনো নামই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই ব্যক্তি অর্থাৎ ইসলামের নবী (সা.)-এর নাম এখনও প্রতিদিন বহুবার মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। আজানে বলা হয়: «أشهد أن محمدًا رسول الله»। অতঃপর তিনি তীব্র বিদ্বেষের সাথে বলেন, যতক্ষণ এই নাম উচ্চারিত হবে, ততক্ষণ আমাদের কোনো শান্তি নেই।
এই ঐতিহাসিক বর্ণনা স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের মূল সমস্যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ছিল না; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)-এর স্মৃতি ও বার্তাকে ম্লান করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একেবারে মুছে ফেলা। এখান থেকেই সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদি শত্রু এই পথের নাম ও সত্যতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে ইমামের কিয়াম ছিল সেই সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা; দ্বীন ও রাসূলের বার্তাকে জীবন্ত রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে বনী উমাইয়্যার যুগে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মিম্বর স্থাপন করে সেখানে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হতো। এছাড়া তাঁর অনুসারীদের উপর প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হতো। এতটাই যে, অনেক শিয়া তাদের সন্তানের নাম আলী রাখার সাহস পেতেন না। এমনকি যিনি আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর মহব্বত ও অনুসরণের জন্য পরিচিত হতেন, তাঁকে অনেক সময় কিছু সামাজিক অধিকার ও বাইতুল মালের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল না; বরং ইসলামী সমাজ থেকে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা ছিল। তাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে এই ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয় বুঝতে হবে— ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার মধ্যকার সংঘাত।
সেই যুগে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার জন্য গুরুতর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদি আহলে সুন্নাতের হাদীসগ্রন্থসমূহের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায় যে, আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরিমাণ অন্যান্য কিছু রাবীর তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ আবূ হুরায়রা যিনি শুধু নবী করীম (সা.)-এর জীবনের শেষ কয়েক বছর দেখেছিলেন, তিনি অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর ফযীলতসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে গুরুতর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। অথচ অন্য কিছু ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ফযীলত রচনা করে প্রচার করা হতো। এই ঐতিহাসিক প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, সমাজের ধর্মীয় স্মৃতিতে আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা ছিল।
এমনকি পবিত্র ভূগোলের ক্ষেত্রেও এক ধরনের রাজনৈতিক পবিত্রীকরণ লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়্যা শাসনের কেন্দ্রস্থল শাম অঞ্চলকে কৃত্রিম রেওয়ায়েত ও ফযীলত দিয়ে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। অথচ ইসলামের পরবর্তী ঘটনাবলির আগে সেই ভূমি ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ কোনো পবিত্র মর্যাদার অধিকারী ছিল না। এসব পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং আহলে বাইত (আ.)-কেন্দ্রিক ধারাকে দুর্বল করার একই প্রকল্পের অংশ।
এমন পরিবেশে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে— দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইমামতের সত্যতা সংরক্ষণ করা, ইমামত বিলোপের প্রকল্পের বিপরীতে। কারবালার ঘটনার পরও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল। বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম ইবনে তালহা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-কে ব্যঙ্গাত্মক সুরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: «مَنِ الغالِب؟» — “কে বিজয়ী হয়েছে?”
হযরত উত্তরে বললেন: «إِذَا دَخَلَ وَقْتُ الصَّلَاةِ فَأَذِّنْ وَأَقِمْ»
“যখন নামাজের সময় হয়, তখন আজান দাও এবং ইকামত বলো।”
আজানে বলো: «أشهد أن محمدًا رسول الله» — দেখো, নবী (সা.)-এর নাম কি মুছে ফেলা হয়েছে?
এই উত্তরের সূক্ষ্মতা এখানে যে, হযরত শুধু বলেননি “নামাজ পড়ো”, বরং আজান ও ইকামতের উপর জোর দিয়েছেন— যেখানে নবী (সা.)-এর নাম ও রেসালাত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ যদি লক্ষ্য এই নাম ও এই পথকে মুছে ফেলা হতো, তাহলে কি তারা সফল হয়েছে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের মূল সারবস্তু হলো ইমামত ও ভিলায়েত। অসংখ্য রেওয়ায়েতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভিলায়েত ও আহলে বাইত (আ.)-এর মহব্বত ছাড়া ইবাদতগুলো পূর্ণতা লাভ করে না। এসব রেওয়ায়েত বিভিন্ন উৎসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের কাছে ইমাম সাদেক (আ.)-এর কথাই মানদণ্ড, যিনি আয়াতে তাতহীরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর কথা নববী হেদায়েতের ধারাবাহিকতা। এই ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) নৌকা নাজাত হয়েছিলেন, যাতে ইমামতের সত্যতা টিকে থাকে।
১৪৪৫ হিজরিতেও একটি রূপক অর্থে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, রেওয়ায়েতে এসেছে— আল্লাহর নবীগণ বরজখ জগতে কারবালা যিয়ারতে আসেন। এই বক্তব্য সেই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে, তাওহীদ ও নবুয়্যতের ধারা সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আত্মত্যাগের আলোয় অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ যদি সেই কিয়াম না ঘটত, তাহলে ধর্মের ইতিহাসের পথ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্ধারিত হতো।
১৪৪৬ ও ১৪৪৭ হিজরিতেও তিনটি মৌলিক অক্ষ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমত, ইমামের মদীনা থেকে মক্কা এবং তারপর কারবালার দিকে যাত্রাপথ; কেন এবং কীভাবে তিনি মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন, মক্কায় কী ঘটেছিল, কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি তাঁর কিয়ামের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ইমামের শাহাদাত সম্পর্কে জ্ঞানের বিষয়। ইমাম হুসাইন (আ.) কি জানতেন যে তিনি শাহাদাতবরণ করবেন? আর যদি জেনে থাকেন, তাহলে কি এই জ্ঞান তাঁর তাকলীফ (দায়িত্ব) বাতিল করে দেয়? এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, ইমামের গায়েবী জ্ঞান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়, কিন্তু তাঁর সামাজিক জীবন স্বাভাবিক ও সাধারণ নিয়ম অনুসারেই চলে। ইমাম যদিও সকল বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে অবগত, তথাপি সামাজিক কর্মক্ষেত্রে তিনি তাকলীফের স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করেন। তাই আমরা কারবালায় এমন কোনো অলৌকিক হস্তক্ষেপ দেখি না যা ঘটনার বাহ্যিক পরিণতি পরিবর্তন করে দেয়। কারণ আল্লাহর সুন্নাত (নিয়ম) হলো কার্যকারণের স্বাভাবিক প্রবাহ।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরেকটি বক্তব্যের অংশে, যা একটি ওসিয়তনামার মতো এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহর উদ্দেশ্যে লেখা, একই অর্থ আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ, যেমন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং ইমামের সাথে সঙ্গী হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য ছিল না। তথাপি ইমাম তাঁর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং তাতে নিজের আন্দোলনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেন।
হযরত সেই চিঠিতে বলেন যে, আমার মদীনা থেকে বের হয়ে আসা কোনো খেল-তামাশা বা বিনোদনের জন্য নয়, না কোনো প্রবৃত্তির অনুসরণে, আর না কোনো ফাসাদ বা জুলুমের উদ্দেশ্যে। তারপর তিনি কিয়ামের উদ্দেশ্য এভাবে ব্যক্ত করেন: «إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الْإِصْلَاحِ فِی أُمَّةِ جَدِّی»
“আমি তো শুধু আমার দাদার উম্মতের মধ্যে সংস্কারের অন্বেষণে বের হয়েছি।”
এরপর তিনি বলেন: «أُرِیدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْکَرِ»
“আমি চাই আমর বিল মা‘রূফ (সৎকাজের আদেশ) করতে এবং নাহী আনিল মুনকার (অসৎকাজ থেকে নিষেধ) করতে।”
এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে, «আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার» এর অর্থ শুধু সেই সীমিত ও সাধারণ ধারণা নয় যা কখনো কখনো মনে গড়ে ওঠে। রেওয়ায়েতসমূহেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি কেউ অপরকে বলে “নামাজ পড়ো”, “হিজাব পালন করো” বা কিছু ধর্মীয় আমল করো, তাহলে এটি মূলত এক ধরনের খায়েরখাহী ও নসীহত। এটি অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু কুরআনী ও রেওয়ায়েতী দৃষ্টিকোণ থেকে “আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার”-এর প্রকৃত অর্থ এর চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে একটি রেওয়ায়েতে এসেছে যে, যদি সকল ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তাদের অনুপাত হবে এক ফোঁটা লালা বনাম বিশাল সমুদ্রের মতো। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের কাঠামো সংরক্ষণে একটি মৌলিক সত্য, শুধু ব্যক্তিগত ও সীমিত উপদেশ নয়। তাই এর আসল অর্থে আমর বিল মা‘রূফ একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত বিষয়, যা সমাজের হেদায়েতের স্তরে অর্থবহ হয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে বলেননি যে, আমরা এসেছি কয়েকটি খুঁটিনাটি বিধান স্মরণ করিয়ে দিতে; বরং বলেছেন: আমাদের পথ্থই আমার দাদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমার পিতা আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর পথ্থ: «وَأَسِیرَ بِسِیرَةِ جَدِّی وَأَبِی عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِب»
“এবং আমি আমার দাদা ও আমার পিতা আলী ইবনে আবী তালিবের সীরাত অনুসরণ করব।”
অর্থাৎ মানদণ্ড হলো সমাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর সীরাতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্য রয়েছে সেই চিঠিতে যা তিনি জনাব মুসলিম ইবনে আকীলের মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত “ইমাম”-এর সত্যিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন: «فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের শপথ! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কিতাবুল্লাহ অনুসারে আমল করেন, ন্যায়বিচার কায়েম করেন, হক দ্বীনের প্রতি অনুরক্ত থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। সুতরাং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বের হয়ে আসা ও কিয়াম ছিল দ্বীনকে জালিমদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। ১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) যে সত্যের জন্য নিজের জান কুরবান করেছিলেন, তা কী ছিল? তিনি কি শুধু নামাজ, রোজা ও হজ্জ সংরক্ষণের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি আরও গভীর কোনো বিষয় ছিল?
তৃতীয়ত, কুফাবাসীদের আহ্বানের বিষয়। কুফা শহরটি ১৭ হিজরিতে দ্বিতীয় খলিফার নির্দেশে এবং সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি সামরিক শহর, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজয় অভিযান সংগঠিত করা এবং ইসলামী খিলাফতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। তাই এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন ছিল বিশেষ ধরনের এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম কোনো আবেগীয় বা সাময়িক আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল ইমামতের সত্যতা বিলোপের ঐতিহাসিক প্রকল্প এবং দ্বীনের পাঠ বিকৃতির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিক্রিয়া। কুফা শহরটি মূলত সামরিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, শহরটিতে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে যা চল্লিশ হাজার মানুষ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম থেকেই সেখানে সৈন্য সমাবেশ ও সংগঠনের জন্য কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। বাস্তবে কুফা ছিল একটি সামরিক ছাউনি শহর।
এমন একটি শহরে জনসংখ্যার গঠনও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে শক্তিশালী সামাজিক সংহতি গড়ে না ওঠে। বিভিন্ন গোত্রকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ বন্ধন একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদল অভিবাসীও ছিল, যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি, যাঁরা শিল্প ও পেশাগত দক্ষতার কারণে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। এই গোষ্ঠীগুলোকে কোনো কোনো সূত্রে ‘মাওয়ালী’ বলা হয়েছে। একই সাথে, প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে ‘শী‘আ’ শব্দটি আজকের ব্যবহার থেকে অনেকাংশে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতো।
কোনো কোনো প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর ঐতিহাসিক ও কালামী গ্রন্থে যাঁরা আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতেন কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী খিলাফতকেও মেনে নিতেন, তাঁদেরকেও কখনো কখনো শী‘আ বলে গণ্য করা হতো। এটি প্রমাণ করে যে, সেই যুগের সমাজের আকীদাগত কাঠামো আজকের সরল বিভাজনের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। কুফায় এমন কিছু গোত্র ছিল যাদের জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, বনী মুরাদ গোত্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন হানী ইবনে উরওয়া, তাদের জনসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। আরব সংস্কৃতিতে রক্তের বদলা ও গোত্রীয় সমর্থনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই লাইলাতুল মাবিতের ঘটনাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হত্যায় অংশ নেবেন, যাতে হত্যার দায়িত্ব গোত্রগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয় এবং বনী হাশেম রক্তের বদলা নিতে না পারে।
তথাপি কুফার ঘটনায় আমরা দেখি যে, এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই শক্তির অনেকাংশই শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল শহরের প্রশাসনিক পরিবর্তন। প্রথমদিকে কুফার গভর্নর ছিলেন নু‘মান ইবনে বশীর, যিনি রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় ছিলেন না এবং ইয়াযীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে শহরের পরিবেশ কিছুটা উন্মুক্ত ছিল এবং মুসলিম ইবনে আকীল কিছু লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু যখন পরিস্থিতি বদলে যায় এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে কুফার শাসক নিযুক্ত করা হয়, তখন অবস্থা দ্রুত পাল্টে যায়। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, যিনি পূর্বে বসরার গভর্নর ছিলেন, অত্যন্ত নির্মমতা ও ভীতি সৃষ্টির নীতি নিয়ে কুফায় প্রবেশ করেন এবং শহরের পরিবেশকে অত্যন্ত নিরাপত্তামূলক করে তোলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর নির্মম আচরণের কিছু উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে, যা দেখায় তিনি কীভাবে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিরোধীদের দমন করতেন। তাঁর আগমনের পর যাঁরা আগে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সন্দেহ বা ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। অবশ্য এই ভয় সকলের মধ্যে সমান ছিল না। কিছু বড় শী‘আ ব্যক্তিত্ব, যেমন মুসলিম ইবনে আওসাজা ও হাবীব ইবনে মুজাহির বিপদের ঝুঁকি নিয়েও ইমামের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুফার সমাজের এক বড় অংশ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক চাপের সামনে পিছু হটে যায়।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। কারণ আমাদের জন্য মূল বিষয় হলো নিজেদেরকে চেনা। ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আমাদের আজকের অবস্থার আয়না হয়ে ওঠে। যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে— আমরা এই ঘটনার কোন পক্ষে থাকব? কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও বিদ্যমান? যদি থাকে, তাহলে সেই একই ভুলগুলো আবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আলভী তেহরানী বলেছেন: সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আজাদারীর প্রদীপ কখনো নিভবে না
একজন মাদরাসা শিক্ষক বলেন, আশুরার নেহজতের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। মূল বিষয় হলো আমাদের নিজেদের যুগকে চেনা। কারণ ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আজকের দিনের আয়না হয়ে ওঠে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে আমাদের বুঝতে হবে ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো— যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে আমরা কোন পক্ষে অবস্থান নেব? আর কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ও ভুল ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলভী তেহরানী মসজিদে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এ আয়োজিত সাপ্তাহিক বক্তৃতা সিরিজে ভিলায়েতের সত্যতাকে হেদায়েতের সারবস্তু ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনকে রক্ষা করা এবং নববী ও আলভী সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে ইমামত বিলোপ ও ধর্মীয় পরিচয় বিলোপের প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইমামতের ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
এই বক্তৃতার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: «إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ…»
“যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েত গোপন করে, যা আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি…”
এরপর আল্লাহ বলেন: «أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ» — আল্লাহ তাদের লানত করেন এবং সকল লানতকারীও তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কুরআন নিজেই গোপন করার কথা বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে «مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ» অর্থাৎ সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েতের উপায়সমূহ। সুতরাং কথা হচ্ছে এমন এক সত্যের যা কুরআন মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই সত্যের দুটি মৌলিক কাজ: একটি বাইয়্যিনাত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) এবং অপরটি হেদায়েত (পথপ্রদর্শন)।
ইমাম সাদেক (আ.) থেকে ইবনে আবী হামজার একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতের অর্থ হলো আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)। অর্থাৎ মানুষ তাঁর ভিলায়েত ও ইমামতের সত্যতা গোপন করেছে। সেই মহান সত্তা ছিলেন একইসাথে বাইয়্যিনাহ ও হেদায়েত। সুতরাং বিষয়টি শুধু কুরআনের শব্দ নয়, বরং সেই সত্যের যা কুরআন উপস্থাপন করেছে।
কিছু আরবি কবিতা ও রজজেও এই অর্থ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় হযরত যুহাইর ইবনে কায়ন বাজালী সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত লাভ করেছেন এবং তাঁর পথে শাহাদাতবরণ করা তাঁর জন্য হেদায়েতেরই নামান্তর। সুতরাং ইমামতের বিষয়টি মূলত হেদায়েতের বিষয়।
আলোচনা এখান থেকে শুরু হয় যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ধরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য মজলিস, আজাদারী ও স্মরণসভা আয়োজন করে? কেন এই ঐতিহ্য স্থায়ী? এবং কেন এটি শুধুমাত্র মুস্তাহাব নয়, বরং একাধিক দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি ও ওয়াজিব?
এই মজলিসগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো জনগণের মধ্যে দ্বীনদারির মূল স্তম্ভকে সংরক্ষণ করা। সমাজে যে পরিমাণ দ্বীনদারি, নামাজ, রোজা এবং ধর্মীয় মা‘রিফাতের সাথে সম্পর্ক অবশিষ্ট রয়েছে, তার এক বড় অংশই এই মজলিসগুলোরই ফল। তাই শত্রুরাও এই মাহফিলগুলোর বিরোধিতা করে; কারণ এই জলসাগুলো হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল।
কখনো কখনো বলা হয়, এই মজলিসের পরিবর্তে শুধু দান-সদকা ও অসহায়দের সাহায্য করাই যথেষ্ট, অথবা মা‘রিফাত শিক্ষার পরিবর্তে অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। অথচ বাস্তবতা এই যে, যেসব সুস্থ ও কার্যকর দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সমাজে গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশই এই আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসগুলো থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং হেদায়েত ও মা‘রিফাত— সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
মানবসমাজ যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে, তেমনি হেদায়েতেরও প্রয়োজন রয়েছে। কেউ যদি বলে যে, জীবিকা বা স্বাস্থ্যসেবার কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা ও হেদায়েতের ক্ষেত্র বন্ধ করে দিতে হবে, অথবা সব সামর্থ্য শুধু একটি খাতে ব্যয় করতে হবে— এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। উভয় ক্ষেত্রই অপরিহার্য এবং পরস্পর পরিপূরক। তদুপরি, সমাজে যেসব কল্যাণমূলক ও সেবামূলক কাজ চলছে, তার অনেকগুলোই আসলে এই ধর্মীয় মজলিস ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাহফিল থেকেই জন্ম নিয়েছে।
মানুষ সত্যিই তাদের জন্য অন্তর থেকে দুঃখ অনুভব করে; কারণ ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি আহলে বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁদের চেয়ে এই লোকেরা অনেক ছোট। আজ তাঁদের নামও অবশিষ্ট নেই। মু‘আবিয়া ও সেই যুগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যতই ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ছিলেন, চলে গেছেন এবং তাঁদের কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নাম ও পথ আজও জীবন্ত ও প্রবাহমান। আল্লাহর ওয়াদাও তো এটাই: «يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ… وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ» — তারা আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দানকারী।
এই ভিত্তিতে আমরা এই আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য স্মরণসভা ও আজাদারী মজলিস আয়োজন করে। এর উত্তরে দুটি মৌলিক বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, মহান আল্লাহ যখন দ্বীনের নে‘মতের কথা বলেন, তখন তিনি ‘মিন্নাত’ শব্দটি ব্যবহার করেন; অর্থাৎ অত্যন্ত মহান নে‘মত। পবিত্র কুরআন বলে: «لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ…» — নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। এই বাচনভঙ্গি প্রমাণ করে যে, হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের নে‘মত অত্যন্ত মহান ও মৌলিক। অন্য অনেক নে‘মতের ক্ষেত্রে, যেমন পৃথিবী ও সমুদ্রকে মানুষের অধীন করে দেওয়া, এমন ‘মিন্নাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং দ্বীন একটি অত্যন্ত মহান ও মৌলিক নে‘মত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তাঁর কাছেই চায়। কিন্তু একই সাথে তিনি নিজেই আমাদেরকে সর্বোত্তম চাওয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন কোনো বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনো কখনো বিশেষ কোনো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তেমনি আল্লাহ তা‘আলাও নামাজের মধ্যে আমাদেরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদেরকে প্রতিদিন নামাজে বারবার বলতে হয়: «اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ»
এটি হেদায়েতের দোয়া; অর্থাৎ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহর হেদায়েত। এখান থেকেই সূরা আন‘আমের পবিত্র আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন: «قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا…»
“বলো, নিশ্চয় আমার রব আমাকে সরল পথের দিকে হেদায়েত করেছেন; এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী দ্বীন।”
সুতরাং সিরাতে মুস্তাকীম বলতে আল্লাহর দ্বীনকেই বোঝানো হয়েছে— যা মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নে‘মত।
আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.) মালিক আশতারকে লিখিত পত্রে বলেন: «فَإِنَّ هَذَا الدِّينَ قَدْ كَانَ أَسِيرًا فِي أَيْدِي شِرَارِ النَّاسِ»
“এই দ্বীন একসময় নিকৃষ্টতম মানুষদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছিল।”
দ্বীনের বাহ্যিক রূপ অবশিষ্ট ছিল, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সত্যতা মানুষের প্রবৃত্তির কবলে পড়ে গিয়েছিল। দ্বীন প্রথমে সাকীফার ধারার এবং পরে বনী উমাইয়্যার খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই এমন কাউকে কিয়াম করতে হবে যিনি এই বন্দি দ্বীনকে মুক্ত করবেন।
এ প্রসঙ্গে আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি বসরার নেতৃবৃন্দের প্রতি লিখিত পত্রে বলেছিলেন: «وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ…»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করছি।”
এই বাক্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এই মহান আন্দোলন ছিল দ্বীনের সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সমাজকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। যদি এই মহান কিয়াম না ঘটত, তাহলে হয়তো সেই যুগের বিভ্রান্তি ও বিকৃতির অন্ধকারে দ্বীনের সত্যতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেত।
হযরত আরও বলেন: «أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ نَبِيِّهِ»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি।”
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সেই সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ভুলে যাওয়া হয়েছিল এবং বিদ‘আতগুলো জীবিত হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ দ্বীনের বাহ্যিক রূপ টিকে ছিল, কিন্তু তার আসল সত্যতা ও সারবস্তু ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছিল। সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে যদিও নামাজ ও রোজার বাহ্যিক রূপ চালু ছিল, কিন্তু দ্বীনের আসল সত্যতা বন্দিত্বের শিকার হয়েছিল। অনেক সময় দ্বীনের নামে এমন কাজ করা হতো যা দ্বীনের সঠিক রূপেও ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, নফল নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হতো, অথচ নববী সুন্নাতে এর কোনো স্থান ছিল না।
সুতরাং যখন ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন, “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি”, তখন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দ্বীনের আসল সত্যতার দিকে ফিরিয়ে আনা, শুধু তার বাহ্যিক রূপ নয়। অনেক সময় এই বাহ্যিক রূপই মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কেউ হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, ধর্মীয় মজলিসে উপস্থিত থাকে অথবা ইবাদতগুজার হয়, কিন্তু এই বাহ্যিকতা একা দ্বীনের অভ্যন্তরীণ সত্যতা ও সুস্থতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দ্বীনের মূল সারবস্তু এই বাহ্যিকতার চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্যটি সেই চিঠিতে রয়েছে, যা তিনি হযরত মুসলিম ইবনে আকীল (আ.)-এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত ‘ইমাম’ এর সত্য স্বরূপকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমাম বলেন:
«فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের কসম! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কুরআনের উপর আমল করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, সত্য দ্বীনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। অতএব, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হিজরত ও কিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনকে দুষ্টদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা।
১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) আসলে কোন সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? তিনি কি শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও হজ্জের হেফাজতের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি এর চেয়ে অনেক গভীর ও মৌলিক কোনো বিষয় ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর ফিরে যায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠ (কিরাআত) গঠনের ইতিহাসে। নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজে ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠের উদ্ভব ঘটে।
প্রথম পাঠটি সাকীফার ঘটনায় আবির্ভূত হয়। সেই ধারার পরিকল্পনাকারীরা ইমামকে সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ‘সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়বিচার’ ও ‘সকল সাহাবীর সমান মর্যাদা’র মতো শ্লোগান দিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে শুধু আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করে সব সাহাবীকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। এই পন্থার ফল ছিল ইমামকে কোণঠাসা করে দেওয়া এবং সমাজের মূল হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সত্যিকারের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া।
সাকীফার ঘটনায় মূল প্রচেষ্টা ছিল আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-কে ইসলামী সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তাই এ কথা ভাবা ঠিক হবে না যে, তিনি ও তাঁর মহান সন্তানগণ সেই যুগের যুদ্ধ পরিচালনা বা ক্ষমতা কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত সেই ধারার লক্ষ্য ছিল এই পবিত্র খান্দানকে সমাজের হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া, তাঁদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা নয়। কারণ এমনটি করা তাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী ছিল।
অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর কাছে পরামর্শ চাওয়া হতো এবং তিনি হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করে উত্তর দিতেন। এটি ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়; কারণ ইমামের দায়িত্ব হলো হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেওয়া। এমনকি মু‘আবিয়া বা ইয়াযীদের মতো ব্যক্তি কোনো প্রশ্ন করলেও ইমাম সত্য গোপন করতেন না। কারণ যদি আল্লাহর হুজ্জাত প্রকাশ না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন কেউ যেন অজুহাত দেখাতে না পারে যে, তাকে হেদায়েতের পথ দেখানো হয়নি।
রেওয়ায়েতেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন, কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, যখন ইবলিস হযরত মূসা (আ.)-এর সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আমার জন্য কি ফিরে আসার কোনো পথ আছে?” তখন হযরত মূসা (আ.) বললেন, “যদি আল্লাহর নির্দেশ মেনে নাও এবং হযরত আদম (আ.)-এর কবরের সামনে সিজদা করো, তাহলে তোমার জন্য তওবার পথ খুলে যাবে।” কিন্তু ইবলিস অহংকারবশত সেই নির্দেশ মেনে নেয়নি। এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো— আল্লাহর অলীগণ হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেন, যদিও কেউ কেউ অহংকারের কারণে তা গ্রহণ করে না।
প্রথম পাঠের বিপরীতে, যা ইমামতকে কোণঠাসা করার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় পাঠ বনী উমাইয়্যার যুগে গড়ে ওঠে। এই দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য ছিল যে, প্রথম ধারাটি মূলত ইমামকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উমাইয়্যারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইমামতকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। এই যুগ থেকেই ইমামদের শারীরিকভাবে নির্মূল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়: আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর শাহাদাত, ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত এবং অতঃপর আশুরার ঘটনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত।
সেই ধারার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী সমাজে ইমামত নামক কোনো বিষয় যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতে মু‘আবিয়া ও মুগীরার মধ্যকার সংলাপের কথা এসেছে। মুগীরা মু‘আবিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসেন। যখন তাঁর কাছে কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন: আমি মু‘আবিয়াকে বলেছিলাম, এখন ক্ষমতা তোমার হাতে, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই বনী হাশেমের সাথে নম্র আচরণ করো এবং কঠোরতা পরিহার করো। কিন্তু মু‘আবিয়া এমন একটি কথা বলেন যা তাঁর আসল উদ্দেশ্য উন্মোচিত করে দেয়। তিনি বলেন: আমার আগে যারা এসেছিলেন, কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং চলে গেছেন, তাঁদের কোনো নামই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই ব্যক্তি অর্থাৎ ইসলামের নবী (সা.)-এর নাম এখনও প্রতিদিন বহুবার মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। আজানে বলা হয়: «أشهد أن محمدًا رسول الله»। অতঃপর তিনি তীব্র বিদ্বেষের সাথে বলেন, যতক্ষণ এই নাম উচ্চারিত হবে, ততক্ষণ আমাদের কোনো শান্তি নেই।
এই ঐতিহাসিক বর্ণনা স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের মূল সমস্যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ছিল না; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)-এর স্মৃতি ও বার্তাকে ম্লান করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একেবারে মুছে ফেলা। এখান থেকেই সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদি শত্রু এই পথের নাম ও সত্যতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে ইমামের কিয়াম ছিল সেই সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা; দ্বীন ও রাসূলের বার্তাকে জীবন্ত রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে বনী উমাইয়্যার যুগে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মিম্বর স্থাপন করে সেখানে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হতো। এছাড়া তাঁর অনুসারীদের উপর প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হতো। এতটাই যে, অনেক শিয়া তাদের সন্তানের নাম আলী রাখার সাহস পেতেন না। এমনকি যিনি আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর মহব্বত ও অনুসরণের জন্য পরিচিত হতেন, তাঁকে অনেক সময় কিছু সামাজিক অধিকার ও বাইতুল মালের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল না; বরং ইসলামী সমাজ থেকে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা ছিল। তাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে এই ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয় বুঝতে হবে— ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার মধ্যকার সংঘাত।
সেই যুগে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার জন্য গুরুতর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদি আহলে সুন্নাতের হাদীসগ্রন্থসমূহের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায় যে, আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরিমাণ অন্যান্য কিছু রাবীর তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ আবূ হুরায়রা যিনি শুধু নবী করীম (সা.)-এর জীবনের শেষ কয়েক বছর দেখেছিলেন, তিনি অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর ফযীলতসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে গুরুতর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। অথচ অন্য কিছু ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ফযীলত রচনা করে প্রচার করা হতো। এই ঐতিহাসিক প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, সমাজের ধর্মীয় স্মৃতিতে আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা ছিল।
এমনকি পবিত্র ভূগোলের ক্ষেত্রেও এক ধরনের রাজনৈতিক পবিত্রীকরণ লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়্যা শাসনের কেন্দ্রস্থল শাম অঞ্চলকে কৃত্রিম রেওয়ায়েত ও ফযীলত দিয়ে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। অথচ ইসলামের পরবর্তী ঘটনাবলির আগে সেই ভূমি ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ কোনো পবিত্র মর্যাদার অধিকারী ছিল না। এসব পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং আহলে বাইত (আ.)-কেন্দ্রিক ধারাকে দুর্বল করার একই প্রকল্পের অংশ।
এমন পরিবেশে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে— দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইমামতের সত্যতা সংরক্ষণ করা, ইমামত বিলোপের প্রকল্পের বিপরীতে। কারবালার ঘটনার পরও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল। বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম ইবনে তালহা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-কে ব্যঙ্গাত্মক সুরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: «مَنِ الغالِب؟» — “কে বিজয়ী হয়েছে?”
হযরত উত্তরে বললেন: «إِذَا دَخَلَ وَقْتُ الصَّلَاةِ فَأَذِّنْ وَأَقِمْ»
“যখন নামাজের সময় হয়, তখন আজান দাও এবং ইকামত বলো।”
আজানে বলো: «أشهد أن محمدًا رسول الله» — দেখো, নবী (সা.)-এর নাম কি মুছে ফেলা হয়েছে?
এই উত্তরের সূক্ষ্মতা এখানে যে, হযরত শুধু বলেননি “নামাজ পড়ো”, বরং আজান ও ইকামতের উপর জোর দিয়েছেন— যেখানে নবী (সা.)-এর নাম ও রেসালাত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ যদি লক্ষ্য এই নাম ও এই পথকে মুছে ফেলা হতো, তাহলে কি তারা সফল হয়েছে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের মূল সারবস্তু হলো ইমামত ও ভিলায়েত। অসংখ্য রেওয়ায়েতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভিলায়েত ও আহলে বাইত (আ.)-এর মহব্বত ছাড়া ইবাদতগুলো পূর্ণতা লাভ করে না। এসব রেওয়ায়েত বিভিন্ন উৎসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের কাছে ইমাম সাদেক (আ.)-এর কথাই মানদণ্ড, যিনি আয়াতে তাতহীরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর কথা নববী হেদায়েতের ধারাবাহিকতা। এই ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) নৌকা নাজাত হয়েছিলেন, যাতে ইমামতের সত্যতা টিকে থাকে।
১৪৪৫ হিজরিতেও একটি রূপক অর্থে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, রেওয়ায়েতে এসেছে— আল্লাহর নবীগণ বরজখ জগতে কারবালা যিয়ারতে আসেন। এই বক্তব্য সেই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে, তাওহীদ ও নবুয়্যতের ধারা সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আত্মত্যাগের আলোয় অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ যদি সেই কিয়াম না ঘটত, তাহলে ধর্মের ইতিহাসের পথ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্ধারিত হতো।
১৪৪৬ ও ১৪৪৭ হিজরিতেও তিনটি মৌলিক অক্ষ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমত, ইমামের মদীনা থেকে মক্কা এবং তারপর কারবালার দিকে যাত্রাপথ; কেন এবং কীভাবে তিনি মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন, মক্কায় কী ঘটেছিল, কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি তাঁর কিয়ামের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ইমামের শাহাদাত সম্পর্কে জ্ঞানের বিষয়। ইমাম হুসাইন (আ.) কি জানতেন যে তিনি শাহাদাতবরণ করবেন? আর যদি জেনে থাকেন, তাহলে কি এই জ্ঞান তাঁর তাকলীফ (দায়িত্ব) বাতিল করে দেয়? এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, ইমামের গায়েবী জ্ঞান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়, কিন্তু তাঁর সামাজিক জীবন স্বাভাবিক ও সাধারণ নিয়ম অনুসারেই চলে। ইমাম যদিও সকল বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে অবগত, তথাপি সামাজিক কর্মক্ষেত্রে তিনি তাকলীফের স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করেন। তাই আমরা কারবালায় এমন কোনো অলৌকিক হস্তক্ষেপ দেখি না যা ঘটনার বাহ্যিক পরিণতি পরিবর্তন করে দেয়। কারণ আল্লাহর সুন্নাত (নিয়ম) হলো কার্যকারণের স্বাভাবিক প্রবাহ।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরেকটি বক্তব্যের অংশে, যা একটি ওসিয়তনামার মতো এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহর উদ্দেশ্যে লেখা, একই অর্থ আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ, যেমন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং ইমামের সাথে সঙ্গী হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য ছিল না। তথাপি ইমাম তাঁর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং তাতে নিজের আন্দোলনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেন।
হযরত সেই চিঠিতে বলেন যে, আমার মদীনা থেকে বের হয়ে আসা কোনো খেল-তামাশা বা বিনোদনের জন্য নয়, না কোনো প্রবৃত্তির অনুসরণে, আর না কোনো ফাসাদ বা জুলুমের উদ্দেশ্যে। তারপর তিনি কিয়ামের উদ্দেশ্য এভাবে ব্যক্ত করেন: «إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الْإِصْلَاحِ فِی أُمَّةِ جَدِّی»
“আমি তো শুধু আমার দাদার উম্মতের মধ্যে সংস্কারের অন্বেষণে বের হয়েছি।”
এরপর তিনি বলেন: «أُرِیدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْکَرِ»
“আমি চাই আমর বিল মা‘রূফ (সৎকাজের আদেশ) করতে এবং নাহী আনিল মুনকার (অসৎকাজ থেকে নিষেধ) করতে।”
এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে, «আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার» এর অর্থ শুধু সেই সীমিত ও সাধারণ ধারণা নয় যা কখনো কখনো মনে গড়ে ওঠে। রেওয়ায়েতসমূহেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি কেউ অপরকে বলে “নামাজ পড়ো”, “হিজাব পালন করো” বা কিছু ধর্মীয় আমল করো, তাহলে এটি মূলত এক ধরনের খায়েরখাহী ও নসীহত। এটি অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু কুরআনী ও রেওয়ায়েতী দৃষ্টিকোণ থেকে “আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার”-এর প্রকৃত অর্থ এর চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে একটি রেওয়ায়েতে এসেছে যে, যদি সকল ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তাদের অনুপাত হবে এক ফোঁটা লালা বনাম বিশাল সমুদ্রের মতো। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের কাঠামো সংরক্ষণে একটি মৌলিক সত্য, শুধু ব্যক্তিগত ও সীমিত উপদেশ নয়। তাই এর আসল অর্থে আমর বিল মা‘রূফ একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত বিষয়, যা সমাজের হেদায়েতের স্তরে অর্থবহ হয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে বলেননি যে, আমরা এসেছি কয়েকটি খুঁটিনাটি বিধান স্মরণ করিয়ে দিতে; বরং বলেছেন: আমাদের পথ্থই আমার দাদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমার পিতা আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর পথ্থ: «وَأَسِیرَ بِسِیرَةِ جَدِّی وَأَبِی عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِب»
“এবং আমি আমার দাদা ও আমার পিতা আলী ইবনে আবী তালিবের সীরাত অনুসরণ করব।”
অর্থাৎ মানদণ্ড হলো সমাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর সীরাতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্য রয়েছে সেই চিঠিতে যা তিনি জনাব মুসলিম ইবনে আকীলের মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত “ইমাম”-এর সত্যিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন: «فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের শপথ! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কিতাবুল্লাহ অনুসারে আমল করেন, ন্যায়বিচার কায়েম করেন, হক দ্বীনের প্রতি অনুরক্ত থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। সুতরাং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বের হয়ে আসা ও কিয়াম ছিল দ্বীনকে জালিমদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। ১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) যে সত্যের জন্য নিজের জান কুরবান করেছিলেন, তা কী ছিল? তিনি কি শুধু নামাজ, রোজা ও হজ্জ সংরক্ষণের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি আরও গভীর কোনো বিষয় ছিল?
তৃতীয়ত, কুফাবাসীদের আহ্বানের বিষয়। কুফা শহরটি ১৭ হিজরিতে দ্বিতীয় খলিফার নির্দেশে এবং সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি সামরিক শহর, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজয় অভিযান সংগঠিত করা এবং ইসলামী খিলাফতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। তাই এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন ছিল বিশেষ ধরনের এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম কোনো আবেগীয় বা সাময়িক আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল ইমামতের সত্যতা বিলোপের ঐতিহাসিক প্রকল্প এবং দ্বীনের পাঠ বিকৃতির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিক্রিয়া। কুফা শহরটি মূলত সামরিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, শহরটিতে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে যা চল্লিশ হাজার মানুষ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম থেকেই সেখানে সৈন্য সমাবেশ ও সংগঠনের জন্য কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। বাস্তবে কুফা ছিল একটি সামরিক ছাউনি শহর।
এমন একটি শহরে জনসংখ্যার গঠনও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে শক্তিশালী সামাজিক সংহতি গড়ে না ওঠে। বিভিন্ন গোত্রকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ বন্ধন একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদল অভিবাসীও ছিল, যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি, যাঁরা শিল্প ও পেশাগত দক্ষতার কারণে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। এই গোষ্ঠীগুলোকে কোনো কোনো সূত্রে ‘মাওয়ালী’ বলা হয়েছে। একই সাথে, প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে ‘শী‘আ’ শব্দটি আজকের ব্যবহার থেকে অনেকাংশে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতো।
কোনো কোনো প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর ঐতিহাসিক ও কালামী গ্রন্থে যাঁরা আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতেন কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী খিলাফতকেও মেনে নিতেন, তাঁদেরকেও কখনো কখনো শী‘আ বলে গণ্য করা হতো। এটি প্রমাণ করে যে, সেই যুগের সমাজের আকীদাগত কাঠামো আজকের সরল বিভাজনের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। কুফায় এমন কিছু গোত্র ছিল যাদের জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, বনী মুরাদ গোত্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন হানী ইবনে উরওয়া, তাদের জনসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। আরব সংস্কৃতিতে রক্তের বদলা ও গোত্রীয় সমর্থনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই লাইলাতুল মাবিতের ঘটনাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হত্যায় অংশ নেবেন, যাতে হত্যার দায়িত্ব গোত্রগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয় এবং বনী হাশেম রক্তের বদলা নিতে না পারে।
তথাপি কুফার ঘটনায় আমরা দেখি যে, এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই শক্তির অনেকাংশই শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল শহরের প্রশাসনিক পরিবর্তন। প্রথমদিকে কুফার গভর্নর ছিলেন নু‘মান ইবনে বশীর, যিনি রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় ছিলেন না এবং ইয়াযীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে শহরের পরিবেশ কিছুটা উন্মুক্ত ছিল এবং মুসলিম ইবনে আকীল কিছু লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু যখন পরিস্থিতি বদলে যায় এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে কুফার শাসক নিযুক্ত করা হয়, তখন অবস্থা দ্রুত পাল্টে যায়। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, যিনি পূর্বে বসরার গভর্নর ছিলেন, অত্যন্ত নির্মমতা ও ভীতি সৃষ্টির নীতি নিয়ে কুফায় প্রবেশ করেন এবং শহরের পরিবেশকে অত্যন্ত নিরাপত্তামূলক করে তোলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর নির্মম আচরণের কিছু উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে, যা দেখায় তিনি কীভাবে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিরোধীদের দমন করতেন। তাঁর আগমনের পর যাঁরা আগে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সন্দেহ বা ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। অবশ্য এই ভয় সকলের মধ্যে সমান ছিল না। কিছু বড় শী‘আ ব্যক্তিত্ব, যেমন মুসলিম ইবনে আওসাজা ও হাবীব ইবনে মুজাহির বিপদের ঝুঁকি নিয়েও ইমামের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুফার সমাজের এক বড় অংশ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক চাপের সামনে পিছু হটে যায়।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। কারণ আমাদের জন্য মূল বিষয় হলো নিজেদেরকে চেনা। ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আমাদের আজকের অবস্থার আয়না হয়ে ওঠে। যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে— আমরা এই ঘটনার কোন পক্ষে থাকব? কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও বিদ্যমান? যদি থাকে, তাহলে সেই একই ভুলগুলো আবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
হুজ্জাতুল ইসলাম আলভী তেহরানী বলেছেন: সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আজাদারীর প্রদীপ কখনো নিভবে না
একজন মাদরাসা শিক্ষক বলেন, আশুরার নেহজতের বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। মূল বিষয় হলো আমাদের নিজেদের যুগকে চেনা। কারণ ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আজকের দিনের আয়না হয়ে ওঠে। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে আমাদের বুঝতে হবে ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয়। এখন মূল প্রশ্ন হলো— যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে আমরা কোন পক্ষে অবস্থান নেব? আর কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ও ভুল ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন আলভী তেহরানী মসজিদে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এ আয়োজিত সাপ্তাহিক বক্তৃতা সিরিজে ভিলায়েতের সত্যতাকে হেদায়েতের সারবস্তু ও সুস্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এর মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনকে রক্ষা করা এবং নববী ও আলভী সুন্নাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে ইমামত বিলোপ ও ধর্মীয় পরিচয় বিলোপের প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইমামতের ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
এই বক্তৃতার বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন: «إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ…»
“যারা আমার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েত গোপন করে, যা আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্ট করে দিয়েছি…”
এরপর আল্লাহ বলেন: «أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ» — আল্লাহ তাদের লানত করেন এবং সকল লানতকারীও তাদের প্রতি লানত বর্ষণ করে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, কুরআন নিজেই গোপন করার কথা বলা হয়নি। আয়াতে বলা হয়েছে «مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ» অর্থাৎ সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও হেদায়েতের উপায়সমূহ। সুতরাং কথা হচ্ছে এমন এক সত্যের যা কুরআন মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই সত্যের দুটি মৌলিক কাজ: একটি বাইয়্যিনাত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) এবং অপরটি হেদায়েত (পথপ্রদর্শন)।
ইমাম সাদেক (আ.) থেকে ইবনে আবী হামজার একটি রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, এই আয়াতের অর্থ হলো আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)। অর্থাৎ মানুষ তাঁর ভিলায়েত ও ইমামতের সত্যতা গোপন করেছে। সেই মহান সত্তা ছিলেন একইসাথে বাইয়্যিনাহ ও হেদায়েত। সুতরাং বিষয়টি শুধু কুরআনের শব্দ নয়, বরং সেই সত্যের যা কুরআন উপস্থাপন করেছে।
কিছু আরবি কবিতা ও রজজেও এই অর্থ অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন, যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার সময় হযরত যুহাইর ইবনে কায়ন বাজালী সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-কে সম্বোধন করে বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর কাছ থেকে হেদায়েত লাভ করেছেন এবং তাঁর পথে শাহাদাতবরণ করা তাঁর জন্য হেদায়েতেরই নামান্তর। সুতরাং ইমামতের বিষয়টি মূলত হেদায়েতের বিষয়।
আলোচনা এখান থেকে শুরু হয় যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ধরে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য মজলিস, আজাদারী ও স্মরণসভা আয়োজন করে? কেন এই ঐতিহ্য স্থায়ী? এবং কেন এটি শুধুমাত্র মুস্তাহাব নয়, বরং একাধিক দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি ও ওয়াজিব?
এই মজলিসগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো জনগণের মধ্যে দ্বীনদারির মূল স্তম্ভকে সংরক্ষণ করা। সমাজে যে পরিমাণ দ্বীনদারি, নামাজ, রোজা এবং ধর্মীয় মা‘রিফাতের সাথে সম্পর্ক অবশিষ্ট রয়েছে, তার এক বড় অংশই এই মজলিসগুলোরই ফল। তাই শত্রুরাও এই মাহফিলগুলোর বিরোধিতা করে; কারণ এই জলসাগুলো হেদায়েতের কেন্দ্রস্থল।
কখনো কখনো বলা হয়, এই মজলিসের পরিবর্তে শুধু দান-সদকা ও অসহায়দের সাহায্য করাই যথেষ্ট, অথবা মা‘রিফাত শিক্ষার পরিবর্তে অন্যান্য কাজে মনোনিবেশ করা উচিত। অথচ বাস্তবতা এই যে, যেসব সুস্থ ও কার্যকর দাতব্য সংস্থা ও সামাজিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সমাজে গড়ে উঠেছে, তার অধিকাংশই এই আহলে বাইত (আ.)-এর মজলিসগুলো থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। সমাজের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং হেদায়েত ও মা‘রিফাত— সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। এগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক।
মানবসমাজ যেমন স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার প্রয়োজন অনুভব করে, তেমনি হেদায়েতেরও প্রয়োজন রয়েছে। কেউ যদি বলে যে, জীবিকা বা স্বাস্থ্যসেবার কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা ও হেদায়েতের ক্ষেত্র বন্ধ করে দিতে হবে, অথবা সব সামর্থ্য শুধু একটি খাতে ব্যয় করতে হবে— এটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তা। উভয় ক্ষেত্রই অপরিহার্য এবং পরস্পর পরিপূরক। তদুপরি, সমাজে যেসব কল্যাণমূলক ও সেবামূলক কাজ চলছে, তার অনেকগুলোই আসলে এই ধর্মীয় মজলিস ও আহলে বাইত (আ.)-এর মাহফিল থেকেই জন্ম নিয়েছে।
মানুষ সত্যিই তাদের জন্য অন্তর থেকে দুঃখ অনুভব করে; কারণ ইতিহাসে এমন অনেক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি আহলে বাইত (আ.)-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁদের চেয়ে এই লোকেরা অনেক ছোট। আজ তাঁদের নামও অবশিষ্ট নেই। মু‘আবিয়া ও সেই যুগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ যতই ক্ষমতা ও প্রভাবশালী ছিলেন, চলে গেছেন এবং তাঁদের কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট নেই। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নাম ও পথ আজও জীবন্ত ও প্রবাহমান। আল্লাহর ওয়াদাও তো এটাই: «يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ… وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ» — তারা আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দানকারী।
এই ভিত্তিতে আমরা এই আলোচনায় এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি যে, কেন শিয়ারা সারা বছর ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জন্য স্মরণসভা ও আজাদারী মজলিস আয়োজন করে। এর উত্তরে দুটি মৌলিক বিষয় উঠে এসেছে। প্রথমত, মহান আল্লাহ যখন দ্বীনের নে‘মতের কথা বলেন, তখন তিনি ‘মিন্নাত’ শব্দটি ব্যবহার করেন; অর্থাৎ অত্যন্ত মহান নে‘মত। পবিত্র কুরআন বলে: «لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ…» — নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। এই বাচনভঙ্গি প্রমাণ করে যে, হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের নে‘মত অত্যন্ত মহান ও মৌলিক। অন্য অনেক নে‘মতের ক্ষেত্রে, যেমন পৃথিবী ও সমুদ্রকে মানুষের অধীন করে দেওয়া, এমন ‘মিন্নাত’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু হেদায়েত ও রাসূল প্রেরণের ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সুতরাং দ্বীন একটি অত্যন্ত মহান ও মৌলিক নে‘মত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা যেন তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো তাঁর কাছেই চায়। কিন্তু একই সাথে তিনি নিজেই আমাদেরকে সর্বোত্তম চাওয়া শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন কোনো বিশেষজ্ঞ বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি কখনো কখনো বিশেষ কোনো পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তেমনি আল্লাহ তা‘আলাও নামাজের মধ্যে আমাদেরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদেরকে প্রতিদিন নামাজে বারবার বলতে হয়: «اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ»
এটি হেদায়েতের দোয়া; অর্থাৎ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো আল্লাহর হেদায়েত। এখান থেকেই সূরা আন‘আমের পবিত্র আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে মহান আল্লাহ বলেন: «قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا…»
“বলো, নিশ্চয় আমার রব আমাকে সরল পথের দিকে হেদায়েত করেছেন; এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও স্থায়ী দ্বীন।”
সুতরাং সিরাতে মুস্তাকীম বলতে আল্লাহর দ্বীনকেই বোঝানো হয়েছে— যা মানুষের জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নে‘মত।
আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.) মালিক আশতারকে লিখিত পত্রে বলেন: «فَإِنَّ هَذَا الدِّينَ قَدْ كَانَ أَسِيرًا فِي أَيْدِي شِرَارِ النَّاسِ»
“এই দ্বীন একসময় নিকৃষ্টতম মানুষদের হাতে বন্দি হয়ে পড়েছিল।”
দ্বীনের বাহ্যিক রূপ অবশিষ্ট ছিল, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সত্যতা মানুষের প্রবৃত্তির কবলে পড়ে গিয়েছিল। দ্বীন প্রথমে সাকীফার ধারার এবং পরে বনী উমাইয়্যার খপ্পরে বন্দি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই এমন কাউকে কিয়াম করতে হবে যিনি এই বন্দি দ্বীনকে মুক্ত করবেন।
এ প্রসঙ্গে আবা আব্দিল্লাহিল হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনি বসরার নেতৃবৃন্দের প্রতি লিখিত পত্রে বলেছিলেন: «وَأَنَا أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ…»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান করছি।”
এই বাক্যটি স্পষ্ট করে দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর এই মহান আন্দোলন ছিল দ্বীনের সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং সমাজকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের দিকে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। যদি এই মহান কিয়াম না ঘটত, তাহলে হয়তো সেই যুগের বিভ্রান্তি ও বিকৃতির অন্ধকারে দ্বীনের সত্যতা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেত।
হযরত আরও বলেন: «أَدْعُوكُمْ إِلَى كِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ نَبِيِّهِ»
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি।”
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, সেই সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত ভুলে যাওয়া হয়েছিল এবং বিদ‘আতগুলো জীবিত হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ দ্বীনের বাহ্যিক রূপ টিকে ছিল, কিন্তু তার আসল সত্যতা ও সারবস্তু ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছিল। সাকীফা ও বনী উমাইয়্যার যুগে যদিও নামাজ ও রোজার বাহ্যিক রূপ চালু ছিল, কিন্তু দ্বীনের আসল সত্যতা বন্দিত্বের শিকার হয়েছিল। অনেক সময় দ্বীনের নামে এমন কাজ করা হতো যা দ্বীনের সঠিক রূপেও ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, নফল নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা হতো, অথচ নববী সুন্নাতে এর কোনো স্থান ছিল না।
সুতরাং যখন ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন, “আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের দিকে আহ্বান করছি”, তখন উদ্দেশ্য হলো সমাজকে দ্বীনের আসল সত্যতার দিকে ফিরিয়ে আনা, শুধু তার বাহ্যিক রূপ নয়। অনেক সময় এই বাহ্যিক রূপই মানুষকে বিভ্রান্ত করে। কেউ হয়তো বাহ্যিকভাবে খুব ধার্মিক মনে হয়, ধর্মীয় মজলিসে উপস্থিত থাকে অথবা ইবাদতগুজার হয়, কিন্তু এই বাহ্যিকতা একা দ্বীনের অভ্যন্তরীণ সত্যতা ও সুস্থতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। দ্বীনের মূল সারবস্তু এই বাহ্যিকতার চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্যটি সেই চিঠিতে রয়েছে, যা তিনি হযরত মুসলিম ইবনে আকীল (আ.)-এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত ‘ইমাম’ এর সত্য স্বরূপকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। ইমাম বলেন:
«فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের কসম! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কুরআনের উপর আমল করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, সত্য দ্বীনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অটল থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে দেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। অতএব, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হিজরত ও কিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল দ্বীনকে দুষ্টদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা।
১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) আসলে কোন সত্যের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? তিনি কি শুধুমাত্র নামাজ, রোজা ও হজ্জের হেফাজতের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি এর চেয়ে অনেক গভীর ও মৌলিক কোনো বিষয় ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর ফিরে যায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠ (কিরাআত) গঠনের ইতিহাসে। নবী করীম (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী সমাজে ইসলামের দুটি ভিন্ন পাঠের উদ্ভব ঘটে।
প্রথম পাঠটি সাকীফার ঘটনায় আবির্ভূত হয়। সেই ধারার পরিকল্পনাকারীরা ইমামকে সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ‘সাহাবায়ে কেরামের ন্যায়বিচার’ ও ‘সকল সাহাবীর সমান মর্যাদা’র মতো শ্লোগান দিয়ে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করেন যেখানে শুধু আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-কে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করে সব সাহাবীকে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। এই পন্থার ফল ছিল ইমামকে কোণঠাসা করে দেওয়া এবং সমাজের মূল হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সত্যিকারের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া।
সাকীফার ঘটনায় মূল প্রচেষ্টা ছিল আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-কে ইসলামী সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তাই এ কথা ভাবা ঠিক হবে না যে, তিনি ও তাঁর মহান সন্তানগণ সেই যুগের যুদ্ধ পরিচালনা বা ক্ষমতা কাঠামোয় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। মূলত সেই ধারার লক্ষ্য ছিল এই পবিত্র খান্দানকে সমাজের হেদায়েতের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়া, তাঁদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা নয়। কারণ এমনটি করা তাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী ছিল।
অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর কাছে পরামর্শ চাওয়া হতো এবং তিনি হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করে উত্তর দিতেন। এটি ছিল একটি স্বাভাবিক বিষয়; কারণ ইমামের দায়িত্ব হলো হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেওয়া। এমনকি মু‘আবিয়া বা ইয়াযীদের মতো ব্যক্তি কোনো প্রশ্ন করলেও ইমাম সত্য গোপন করতেন না। কারণ যদি আল্লাহর হুজ্জাত প্রকাশ না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন কেউ যেন অজুহাত দেখাতে না পারে যে, তাকে হেদায়েতের পথ দেখানো হয়নি।
রেওয়ায়েতেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। যেমন, কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে, যখন ইবলিস হযরত মূসা (আ.)-এর সামনে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আমার জন্য কি ফিরে আসার কোনো পথ আছে?” তখন হযরত মূসা (আ.) বললেন, “যদি আল্লাহর নির্দেশ মেনে নাও এবং হযরত আদম (আ.)-এর কবরের সামনে সিজদা করো, তাহলে তোমার জন্য তওবার পথ খুলে যাবে।” কিন্তু ইবলিস অহংকারবশত সেই নির্দেশ মেনে নেয়নি। এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো— আল্লাহর অলীগণ হেদায়েতের পথ দেখিয়ে দেন, যদিও কেউ কেউ অহংকারের কারণে তা গ্রহণ করে না।
প্রথম পাঠের বিপরীতে, যা ইমামতকে কোণঠাসা করার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয় পাঠ বনী উমাইয়্যার যুগে গড়ে ওঠে। এই দুই পাঠের মধ্যে পার্থক্য ছিল যে, প্রথম ধারাটি মূলত ইমামকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু উমাইয়্যারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ইমামতকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করে। এই যুগ থেকেই ইমামদের শারীরিকভাবে নির্মূল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়: আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর শাহাদাত, ইমাম হাসান (আ.)-এর শাহাদাত এবং অতঃপর আশুরার ঘটনা ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাহাদাত।
সেই ধারার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী সমাজে ইমামত নামক কোনো বিষয় যেন আর অবশিষ্ট না থাকে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় এই দৃষ্টিভঙ্গির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি প্রসিদ্ধ রেওয়ায়েতে মু‘আবিয়া ও মুগীরার মধ্যকার সংলাপের কথা এসেছে। মুগীরা মু‘আবিয়ার সাথে সাক্ষাতের পর দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসেন। যখন তাঁর কাছে কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন: আমি মু‘আবিয়াকে বলেছিলাম, এখন ক্ষমতা তোমার হাতে, তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই বনী হাশেমের সাথে নম্র আচরণ করো এবং কঠোরতা পরিহার করো। কিন্তু মু‘আবিয়া এমন একটি কথা বলেন যা তাঁর আসল উদ্দেশ্য উন্মোচিত করে দেয়। তিনি বলেন: আমার আগে যারা এসেছিলেন, কিছুদিন ক্ষমতায় ছিলেন এবং চলে গেছেন, তাঁদের কোনো নামই অবশিষ্ট নেই। কিন্তু এই ব্যক্তি অর্থাৎ ইসলামের নবী (সা.)-এর নাম এখনও প্রতিদিন বহুবার মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়। আজানে বলা হয়: «أشهد أن محمدًا رسول الله»। অতঃপর তিনি তীব্র বিদ্বেষের সাথে বলেন, যতক্ষণ এই নাম উচ্চারিত হবে, ততক্ষণ আমাদের কোনো শান্তি নেই।
এই ঐতিহাসিক বর্ণনা স্পষ্ট করে দেয় যে, তাদের মূল সমস্যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল ছিল না; বরং তাদের লক্ষ্য ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইত (আ.)-এর স্মৃতি ও বার্তাকে ম্লান করে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একেবারে মুছে ফেলা। এখান থেকেই সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর কিয়ামের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যদি শত্রু এই পথের নাম ও সত্যতাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তাহলে ইমামের কিয়াম ছিল সেই সত্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করা; দ্বীন ও রাসূলের বার্তাকে জীবন্ত রাখা।
এই প্রেক্ষাপটে বনী উমাইয়্যার যুগে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ধ্বংস করার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মিম্বর স্থাপন করে সেখানে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি অশ্রাব্য গালিগালাজ করা হতো। এছাড়া তাঁর অনুসারীদের উপর প্রবল সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হতো। এতটাই যে, অনেক শিয়া তাদের সন্তানের নাম আলী রাখার সাহস পেতেন না। এমনকি যিনি আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর মহব্বত ও অনুসরণের জন্য পরিচিত হতেন, তাঁকে অনেক সময় কিছু সামাজিক অধিকার ও বাইতুল মালের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হতো। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছিল না; বরং ইসলামী সমাজ থেকে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টা ছিল। তাই ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামকে এই ঐতিহাসিক সংঘাতের কাঠামোয় বুঝতে হবে— ইমামত বিলোপের প্রকল্প এবং দ্বীনের সত্যতা পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার মধ্যকার সংঘাত।
সেই যুগে ইমামতের ধারাকে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার জন্য গুরুতর প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদি আহলে সুন্নাতের হাদীসগ্রন্থসমূহের দিকে দৃষ্টি দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যায় যে, আহলে বাইত (আ.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়েতের পরিমাণ অন্যান্য কিছু রাবীর তুলনায় অত্যন্ত কম। অথচ আবূ হুরায়রা যিনি শুধু নবী করীম (সা.)-এর জীবনের শেষ কয়েক বছর দেখেছিলেন, তিনি অসংখ্য রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর ফযীলতসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে গুরুতর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। অথচ অন্য কিছু ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ফযীলত রচনা করে প্রচার করা হতো। এই ঐতিহাসিক প্রবণতা স্পষ্ট করে যে, সমাজের ধর্মীয় স্মৃতিতে আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদাকে ম্লান করে দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত দিকনির্দেশনা ছিল।
এমনকি পবিত্র ভূগোলের ক্ষেত্রেও এক ধরনের রাজনৈতিক পবিত্রীকরণ লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উমাইয়্যা শাসনের কেন্দ্রস্থল শাম অঞ্চলকে কৃত্রিম রেওয়ায়েত ও ফযীলত দিয়ে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। অথচ ইসলামের পরবর্তী ঘটনাবলির আগে সেই ভূমি ইসলামী ঐতিহ্যে বিশেষ কোনো পবিত্র মর্যাদার অধিকারী ছিল না। এসব পদক্ষেপ ছিল ক্ষমতা সুসংহতকরণ এবং আহলে বাইত (আ.)-কেন্দ্রিক ধারাকে দুর্বল করার একই প্রকল্পের অংশ।
এমন পরিবেশে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়ামের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে— দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং ইমামতের সত্যতা সংরক্ষণ করা, ইমামত বিলোপের প্রকল্পের বিপরীতে। কারবালার ঘটনার পরও এই সংঘাত অব্যাহত ছিল। বর্ণিত হয়েছে যে, ইবরাহীম ইবনে তালহা ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-কে ব্যঙ্গাত্মক সুরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: «مَنِ الغالِب؟» — “কে বিজয়ী হয়েছে?”
হযরত উত্তরে বললেন: «إِذَا دَخَلَ وَقْتُ الصَّلَاةِ فَأَذِّنْ وَأَقِمْ»
“যখন নামাজের সময় হয়, তখন আজান দাও এবং ইকামত বলো।”
আজানে বলো: «أشهد أن محمدًا رسول الله» — দেখো, নবী (সা.)-এর নাম কি মুছে ফেলা হয়েছে?
এই উত্তরের সূক্ষ্মতা এখানে যে, হযরত শুধু বলেননি “নামাজ পড়ো”, বরং আজান ও ইকামতের উপর জোর দিয়েছেন— যেখানে নবী (সা.)-এর নাম ও রেসালাত স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়। অর্থাৎ যদি লক্ষ্য এই নাম ও এই পথকে মুছে ফেলা হতো, তাহলে কি তারা সফল হয়েছে?
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দ্বীনের মূল সারবস্তু হলো ইমামত ও ভিলায়েত। অসংখ্য রেওয়ায়েতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, ভিলায়েত ও আহলে বাইত (আ.)-এর মহব্বত ছাড়া ইবাদতগুলো পূর্ণতা লাভ করে না। এসব রেওয়ায়েত বিভিন্ন উৎসে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের কাছে ইমাম সাদেক (আ.)-এর কথাই মানদণ্ড, যিনি আয়াতে তাতহীরের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর কথা নববী হেদায়েতের ধারাবাহিকতা। এই ভিত্তিতে বলা হয়েছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) নৌকা নাজাত হয়েছিলেন, যাতে ইমামতের সত্যতা টিকে থাকে।
১৪৪৫ হিজরিতেও একটি রূপক অর্থে ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, রেওয়ায়েতে এসেছে— আল্লাহর নবীগণ বরজখ জগতে কারবালা যিয়ারতে আসেন। এই বক্তব্য সেই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে যে, তাওহীদ ও নবুয়্যতের ধারা সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর আত্মত্যাগের আলোয় অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ যদি সেই কিয়াম না ঘটত, তাহলে ধর্মের ইতিহাসের পথ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্ধারিত হতো।
১৪৪৬ ও ১৪৪৭ হিজরিতেও তিনটি মৌলিক অক্ষ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমত, ইমামের মদীনা থেকে মক্কা এবং তারপর কারবালার দিকে যাত্রাপথ; কেন এবং কীভাবে তিনি মদীনা থেকে বের হয়েছিলেন, মক্কায় কী ঘটেছিল, কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং কীভাবে তিনি তাঁর কিয়ামের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ইমামের শাহাদাত সম্পর্কে জ্ঞানের বিষয়। ইমাম হুসাইন (আ.) কি জানতেন যে তিনি শাহাদাতবরণ করবেন? আর যদি জেনে থাকেন, তাহলে কি এই জ্ঞান তাঁর তাকলীফ (দায়িত্ব) বাতিল করে দেয়? এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, ইমামের গায়েবী জ্ঞান আল্লাহর অনুমতিক্রমে হয়, কিন্তু তাঁর সামাজিক জীবন স্বাভাবিক ও সাধারণ নিয়ম অনুসারেই চলে। ইমাম যদিও সকল বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে অবগত, তথাপি সামাজিক কর্মক্ষেত্রে তিনি তাকলীফের স্বাভাবিক পথ অনুসরণ করেন। তাই আমরা কারবালায় এমন কোনো অলৌকিক হস্তক্ষেপ দেখি না যা ঘটনার বাহ্যিক পরিণতি পরিবর্তন করে দেয়। কারণ আল্লাহর সুন্নাত (নিয়ম) হলো কার্যকারণের স্বাভাবিক প্রবাহ।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর আরেকটি বক্তব্যের অংশে, যা একটি ওসিয়তনামার মতো এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহর উদ্দেশ্যে লেখা, একই অর্থ আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যাহ, যেমন ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, জঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে শারীরিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং ইমামের সাথে সঙ্গী হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য ছিল না। তথাপি ইমাম তাঁর উদ্দেশ্যে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং তাতে নিজের আন্দোলনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তুলে ধরেন।
হযরত সেই চিঠিতে বলেন যে, আমার মদীনা থেকে বের হয়ে আসা কোনো খেল-তামাশা বা বিনোদনের জন্য নয়, না কোনো প্রবৃত্তির অনুসরণে, আর না কোনো ফাসাদ বা জুলুমের উদ্দেশ্যে। তারপর তিনি কিয়ামের উদ্দেশ্য এভাবে ব্যক্ত করেন: «إِنَّمَا خَرَجْتُ لِطَلَبِ الْإِصْلَاحِ فِی أُمَّةِ جَدِّی»
“আমি তো শুধু আমার দাদার উম্মতের মধ্যে সংস্কারের অন্বেষণে বের হয়েছি।”
এরপর তিনি বলেন: «أُرِیدُ أَنْ آمُرَ بِالْمَعْرُوفِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْکَرِ»
“আমি চাই আমর বিল মা‘রূফ (সৎকাজের আদেশ) করতে এবং নাহী আনিল মুনকার (অসৎকাজ থেকে নিষেধ) করতে।”
এখানে লক্ষ্য করা দরকার যে, «আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার» এর অর্থ শুধু সেই সীমিত ও সাধারণ ধারণা নয় যা কখনো কখনো মনে গড়ে ওঠে। রেওয়ায়েতসমূহেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, যদি কেউ অপরকে বলে “নামাজ পড়ো”, “হিজাব পালন করো” বা কিছু ধর্মীয় আমল করো, তাহলে এটি মূলত এক ধরনের খায়েরখাহী ও নসীহত। এটি অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু কুরআনী ও রেওয়ায়েতী দৃষ্টিকোণ থেকে “আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার”-এর প্রকৃত অর্থ এর চেয়ে অনেক ব্যাপক ও গভীর।
রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে একটি রেওয়ায়েতে এসেছে যে, যদি সকল ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে তাদের অনুপাত হবে এক ফোঁটা লালা বনাম বিশাল সমুদ্রের মতো। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, আমর বিল মা‘রূফ ও নাহী আনিল মুনকার ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের কাঠামো সংরক্ষণে একটি মৌলিক সত্য, শুধু ব্যক্তিগত ও সীমিত উপদেশ নয়। তাই এর আসল অর্থে আমর বিল মা‘রূফ একটি সাংস্কৃতিক ও কাঠামোগত বিষয়, যা সমাজের হেদায়েতের স্তরে অর্থবহ হয়। ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে বলেননি যে, আমরা এসেছি কয়েকটি খুঁটিনাটি বিধান স্মরণ করিয়ে দিতে; বরং বলেছেন: আমাদের পথ্থই আমার দাদা রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমার পিতা আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর পথ্থ: «وَأَسِیرَ بِسِیرَةِ جَدِّی وَأَبِی عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِب»
“এবং আমি আমার দাদা ও আমার পিতা আলী ইবনে আবী তালিবের সীরাত অনুসরণ করব।”
অর্থাৎ মানদণ্ড হলো সমাজকে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আমীরুল মু’মিনীন (আ.)-এর সীরাতের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া।
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর তৃতীয় বক্তব্য রয়েছে সেই চিঠিতে যা তিনি জনাব মুসলিম ইবনে আকীলের মাধ্যমে কুফাবাসীদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে হযরত “ইমাম”-এর সত্যিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন: «فَلَعَمْرِی مَا الإِمَامُ إِلَّا الْعَامِلُ بِالْکِتَابِ، وَالْقَائِمُ بِالْقِسْطِ، وَالدَّائِنُ بِدِینِ الْحَقِّ، وَالْحَابِسُ نَفْسَهُ عَلَى ذَاتِ اللَّهِ»
“আমার জীবনের শপথ! ইমাম তো সেই ব্যক্তি যিনি কিতাবুল্লাহ অনুসারে আমল করেন, ন্যায়বিচার কায়েম করেন, হক দ্বীনের প্রতি অনুরক্ত থাকেন এবং নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেন।”
এই বক্তব্যেও স্পষ্ট যে, মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো দ্বীনের সত্যতা সংরক্ষণ। সুতরাং ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বের হয়ে আসা ও কিয়াম ছিল দ্বীনকে জালিমদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। ১৪৪৫ হিজরিতেও এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছিল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) যে সত্যের জন্য নিজের জান কুরবান করেছিলেন, তা কী ছিল? তিনি কি শুধু নামাজ, রোজা ও হজ্জ সংরক্ষণের জন্য কিয়াম করেছিলেন? নাকি আরও গভীর কোনো বিষয় ছিল?
তৃতীয়ত, কুফাবাসীদের আহ্বানের বিষয়। কুফা শহরটি ১৭ হিজরিতে দ্বিতীয় খলিফার নির্দেশে এবং সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাসের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি ছিল একটি সামরিক শহর, যার উদ্দেশ্য ছিল বিজয় অভিযান সংগঠিত করা এবং ইসলামী খিলাফতের ভূখণ্ড সম্প্রসারণ। তাই এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গঠন ছিল বিশেষ ধরনের এবং ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এটি জটিল ও বৈপরীত্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই ঐতিহাসিক পটভূমির পর্যালোচনা থেকে বোঝা যায় যে, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কিয়াম কোনো আবেগীয় বা সাময়িক আন্দোলন ছিল না; বরং এটি ছিল ইমামতের সত্যতা বিলোপের ঐতিহাসিক প্রকল্প এবং দ্বীনের পাঠ বিকৃতির বিরুদ্ধে এক গভীর প্রতিক্রিয়া। কুফা শহরটি মূলত সামরিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, শহরটিতে এমন একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে যা চল্লিশ হাজার মানুষ ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ প্রথম থেকেই সেখানে সৈন্য সমাবেশ ও সংগঠনের জন্য কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। বাস্তবে কুফা ছিল একটি সামরিক ছাউনি শহর।
এমন একটি শহরে জনসংখ্যার গঠনও এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে শক্তিশালী সামাজিক সংহতি গড়ে না ওঠে। বিভিন্ন গোত্রকে পাশাপাশি রাখা হয়েছিল যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ বন্ধন একটি বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বাধা সৃষ্টি করে। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদল অভিবাসীও ছিল, যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি, যাঁরা শিল্প ও পেশাগত দক্ষতার কারণে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। এই গোষ্ঠীগুলোকে কোনো কোনো সূত্রে ‘মাওয়ালী’ বলা হয়েছে। একই সাথে, প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে ‘শী‘আ’ শব্দটি আজকের ব্যবহার থেকে অনেকাংশে ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতো।
কোনো কোনো প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর ঐতিহাসিক ও কালামী গ্রন্থে যাঁরা আমীরুল মু’মিনীন আলী (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতেন কিন্তু তাঁর পূর্ববর্তী খিলাফতকেও মেনে নিতেন, তাঁদেরকেও কখনো কখনো শী‘আ বলে গণ্য করা হতো। এটি প্রমাণ করে যে, সেই যুগের সমাজের আকীদাগত কাঠামো আজকের সরল বিভাজনের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল। কুফায় এমন কিছু গোত্র ছিল যাদের জনসংখ্যা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, বনী মুরাদ গোত্র, যার নেতৃত্বে ছিলেন হানী ইবনে উরওয়া, তাদের জনসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। আরব সংস্কৃতিতে রক্তের বদলা ও গোত্রীয় সমর্থনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই লাইলাতুল মাবিতের ঘটনাতেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হত্যায় অংশ নেবেন, যাতে হত্যার দায়িত্ব গোত্রগুলোর মধ্যে বণ্টিত হয় এবং বনী হাশেম রক্তের বদলা নিতে না পারে।
তথাপি কুফার ঘটনায় আমরা দেখি যে, এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই শক্তির অনেকাংশই শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল শহরের প্রশাসনিক পরিবর্তন। প্রথমদিকে কুফার গভর্নর ছিলেন নু‘মান ইবনে বশীর, যিনি রাজনৈতিকভাবে খুব সক্রিয় ছিলেন না এবং ইয়াযীদের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল না। ফলে শুরুর দিকে শহরের পরিবেশ কিছুটা উন্মুক্ত ছিল এবং মুসলিম ইবনে আকীল কিছু লোকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু যখন পরিস্থিতি বদলে যায় এবং উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে কুফার শাসক নিযুক্ত করা হয়, তখন অবস্থা দ্রুত পাল্টে যায়। উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ, যিনি পূর্বে বসরার গভর্নর ছিলেন, অত্যন্ত নির্মমতা ও ভীতি সৃষ্টির নীতি নিয়ে কুফায় প্রবেশ করেন এবং শহরের পরিবেশকে অত্যন্ত নিরাপত্তামূলক করে তোলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর নির্মম আচরণের কিছু উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে, যা দেখায় তিনি কীভাবে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিরোধীদের দমন করতেন। তাঁর আগমনের পর যাঁরা আগে সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই সন্দেহ বা ভয়ে পিছিয়ে পড়েন। অবশ্য এই ভয় সকলের মধ্যে সমান ছিল না। কিছু বড় শী‘আ ব্যক্তিত্ব, যেমন মুসলিম ইবনে আওসাজা ও হাবীব ইবনে মুজাহির বিপদের ঝুঁকি নিয়েও ইমামের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু কুফার সমাজের এক বড় অংশ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তামূলক চাপের সামনে পিছু হটে যায়।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য শুধু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নয়। কারণ আমাদের জন্য মূল বিষয় হলো নিজেদেরকে চেনা। ইতিহাস তখনই মূল্যবান যখন তা আমাদের আজকের অবস্থার আয়না হয়ে ওঠে। যদি একদিন আল্লাহর হুজ্জাতের আবির্ভাব ঘটে, তাহলে মূল প্রশ্ন হবে— আমরা এই ঘটনার কোন পক্ষে থাকব? কুফার সমাজের যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সেগুলো কি আমাদের মধ্যেও বিদ্যমান? যদি থাকে, তাহলে সেই একই ভুলগুলো আবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।4361458 #