শহীদ নেতা ইরানের, হযরত আয়াতুল্লাহ আল-উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের সাথে জনগণের বিদায় ও বদরকা অনুষ্ঠান আজ সকাল ৬টা থেকে তেহরানের ইমাম খোমেইনী (রহ.) মসল্লায় বিপুল ও ঐতিহাসিক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত জনগণ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ‘ইরানের শহীদ নেতা’-এর সাথে শেষ দেখা করেছেন। অনুষ্ঠানটি আগামীকাল সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত চলবে এবং তারপর সোমবার তেহরানে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
ইকনা’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহীদ নেতা ইরানের সাথে বিদায় ও বদরকা অনুষ্ঠান দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অগণিত ভক্ত ও শোকাহত জনতার উপস্থিতিতে আজ শনিবার ১৩ই তির মাস সকাল ৬টা থেকে তেহরানের ইমাম খোমেইনী (রহ.) মসল্লায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
অনেক মানুষ রাতের শেষ প্রহর থেকেই মসল্লায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, যাতে শহীদ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেই-এর পবিত্র দেহের সাথে বিদায় অনুষ্ঠানের প্রথম মুহূর্তগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

ইমাম খোমেইনী (রহ.) মসল্লায় উপস্থিত জনতা শহীদ নেতার পবিত্র দেহ মঞ্চে আনয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মসল্লার পরিবেশ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, মাতম ও অসংখ্য শোকাহত জনতার উপস্থিতিতে ভরপুর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এই অনুষ্ঠানে সমবেত হয়েছেন।
সকাল ৭:৩০টায় অনুষ্ঠানস্থলে ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সঙ্গীত সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়।

কত মহান ও হৃদয়বিদারক এই বিদায়! রাস্তাঘাট নীরবে শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু এই নীরবতার মাঝে আত্মার গভীর থেকে এক আর্ত চিৎকার উঠছে। «বায়াদ বরখাস্ত» (উঠে দাঁড়াতে হবে)— এটিই অনুষ্ঠানের মূল স্লোগান, যা আকাশী প্রতিধ্বনির মতো এই দিনের শিরোপায় অঙ্কিত হয়েছে।
মুষ্টিবদ্ধ হাত এই বদরকার আনুষ্ঠানিক প্রতীক; যা সেই পিতৃসুলভ হাতের প্রতীক যা কখনো ঝড়ের সামনে কাঁপেনি এবং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত অটল ছিল।
জনতা শোকাহত মানুষের এক বিশাল ঢেউ, যা প্রতিটি গলি-রাস্তা থেকে এদিকে ছুটে আসছে। অশ্রুসিক্ত চোখ এবং আকাশের দিকে উঠে আসা হাত— যা তাঁর আদর্শের সাথে বাইয়াতের প্রতীক— অমর দৃশ্যের সৃষ্টি করছে। এর মাঝে জনতার ভিড় থেকে সালাওয়াতের ধ্বনি ও কুরআনের আয়াত ভেসে আসছে। সেই আয়াতসমূহ যা এই শহীদ ইমামের উন্নত আত্মার সাথে মিশে ছিল। জনগণ জানে যে, তিনি তাঁর বরকতময় জীবনভর সর্বদা কুরআনের সাথে অন্তরঙ্গ ছিলেন। এই তিলাওয়াত শুধু বিষাদের সুর নয়, বরং এই পবিত্র রক্ত থেকে উৎসারিত আত্মিক পুনর্জাগরণের সুর।
জনগণের মদাহি, অন্তর থেকে উৎসারিত কবিতার মাধ্যমে এই ধূলিময় আকাশকে বিদীর্ণ করছে এবং প্রত্যেক শ্রোতাকে হকের জন্য কিয়াম ও রক্তের বদলার ডাক দিচ্ছে। ইয়া হুসাইন ও ইয়া যায়নাব-এর ধ্বনি জনতার অবিরাম অশ্রুর সাথে মিশে যাচ্ছে এবং বিশ্বের মুক্তিকামীদের সর্দারের শোক এক নতুন আশুরার ছায়া ফেলছে। কত সুন্দর যে, এই বিদায় মহররম মাসে— রক্তের উপর তলোয়ারের বিজয়ের মাসে— সংঘটিত হয়েছে।

এই বদরকা শুধু একটি বিদায় নয়, বরং একটি স্পষ্ট বিজয়ের সূচনা, সেই মাকতাবের সাথে নতুন অঙ্গীকার— যা এখন তার শহীদের রক্তে সিক্ত হয়েছে। বিশ্ব ইসলামের এই মহান অতিমানবের সাথে পুনরায় অঙ্গীকার, যিনি যুগের তাগুত ও মুস্তাকবির অপরাধীদের সামনে অটল দাঁড়িয়েছিলেন এবং হক ও হাকীকতের পথ থেকে এক মুহূর্তও বিচ্যুত হননি। «বায়াদ বরখাস্ত»— কারণ এই রক্ত এতটাই উত্তাল যে, এটি বিশ্বের মুক্তিকামীদের হৃদয়ে আর স্থবিরতা ও নীরবতা বরদাশত করবে না।
(ভিডিও) হাজ মাহদী রাসূলীর মদাহিতে খুনখাহী ও ইনতিকাম (প্রতিশোধ) বিষয়ক কবিতা পরিবেশিত হয় এবং জনতা এককণ্ঠে শহীদ নেতা ইরানের পবিত্র রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের উপর জোর দেয়। এরপর মসল্লায় উপস্থিত শোকাহতরা মুষ্টিবদ্ধ হাতে আল্লাহু আকবার ধ্বনি তুলে শহীদ ইমামের সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় এবং তাঁর রক্তের বদলা দাবি করে। একসাথে তারা মৃত্যু আমেরিকার ও মৃত্যু ইসরাইলের স্লোগান দেয়।
এরপর উপস্থিত জনতা মাজিদ ইয়ারাকবাফানের কণ্ঠে হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর বিশেষ দরূদ পাঠ করেন। তারপর আহমাদ বাবায়ী আবেগময় কবিতা আবৃত্তি করেন এবং হাজ মুহাম্মাদ রেজা বাজরী আহলে বাইত (আ.)-এর মারসিয়া পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠানের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য ছিল ইরানের বীর লুর জাতির সদস্যদের স্থানীয় পোশাকে শহীদ নেতার সাথে বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি।
মুহসিন মাহমূদী পানাহ-এর কণ্ঠে «বায়াদ বরখাস্ত» মদাহির পরিবেশন অনুষ্ঠানে একটি বীরত্বব্যঞ্জক ও উদ্দীপনাময় পরিবেশ সৃষ্টি করে।
এরপর শহীদ নেতার কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের সাথে অন্তরঙ্গতার উপর বারবার জোর দেওয়ার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক কারী ইউনুস শাহমারদী কুরআন তিলাওয়াত করেন।
অনুষ্ঠানের আরেক অংশে সাইয়্যেদ মাহমূদ আলভী আহলে বাইতের প্রশস্তিমূলক গান পরিবেশন করেন।
আজ সেই জনগণ, যারা চার মাস আগে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটিয়েছিল, আজ দুঃখভারাক্রান্ত কিন্তু দৃঢ় হৃদয় নিয়ে তাদের নেতার শোককে হালকা করছে। এই মানুষ এই মুহূর্তকে গনিমত মনে করে তাদের উপস্থিতির মাধ্যমে শহীদের প্রতি শেষ সম্মান জানাচ্ছে। এই বিদায় নিজেই আরেকটি মহান ঘটনা।
তীব্র গরম সত্ত্বেও জনসংখ্যা কমেনি, বরং প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। এই জনতা এককণ্ঠে ময়দানে চিৎকার করে বলছে যে, শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধই তাদের হৃদয়ে প্রশান্তি আনতে পারে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পাকিস্তানি ভাই-বোনদের তেহরান মসল্লায় শহীদ নেতার পবিত্র দেহের সাথে বিদায় অনুষ্ঠানে উপস্থিতি।
আমির আব্বাসীর মদাহি, আশুরার অমর নোহা এবং জনতার বুক চাপড়ানো— হযরত সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.) ও শহীদ নেতার স্মরণে— অনুষ্ঠানের অন্যতম অংশ ছিল।
অনুষ্ঠান পরবর্তীতে হাজ সাদেক আহাঙ্গরানের হৃদয়স্পর্শী কণ্ঠে আশুরা ও কারবালার পরিবেশ এবং পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। উপস্থিতরা জানে ফেদায়ে মিল্লাত-এর বিচ্ছেদে অশ্রু ঝরান।
শহীদ নেতার পবিত্র দেহের সাথে বিদায় অনুষ্ঠান আগামীকাল রবিবার ১৪ই তির সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত চলবে। আগামীকাল সকালে মসল্লায় জনগণ ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শহীদ নেতার দেহে নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
শহীদ নেতা ও তাঁর পরিবারের পবিত্র দেহের জানাজা সোমবার ১৫ই তির তেহরানে অনুষ্ঠিত হবে।
খবর চলমান রয়েছে....
