ইকনার সংবাদদাতা জানিয়েছেন, রবিবার ১৪ জুলাই ভোর থেকেই, যদিও অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সময় সকাল ৬টা ঘোষণা করা হয়েছিল, তবুও ইমাম খোমেইনী (রহ.) মুসাল্লার সকল প্রবেশদ্বারের সামনে বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। গভীর আবেগ ও শোক নিয়ে তাঁরা এই ঐতিহাসিক বিদায়ী অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এসেছিলেন।
এই বিশাল জনসমাগমের দৃশ্যটি অতীতে ঈদুল ফিতরের সকালের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। প্রায় চার দশক ধরে এই একই স্থানে উম্মাহর নামাজী জনতা তাদের প্রিয় নেতার পেছনে নামাজ আদায় করার আগ্রহে ভোর থেকেই সমবেত হতেন।

এমন বিশাল জনসমাগমে সবসময় আশঙ্কা থাকে যে, ভিড়ের কারণে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এই অনুষ্ঠানের তত্ত্বাবধান যেন অন্য কারো হাতে ছিল। জনতা অত্যন্ত শান্ত, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সমন্বিতভাবে প্রবেশ করেছেন। মনে হচ্ছিল যেন তাঁরা এই মুহূর্তটি বহুবার অনুশীলন করেছেন। ফলে বাস্তবে শুধু শান্তি, শৃঙ্খলা, মর্যাদা ও বিশালত্বই প্রতিফলিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানের প্রথম কয়েক মিনিটের মধ্যেই জনতার সারি বাড়তে থাকে এবং অল্পক্ষণের মধ্যে মুসাল্লার প্রধান উঠান ও বারান্দা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এই বিপুল জনতার মধ্যে সকল বয়সের মানুষ উপস্থিত ছিলেন— শিশু থেকে শুরু করে কিশোর, যুবক, মধ্যবয়সী এবং বয়স্করা। পরিবারের সাথে আসা পরিবারগুলোর উপস্থিতি ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক।
অধিকাংশ উপস্থিত ব্যক্তি কালো পোশাক পরিধান করেছিলেন। জনসমুদ্রের মাঝে লাল পতাকা ও ব্যানার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছিল। এসব পতাকায় “ইয়া সারাতুল হুসাইন” লেখা ছিল, যা অনেকের কাছে শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

জনতার জিকির ও স্লোগান কখনো কখনো ফিসফিসানি ছাড়িয়ে মুসাল্লার আকাশে ধ্বনিত হচ্ছিল। অনেক স্লোগানে “ইয়া সারাতুল খামেনেই” ধ্বনি উঠছিল।
এরপর আহলে বাইত (আ.)-এর প্রখ্যাত মাদ্দাহ মীসাম মুত্তাকী তাঁর স্বকীয় সুরে মাদ্দাহ পরিবেশন করে অনুষ্ঠানের আবেগ ও উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলেন। জনতার অবস্থা এমন ছিল যে, মনে হচ্ছিল তাঁরা শুধু নেতার বিদায়ী সাক্ষাতের জন্য আসেননি, বরং একটি দৃঢ় অঙ্গীকারও উচ্চারণ করছিলেন— আমেরিকা ও ইহুদিবাদী সত্ত্বার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ, যাদেরকে তাঁরা শহীদ নেতার হত্যার মূল দায়ী মনে করেন।

মীসাম মুত্তাকীর আগুনঝরা মাদ্দাহর পর আসেন আইনী কবি মুহাম্মদ রাসূলী। তিনি রজজের সুরে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন, যাতে শহীদ নেতার হত্যাকারীদের প্রতি কোনো ছাড় না দেওয়ার দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করা হয়। এতে জনতার প্রতিশোধের স্লোগান আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
এ সময় শহীদ নেতার পবিত্র পার্থিব দেহ পূর্বপ্রস্তুত মঞ্চে স্থাপন করা হয় এবং তাঁর উপর নামাজে জানাজার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। এই নামাজ আদায় করেন আয়াতুল্লাহিল উজমা জাফর সুবহানী। এটি ৩৭ বছর আগে ইমাম খোমেইনী (রহ.)-এর জানাজার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
নামাজের পরও মুসাল্লার পরিবেশ শোকে আচ্ছন্ন ছিল। অনেকের চোখ দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত অশ্রু ঝরছিল। এই বিদায়ী মুহূর্তটি হয়ে উঠেছিল গভীর বেদনা, নীরবতা ও দোয়ার জিকিরে মিশ্রিত এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
মুসাল্লার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত কংক্রিট ব্যারিকেডে (নিউজার্সি) জনতার লেখা অসংখ্য বার্তা ও চিরকুট চোখে পড়ছিল। প্রতিটি লেখায় বিচ্ছেদের বেদনা, শহীদ নেতার প্রতি ভালোবাসা এবং শোকাহত জনতার অনুভূতি ফুটে উঠেছিল। 4362378#