ইকনা: ইমাম শহীদ হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলী হুসাইনী খামেনীর দৃষ্টিতে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক বা সাময়িক পদক্ষেপ নয়; বরং এটি একটি “সভ্যতামূলক কৌশল” এবং “ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রমকারী ফরজ”। তিনি ইসলামী বিশ্বের সামনে চ্যালেঞ্জগুলোকে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে ঐক্যকে বর্তমান যুগে উম্মাহর সম্মান ও শক্তি অর্জনের একমাত্র পথ বলে মনে করতেন।
বাহরাইনি আলেম শেখ আবদুল্লাহ দাক্কাক ইকনার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইমাম শহীদের চিন্তাধারা বিশ্লেষণ করে মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্য, এ পথের প্রতিবন্ধকতা এবং ফেরকাবাদী সংকট মোকাবিলায় উলামা ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা তুলে ধরেছেন।
ইকনা: ইমাম শহীদ বিপ্লবের দৃষ্টিতে মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের বিষয়টি কেমন ছিল এবং কেন তিনি এটাকে অপরিহার্য মনে করতেন?
ইমাম শহীদ হযরত আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হুসাইনী খামেনী ইসলামী ঐক্যকে একটি শরীয়তি ফরজ এবং ইসলামী উম্মাহর জন্য কৌশলগত ও সভ্যতামূলক অপরিহার্যতা হিসেবে দেখতেন। এটাকে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা সাময়িক সুবিধার বিষয় মনে করতেন না। তিনি বলতেন, ইসলামের শত্রুরা ইসলামী উম্মাহকে একটি একক দেহ হিসেবে লক্ষ্য করে এবং বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। তাই রাজনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে মুসলিমদের ঐক্য, মৌলিক মিলনের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং মতপার্থক্য এড়ানোর মাধ্যমেই সম্ভব। এতে উম্মাহর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
ইকনা: তিনি মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্যের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কী মনে করতেন?
আয়াতুল্লাহ খামেনী মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্য ও ঐক্যের প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে নিম্নরূপ চিহ্নিত করতেন:
ক) মাজহাবী গোঁড়ামি ও ফেরকাবাদী একচেটিয়াত্ব; তিনি এটাকে ঐক্যের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা বলে উল্লেখ করতেন এবং বলতেন: “ঐক্যের একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং তা হলো মাজহাবী গোঁড়ামি। এই গোঁড়ামি সব মাজহাবেই বিদ্যমান এবং এটাকে দূর করতে হবে।”
তিনি জোর দিয়ে বলতেন যে, মাজহাবী বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্য বৈধ, কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন মাজহাবের প্রতিরক্ষা অন্য মাজহাবের বিরোধিতা বা তাদের পবিত্রতায় আঘাতের রূপ নেয়।
খ) জনসমক্ষে মাজহাবী ও ঐতিহাসিক বিরোধকে উস্কে দেওয়া; তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য করতেন।
গ) ইসলামী উম্মাহকে বিভক্ত করার লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক প্রকল্পসমূহ। তিনি বলতেন: “ইসলামী উম্মাহর শত্রুরা ইরান ও ইসলামী বিশ্বের মধ্যে এবং মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করতে চায়।”
ঘ) তাকফিরী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীসমূহ; আয়াতুল্লাহ খামেনী তাকফিরকে ইসলামী উম্মাহকে খণ্ড-বিখণ্ড করার সবচেয়ে বিপজ্জনক হাতিয়ার মনে করতেন এবং বলতেন: “তাকফিরী গোষ্ঠীগুলো বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সায়োনিস্ট সত্তার স্বার্থে কাজ করে, যদিও তারা ইসলামের নামে কাজ করে।”
ঙ) ইসলামী উম্মাহর সাধারণ স্বার্থ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ছোটখাটো ও প্রান্তিক বিরোধে জড়িয়ে পড়া।
ইকনা: ইমাম শহীদের বক্তৃতা ও বাণীতে তাকফির ও বিভেদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কতটা গুরুত্ব পেয়েছে?
তাকফির ও মাজহাবী ফিতনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম আয়াতুল্লাহ খামেনীর বক্তৃতা ও বাণীতে কেন্দ্রীয় স্থান দখল করত। তিনি বারবার বলতেন যে, মাজহাবী বিরোধকে উস্কে দেওয়া ইসলামী উম্মাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রকল্প এবং উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করা বর্তমান যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
তিনি স্পষ্ট করে বলতেন যে, ঐক্য মানে মাজহাবগুলোর এক হয়ে যাওয়া বা তাদের আকীদাগত ও ফিকহী বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত করা নয়; বরং উম্মাহর উচ্চতর স্বার্থের ওপর ঐকমত্য এবং সেই স্বার্থ রক্ষায় যৌথ সহযোগিতা।
ইকনা: ইমাম শহীদ কীভাবে ইসলামী ঐক্যকে উম্মাহর সম্মান, শক্তি ও অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করতেন?
ইমাম খামেনী (কুদ্দিসা সিররুহু) বিশ্বাস করতেন যে, ইসলামী উম্মাহর সম্মান, স্বাধীনতা ও বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি তার ঐক্য ও সংহতির ওপর নির্ভর করে। মাজহাবী বিভেদ উম্মাহর সক্ষমতা নষ্ট করে এবং বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শক্তি দুর্বল করে, যেখানে ঐক্য উম্মাহর বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করে।
ইকনা: ইমাম শহীদ মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্য অর্জনে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
ইমাম খামেনী যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ সমর্থন করতেন বা যেগুলোর ওপর জোর দিতেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
ইকনা: তাঁর দৃষ্টিতে মাজহাবসমূহের মধ্যে নৈকট্য অর্জনে উলামা ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা কী?
শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনী মনে করতেন যে, উলামা ও বুদ্ধিজীবীদের এ ক্ষেত্রে বড় দায়িত্ব রয়েছে এবং এ দায়িত্ব নিম্নোক্ত উপায়ে পালন করা যায়:
ইকনা: ইমাম শহীদের সিরাত ও নির্দেশনায় বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কোনো উদাহরণ আপনার মনে আছে?
হ্যাঁ, আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সব ইসলামী মাজহাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন এবং মাজহাবসমূহের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টিকারী আচরণ ও পবিত্রতায় আঘাতের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
তিনি সবসময় মাজহাবী বিরোধের ব্যবস্থাপনা ভ্রাতৃত্ব, সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে করার ওপর জোর দিতেন। এছাড়া তিনি সুন্নি উলামাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং ইসলামী উম্মাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ফিলিস্তিনের ওপর সর্বদা জোর দিতেন। যদিও ফিলিস্তিনের অধিকাংশ জনগণ সুন্নি, তাঁর কর্মকাণ্ড দেখিয়েছে যে তিনি সব মাজহাবের অনুসারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেন।
ইকনা: ইমাম শহীদ চরমপন্থী ও বিভেদ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইসলামী ঐক্যের পক্ষে কীভাবে অবস্থান নিতেন?
ইমাম খামেনী (কুদ্দিসা সিররুহু) এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত উপায়ে লড়াই করতেন:
ইকনা: ইমাম শহীদের ঐক্যবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে প্রতিরোধ অক্ষের সম্পর্ক কী?
আয়াতুল্লাহ খামেনী মনে করতেন যে, আগ্রাসন ও বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইসলামী ঐক্যের বাস্তব প্রকাশের ক্ষেত্র। তাই প্রতিরোধ অক্ষ বিভিন্ন ইসলামী ও জাতিগত উপাদানের মধ্যে সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে যাতে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় এবং উম্মাহর ভাগ্যনির্ধারক ইস্যুসমূহ রক্ষা করা যায়; যার শীর্ষে রয়েছে ফিলিস্তিন ও পবিত্র কুদস ইস্যু।
এই ভিত্তিতে তিনি লেবাননের হিজবুল্লাহ, হামাস, ইসলামী জিহাদ এবং অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করতেন। 4362943#