
খন্দকার, আখন্দ ও মিয়াজি পদবি এসেছে শিক্ষকতা পেশা থেকে। সাধারণভাবে খন্দকার হচ্ছে কৃষিজীবী, তবে ফারসি ভাষায় ‘খন্দকার’ হচ্ছে শিক্ষক। ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের লেখক ছিলেন খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের হোতা ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। ‘আখন্দ’ পদবি ‘খন্দকার’ পদবির অপভ্রংশ। ‘মিয়াজি’ পদবির সঙ্গে ‘মিয়া’ পদবির কোনো সম্পর্ক নেই। ফারসি ভাষায় ‘মিয়াজি’ হচ্ছে শিক্ষক। ভূমির মালিকানা থেকেই ‘ভুঁইয়া’ পদবি। বাঙালি হিন্দুসমাজে যারা ‘ভৌমিক’, মুসলমানদের মধ্যে তারাই ‘ভুঁইয়া’। বাংলার ‘বার ভুঁইয়া’ নামক বার-রাজার কাহিনি আজও বাংলায় কিংবদন্তি হয়ে আছে।
রাজস্ব, জমিজমা ও খাজনাপত্র সম্বন্ধীয় বিষয় থেকে উদ্ভব হয়েছে ‘দেওয়ান’ পদবি। খাজনা আদায়ের জন্য রাজ্যের মুখ্য কর্মচারীর উপাধি ছিল ‘দেওয়ান’। বিশিষ্ট দার্শনিক ছিলেন দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ।
‘হালদার’ ও ‘হাওলাদার’ একই পদবি নয়। ‘হালদার’ হচ্ছে ব্রাহ্মণ কায়স্থ এবং নাপিতের উপাধি। [হরিচরণ : বঙ্গীয় শব্দকোষ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৩৫৭]।
আর ‘হাওলাদার’ মোগল আমলের সামরিক উপাধি। (আরবি) হাওয়াল + (ফারসি) দার হয়ে শব্দটি নির্মিত হয়েছে। [শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী সম্পাদিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ১১০৭]। এখনো পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর সিপাহি কমান্ডারকে হাওলাদার বলা হয়। লেখক ও কমরেড গোপাল হালদার, রাজনীতিক রুহুল আমীন হাওলাদার এই দুই পদবির প্রতিনিধি।
‘মজুমদার’ এসেছে মোগল আমলের রেকর্ডকিপার থেকে। শব্দটি ফারসি। তবে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ি বলছেন, এটা ব্রিটিশ আমলের রাজস্ব অফিসের হিসাব পরীক্ষক। [ব্যাবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ১১০৭]।
এ হিসেবে পদবিটি অনেকটা আজকের ‘অডিটর’ পদের মতোই ছিল। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ে আছে এ পদবির ব্যবহার। বাংলাদেশ বিমানের ম্যানেজার ছিলেন আখতারুজ্জামান মজুমদার।
যে কেউ অবাক হতে পারেন যে বাংলায় ‘জমিদার’ নিয়ে কোনো পদবি নেই; কিন্তু ছোট ছোট তালুকের অর্থাৎ স্বল্প ভূসম্পত্তির মালিক হয়েই ‘তালুকদার’ পদবি বিকশিত হয়েছে। আরবি ‘তাল্লুক’ থেকে ‘তালুক’ এসেছে। বিএনপি নেতা ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদার।
মোগল আমলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের উপাধি ছিল ‘চাকলাদার’। ‘চাকলা’ ছিল এখনকার ‘জেলা’র অনুরূপ। চাকলাদার মানে জেলা প্রশাসক। কিন্তু বংশ পদবি হিসেবে এটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয়নি। ‘জায়গিরদার’ শব্দ এসেছে ‘জায়গির’ ব্যবস্থা থেকে। আগের আমলে কোনো বাড়িতে সন্তানের টিউশনের বিনিময়ে শিক্ষকের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। তবে মোগল আমলে কিছু কর্মচারী ছিল, যারা বেতনের পরিবর্তে ভূসম্পত্তির উপস্বত্ব ভোগ করত। এরাও ছিল ‘জায়গিরদার’। বাংলাদেশে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে সিএনএনের প্রতিনিধি ছিলেন অনু জায়গিরদার।
‘পরের ধনে পোদ্দারি’ এখনো জনপ্রিয় প্রবাদ। বাঙালি মুসলমানে একটি হারিয়ে যাওয়া পদবি হচ্ছে ‘পোদ্দার’। মধ্যযুগে ব্যাংক ছিল না, ফলে ধনসম্পদ-টাকা জমা রাখা হতো যার কাছে তিনি ‘পোদ্দার’ নামে পরিচিত ছিলেন। জমাকৃত অন্যের টাকা তিনি আবার ধার দিয়ে নিজের লাভের অঙ্কও বাড়াতেন। এ জন্যই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ কথাটি প্রচলিত হয়েছিল। মধ্যযুগের কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে লিখেছেন, ‘পোদ্দার হইল যম। টাকায় আড়াই আনা কম’।
আরবি ‘ফুতহ এবং ফারসি’ ‘দা’র মিলে হয়েছে ফুতহদার। তার থেকে ফোতদার এবং এরপর ‘পোদ্দার’।
(অসমাপ্ত)