
শেরোয়ানি মুসলিম আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্ত হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। শেরোয়ানি আচকান থেকে দৈর্ঘ্যে খাটো এবং প্রিন্স কোটের চেয়ে লম্বা। এটি সাধারণত ভারী স্যুটিং কাপড়ে তৈরি এবং এতে ব্যবহৃত হয় ফিউজিং। মধ্যযুগের ইন্দো-পার্সির জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের কারণে পোশাকটি ককেশীয় পোশাকের একটি ভারতীয় রূপ পায়।
সময়ের বিবর্তনে ইউরোপীয় ধরন অনুসরণ করে সামনে বোতাম দেওয়া শেরোয়ানির প্রচলন হয়। পায়জামা, সালোয়ার, চুরিদার, প্যান্ট, ধুতির সঙ্গে শেরোয়ানি পরা হয়। অনেকে শেরোয়ানির সঙ্গে পাগড়ি ও পশমি টুপি ব্যবহার করেন এবং পায়ে থাকে জুতা-মোজা। অন্যান্য শীত পোশাক ও স্যুট-কোটের মতো শেরোয়ানি বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত নয়।
ভারতে মোগলদের আগমনে পোশাকে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে। রাজপরিবার ও অভিজাত নারীর পোশাক, মোগল রাজা-বাদশাহ ও অভিজাত পুরুষের পোশাকের মতোই ছিল। তাঁরা লম্বা হাতা ও ঝুলওয়ালা জামা পরিধান করতেন। ‘হুমায়ুননামা’য় ঢিলা জামা, পায়জামা, টুপি, ওড়নি, কার্তিজি ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী মোগল পোশাকগুলো শেরোয়ানির বিকাশে অবদান রাখে।
ভারতের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এক ধরনের শেরোয়ানি পরিধান করেন, নাম ‘আচকান শেরোয়ানি’। সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পছন্দ ‘আচকান শেরোয়ানি’। সাধারণ শেরোয়ানি ঐতিহ্যগতভাবে মুসলমানদের পছন্দের। দুটি পোশাকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে, যদিও শেরোয়ানিগুলো সাধারণত কোমরের দিকে বেশি প্রসারিত হয়, অন্যদিকে আচকানগুলো সরল শেরোয়ানির চেয়ে লম্বা হয়। আচকান পরবর্তী সময়ে নেহরু জ্যাকেটে বিবর্তিত হয়। আচকান ভারতে অনেক জনপ্রিয়।
পোশাক বিশেষজ্ঞ এমা তারলোর মতে, শেরোয়ানি একটি পার্সিয়ান অঙ্গাবরণ ‘বালাবা’ বা ‘চ্যাপকান’ থেকে বিকশিত হয়। উনিশ শতকের ব্রিটিশ ভারতবর্ষে শেরোয়ানির উত্থান হয়েছিল উত্তর ভারতের অভিজাত মোগল এবং রাজকীয়দের ইউরোপীয় শৈলীর দরবারের পোশাক হিসেবে। ধীরে ধীরে শেরোয়ানি সর্বভারতীয় পোশাক হিসেবে সর্বজনীনতা পায়। শেরোয়ানি ১৮২০-এর দশকে লখনউতে প্রথম প্রদর্শিত হয়। শেরোয়ানি উপমহাদেশের রাজকীয় ও অভিজাতদের দ্বারা এবং পরে সাধারণ জনগণের দ্বারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবে বিকশিত ও গৃহীত হয়। ভারতের রাজস্থান, পাঞ্জাব, দিল্লি, জম্মু, উত্তর প্রদেশ এবং হায়দরাবাদ অঞ্চলের মানুষ শীতকালে প্রথাগত অনুষ্ঠানের জন্য আচকান শেরোয়ানি পরিধান করে। কালক্রমে শেরোয়ানি ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানদের পছন্দের পোশাকের স্থান গ্রহণ করে নেয়।
শেরোয়ানি সাধারণত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট আলেম-ওলামার আভিজাত্যের গর্বে প্রথাগত অনুষ্ঠানে পরা হয়। আলিগড় আন্দোলনের পথিকৃত নবাব মহসিন উল মুলক, স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ প্রমুখের ব্যবহারে শেরোয়ানি বিশেষ মর্যাদায় পরিচয় করিয়ে দেন। জওহরলাল নেহরু, অরবিন্দ সিং মেওয়ার, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক প্রায়ই শেরোয়ানি পরতেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি, বাংলাদেশের হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পছন্দের পোশাক শেরোয়ানি। এটি শ্রীলঙ্কায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে মুদালিয়ারা এবং সাবেক তামিল বিধায়কদের আনুষ্ঠানিক পোশাক হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে শেরোয়ানি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও রাশিয়ার শীতপ্রধান অঞ্চলে সমান জনপ্রিয়তায় ঠিকে আছে।
পোশাক ও মানুষের রুচির বিবর্তনে বর্তমানে শেরোয়ানি প্রধানত দুই প্রকার:
(ক) পদস্থ ব্যক্তিদের ব্যবহৃত স্যুটিং-ফিউজিংয়ে তৈরি শেরোয়ানি, যা executive dress,
(খ) বরের পোশাক হিসেবে নকশাদার ও চকমক করা বিয়ের শেরোয়ানি।
রং-বেরঙের শেরোয়ানি একটি অভিজাত ও জমকালো পোশাক। এতে রয়েছে নানা ধরনের বাহারি কাপড়, দামি বোতাম, পুঁতি-পাথর, লেইস ও সূচি কারুকাজের নান্দনিকতার আকর্ষণীয় ব্যবহার। শেরোয়ানির সঙ্গে পাঞ্জাবির ডিজাইনের সমন্বয়ও বেশ লক্ষণীয়। ফ্যাশন হাউসগুলোর কল্যাণে পছন্দ ও বৈশিষ্ট্যভেদে কয়েক প্রকার পাঞ্জাবির প্রচলন হয়েছে: শেরোয়ানি পাঞ্জাবি, শর্ট পাঞ্জাবি, লং পাঞ্জাবি, কাবলি পাঞ্জাবি, ব্লক বাটিকের পাঞ্জাবি, কারচুপি পাঞ্জাবি, জুব্বা পাঞ্জাবি, বালুচরে নান্দনিক পাঞ্জাবি ইত্যাদি। পাঞ্জাবির ডিজাইনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শেরোয়ানির ডিজাইনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, বরং শেরোয়ানিও বিবর্তিত ও আধুনিক হচ্ছে নতুন প্রজন্মের শৈল্পিক ছোঁয়ায়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর।