IQNA

21:03 - February 01, 2020
সংবাদ: 2610146
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বহু বিশ্লেষকের মতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিগত এক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ও নজিরবিহীন বিপ্লব।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের গৌরবময় অগ্রযাত্রার ৪১ বছর (পর্ব - এক)বার্তা সংস্থা ইকনা'র রিপোর্ট:আধুনিক যুগে ধর্ম-ভিত্তিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটা সমাজ-বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্র-বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল কল্পনাতীত বিষয়। পাশ্চাত্যে ধর্ম কেবলই ব্যক্তি-জীবনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আর মুসলিম বিশ্বেও ধর্মকে জীবনের সব ক্ষেত্র থেকে কোণঠাসা করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি মহলের এক বড় অংশ পশ্চিমাপন্থী শাসক-গোষ্ঠীর সহায়তায়। কিন্তু এমন এক প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বদলে দেয় বিশ্ব-রাজনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থার প্রচলিত সমীকরণ।

ইসলামী বিপ্লবের আগে ইরানে ছিল পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন সরকারের প্রধান সেবাদাস সরকার। কিন্তু ইরানের ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী সরকার হয়ে পড়ে মার্কিন সরকারসহ সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর প্রধান আতঙ্ক। ইহুদিবাদী ইসরাইল এ অঞ্চলে প্রথমবারের মত ভয়াবহ বিপর্যয়ের হুমকির মুখে পড়ে।

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে বিজয়ী-হওয়া ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেশটিতে অবসান ঘটায় মার্কিন কর্তৃত্বসহ তাবৎ পরাশক্তিগুলোর মোড়লিপনা। এ বিপ্লব ফিরিয়ে আনে ইরানি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা, সম্মান ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রার ঐতিহ্য। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়া মার্কিন পরাশক্তি ও তার মিত্ররা নানা ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা অব্যাহত রেখেছে জাতি ইরানের বিপ্লবী জাতি ও তাদের এই মহাবিপ্লব অচল বা অন্তত দুর্বল হয়ে পড়ে। এইসব ষড়যন্ত্র অনুযায়ী তারা কখনও পরোক্ষ যুদ্ধ, কখনও প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন ও কখনওবা কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে। অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ওইসব দাম্ভিক পরাশক্তির চাপিয়ে দেয়া নানা শত্রুতা সত্ত্বেও নতজানু হচ্ছে না ইসলামী ইরান, বরং খাঁটি ইসলামের অদম্য শক্তির বলে দিনকে দিন ভেতরে ও বাইরে এবং বিশ্ব-অঙ্গনে শক্তিশালী হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরান।

এখন প্রশ্ন হল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নানা ধরনের মহাসাফল্যে ও অগ্রযাত্রার রহস্যগুলোর কি কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। হ্যাঁ, আমরা যদি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব ইরানি জাতির প্রশংসায় রয়েছে পবিত্র কুরআনের আয়াত ও হাদিসের প্রামাণ্য বর্ণনা। সহীহ মুসলিমে আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণিত হয়েছে : তিনি বলেন : “আমরা মহানবী (সা.)-এর কাছে ছিলাম। তখন সূরা জুমুআ নাযিল হয়। মহানবী (সা.) সূরা জুমুআর ‘এবং তাদের মধ্যে এখনও যারা তাদের সাথে মিলিত হয় নি’وَ آخَرِيْنَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوْا بِهِم - এ আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করল : ‘হে রাসূলাল্লাহ্! এরা কারা যারা এখনো আমাদের সাথে মিলিত হয়নি?’ মহানবী কোনো উত্তর দিলেন না।” আবু হুরাইরাহ্ বলেন : “সালমান ফারসিও আমাদের মাঝে ছিলেন। মহানবী (সা.) তাঁর পবিত্র হাত সালমানের ওপর রেখে বললেন : ‘সেই আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, ঈমান যদি সুরাইয়া তারকা পর্যন্ত চলে যায় তাহলে এদের তথা সালমানের জাতির মধ্য থেকে একদল লোক তা সেখান থেকে আনয়ন করবে।”

মহানবী (সা.) ইরানীদেরকে (পারস্যবাসীদের) প্রশংসা করে বলেছেন : ‘ঈমান, জ্ঞান বা ইসলাম যত দূরেই থাকুক বা যত কষ্টসাধ্যই হোক না কেন হলেও তারা তা হস্তগত করবে।’(মুসনাদে আহমাদ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৯৭)

সূরা মুহাম্মাদের ৩৮নং আয়াত তথা-‘আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তোমাদের স্থলে অন্য এক জাতিকে আনবেন’- পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের ব্যাখ্যায় স্বয়ং মহানবি (সা.)কে আয়াতটিতে উল্লিখিত জাতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। হযরত সালমান ফারসি মহানবীর (সা.) কাছে উপবিষ্ট ছিলেন। মহানবী (সা.) সালমানের ঊরুতে হাত দিয়ে চাপড় মেরে বলেছিলেন : ‘যে আল্লাহর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, ঈমান যদি দূরতম ছায়াপথগুলোতেও থাকে, তাহলে পারস্যের একদল লোক সেখান থেকেও তা নিয়ে আসবে।’ আদ দুররুল মানসুর, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৫৩।

আহমদ ইবনে হাম্বাল মহানবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন : ‘অতি সত্বর মহান আল্লাহ্ তোমাদের স্থান তথা আরবদের স্থান আজমদের তথা ইরানিদের দিয়ে পূর্ণ করে দেবেন। তারা সিংহের মতো, তারা পলায়নকারী হবে না। তারা যুদ্ধরত পক্ষ ও শত্রুদেরকে হত্যা করবে এবং তারা আরব জাতির গনীমত ব্যবহার করবে না।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১)

“মহানবী (সা.)-এর কাছে পারস্য সম্পর্কে আলোচনা হলে তিনি বলেছিলেন : ‘ইরানিরা আমাদের তথা আহলে বাইতের সমর্থক ও বন্ধু’।” আবু নাঈম তাঁর গ্রন্থে আবু হুরাইরাহ্ থেকে বর্ণনা করেছেন : “মহানবী (সা.)-এর কাছে মাওয়ালী ও আজমীদের ব্যাপারে কথা উঠলে তিনি বলেছিলেন : ‘মহান আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের চেয়ে অথবা তোমাদের কতিপয় ব্যক্তির চেয়ে তাদের ওপর বেশি নির্ভর করি’।”

এসব আলোচনা থেকে বোঝা যায় ইরানি জাতি অথবা তাদের একাংশ খাঁটি ইসলামের পথে অবিচল ছিল, আছে ও থাকবে। আর এ জন্যই বিশ্বব্যাপী সত্যিকারের ইসলামী পুনর্জাগরণের নেতৃত্বে রয়েছে ইরান। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর পরই মুসলমানদের প্রথম কিবলার দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরান এবং ইসরাইলি দূতাবাস পরিণত হয় ফিলিস্তিনি দূতাবাসে। ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনীর সমর্থক বিপ্লবী ইরানি ছাত্ররা ষড়যন্ত্রী পটিয়সী মার্কিন দূতাবাসের কূটনীতিকের ছদ্মবেশধারী ৫২ জন গুপ্তচরদের আটক করলে মার্কিন সরকার ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। প্রায় দেড় বছর পর এই গুপ্তচরদের মুক্তি দেয়া হলেও ইরানে বসেই ইরানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার মার্কিন স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। কারণ সেই থেকে আজও ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই ইমাম খোমেনির ঘোষিত বড় শয়তান মার্কিন সরকারের সঙ্গে। একমাত্র প্রকৃত ইসলাম ও ঈমানি চেতনার কারণেই প্রধান ইবলিসি শক্তিকে এভাবে চপেটাঘাত করতে ও দূরে রাখতে পেরেছে ইরানি জাতি।
সূত্র:parstoday

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: