IQNA

 কুরআন কি বলে/২২

মুবাহালার কাহিনীর আলাপচারিতায় কুরআনের রহস্য

5:05 - July 30, 2022
সংবাদ: 3472201
তেহরান (ইকনা): নাজরান খ্রিস্টানদের মিথ্যা দাবীর উপর অটুট থাকার কারণে মুবাহালার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পবিত্র কুরআনের আয়াত নাযিল হয়। নাযিলকৃত আয়াতে সংলাপ এবং অভিন্নতার বিষয়ে একমত হওয়ার আহ্বান জানায় এবং একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কুরআনের মূল পদ্ধতি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
মুবাহালা হল এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে দুটি পক্ষ নিজেদেরকে সঠিক বলে দাবি করে তাদের ন্যায়পরায়ণতা প্রমাণ করার জন্য অন্য পক্ষের কাছে ঐশ্বরিক অভিশাপ চায় এবং যাদের উপর মহান আল্লাহ অভিশাপ বা লানত বর্ষিত হয়, তারা মিথ্যাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং অপর পক্ষের ন্যায়পরায়ণতা হিসেবে প্রমাণিত হয়।
নাজরানের খ্রিস্টানদের কাছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চিঠি এবং তাদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে মুবাহালার ঘটনা শুরু হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত নাজরানদের পশ্চাদপসরণ এবং তাদের অনেকেই ধর্মান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল। নাজরান থেকে খ্রিস্টানদের একটি প্রতিনিধি দল, যাতে তাদের দশজনেরও বেশি প্রবীণ অন্তর্ভুক্ত ছিল, মদীনায় আসে এবং উভয় পক্ষ তাদের বিশ্বাসের বৈধতার উপর জোর দেওয়ার পরে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে সমস্যাটি মুবাহালার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। মুবাহালা আয়াতটি একই বিষয়কে নির্দেশ করে:
فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ
অতঃপর তোমার নিকট যখন জ্ঞান (কুরআন) এসে গেছে, এরপরও যদি কেউ (খ্রিস্টান) তোমার সাথে তার (ঈসার) সম্বন্ধে তর্ক-বিতর্ক করে, তবে বল: (আচ্ছা, ময়দানে) এস, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের, আমাদের নারীদের এবং তোমাদের নারীদের, এবং আমাদের সত্তাদের এবং তোমাদের সত্তাদের, অতঃপর সকলে মিলে (আল্লাহর দরবারে) নিবেদন করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষণ করি।
সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬১।
মুবাহালার দিন সকালে, হযরত রাসুল (সা.) তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা (সা.), তাঁর ওয়াসি ও প্রতিনিধি হজরত আলী (আ.) এবং তাঁর নাতি ইমাম হাসান  (আ.) ও ইমাম হুসাইন (আ.) অর্থাৎ আহলে বাইত (সা.)-কে নিয়ে মদীনা থেকে বের হন। খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের অন্যতম নেতা আবু হারেসা যখন জানতে পারলেন যে, হযরত মুহাম্মদ (স.) মুবাহালার জন্য কাদের নিয়ে বের হয়েছেন, বললেন: খোদার কসম! অন্যান্য নবীগণ মুবাহালার জন্য যেভাবে বসতেন ঠিক সেই একই ভাবে হযরত মুহাম্মাদ (স.)  বসেছেন। অতঃপর ফিরে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন:  যদি মুহাম্মদ সঠিক না হতেন, তবে তিনি তার প্রিয় মানুষদের সাথে আসতেন না, এবং যদি তিনি আমাদের সাথে মুবাহালা করেন, তাহলে বছর শেষ হওয়ার আগে পৃথিবীতে একটি খ্রিস্টানও অবশিষ্ট থাকবে না।
কুরআন; প্রতিপক্ষের সঙ্গে ক্ষোভ নাকি সংলাপ?
খাওয়ারিজমি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রসুল রাসুলিপুর এই বিষয়ে কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণে সূরা আল-ইমরানের নিম্নোক্ত আয়াতগুলি উল্লেখ করে বলেন যে, কঠিন দ্বন্দ্ব মূলত কুরআনের প্রধান পন্থা নয়, বরং উভয় পক্ষের বোঝাপড়াই হল প্রধান পথ যা পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন; মুবাহালার পর যখন নাজরানের খ্রিস্টানরা মুবাহালার বশ্যতা স্বীকার করেনি, তখন এই আয়াতটি নাযিল হয়: 
قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
তুমি বল, ‘হে গ্রন্থধারীরা! এস, আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক অভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে আসি, আর তা এই যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা করব না, কোন কিছুকে তাঁর অংশী করব না এবং আল্লাহ ব্যতীত আমাদের মধ্যে কেউ অপর কাউকে প্রতিপালক হিসেবে গ্রহণ না করে।’ যদি (তারা এর থেকেও) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, আমরা আত্মসমর্পণকারী।’ 
সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৪। 
এই আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: এখন আপনারা মুবাহালা করতে চান না, আসুন আমাদের যে বিষয়গুলোর মিল রয়েছে তার আলোকে একটি চুক্তি করি।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, পবিত্র কুরআনে মুবাহালার পর আরেকটি অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। খ্রিস্টানদের পশ্চাদপসরণের ফলে মুবাহালা সংগঠিত হয়নি। তবে কুরআনে একথা বলা হয়নি যে, তোমরা যখন প্রস্তুত থাকবে তখন মুবাহালার জন্য আসবে। পবিত্র কুরআনে অবস্থান পরিবর্তন করে বলা হয়েছে: আসুন আমাদের মধ্যে যে বিষয়গুলোর মধ্যে মিল রয়েছে, সেই বিষয় সম্পর্কে কথা বলি। আমার উপসংহার হল যে শাস্ত্রে, নিউ টেস্টামেন্ট এবং ওল্ড টেস্টামেন্ট উভয় ক্ষেত্রেই সংলাপের একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে, লোকেরা নবীদের কাছে তাদের অভিযোগ জানায় এবং তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে।
আরেকটি বিষয় হল, পবিত্র গ্রন্থে এবং পবিত্র কুরআনে আমরা অনেক ঘটনা দেখতে পাই যেখানে মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করা হয়েছে। কিন্তু তিনি তার কথোপকথন এবং যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। ধর্মগ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য হল পুনর্মিলনের জন্য যোগাযোগ, অর্থাৎ, তারা বিচ্যুত মানুষের সাথে শান্তি স্থাপন করতে এসেছিল এবং তাদের বলে যে একটি উপায় আছে, একজন আল্লাহ আছেন, একজন অভিভাবক আছেন এবং নিরাশ হয়ো না। আশার স্থল হল মানুষের সাথে নবীদের কথোপকথন, বিশেষ করে যখন পবিত্র কুরআনে  «یا ایها الناس»  সম্বোধন ব্যবহার করা হয়েছে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক।

 

সংশ্লিষ্ট খবর
নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
captcha