
ধীরে ধীরে তা মুসলিম বিশ্বের সাংস্কৃৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বাঁকা ও পেছানো লিখনপদ্ধতির জন্য এটা সুপরিচিত। ক্যালিগ্রাফিতে সাধারণত রঙিন কালি ও পুরু কাগজ ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন কালে পার্চমেন্ট, চামড়া, কাঠ, মেটাল ও দেয়ালের ওপরও তা করা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে ক্যালিগ্রাফি শিল্পীরা বাঁশ বা গাছের ডালে তৈরি কলম ব্যবহার করেন। ক্যালিগ্রাফি শব্দ-বাক্যে প্রাণ সৃষ্টি করে। সাধারণত গভীর অর্থবোধক ও প্রভাবক বাক্যগুলোই ক্যালিগ্রাফির জন্য নির্বাচন করা হয়। ২০২২ সালে ইউনেসকো আরবি ক্যালিগ্রাফিকে বিমূর্ত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করেছে।
ক্যালিগ্রাফির জনপ্রিয় লিপিগুলো
আরবি ক্যালিগ্রাফিতে ব্যবহৃত কয়েকটি জনপ্রিয় লিখনপদ্ধতি বা শৈলী তুলে ধরা হলো।
১. কুফিক লিপি : ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কুফাতে এই লিখনপদ্ধতির জন্ম। ইসলামের সোনালি যুগে কুফা ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র। ক্যালিগ্রাফিতে কুফিক লিপি বহুল প্রচলিত ও জনপ্রিয়। খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে এই লিখনপদ্ধতির বিকাশ ঘটে।
স্পেন থেকে ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্য থেকে উত্তর আফ্রিকা তথা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রাচীন মসজিদ ও স্থাপনায় কুফিক শৈলীর ক্যালিগ্রাফি খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাথমিক যুগে কোরআনের অনুলিপিতে সাধারণত এই পদ্ধতির অনুসরণ করা হতো। পরবর্তী যুগে তা গম্বুজ, সমাধি, স্থাপনা ও মুদ্রায় কুফিক পদ্ধতিতে লেখা হতো। কুফিক লিপি তার ছোট উল্লম্ব রেখা ও দীর্ঘ অনুভূমিক স্ট্রোকের জন্য পরিচিত। চূড়ান্ত ক্যালিগ্রাফিটি অনেক সময় বর্গাকার বলে মনে হয়। তুলনামূলক সহজ হওয়ায় তা দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
২. দেওয়ানি লিপি : উসমানীয় শাসনামলে ষষ্ঠদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝে দেওয়ানি লিখনপদ্ধতির বিকাশ ঘটে। এটি তার টানা ও প্রবাহিত লিখনপদ্ধতির জন্য সুপরিচিত। দেওয়ানি লিপি সাধারণ অলংকরণ ও কারুকাজে ব্যবহৃত হয়। সুলতান সুলাইমানের নির্দেশে হস্তলিপিশিল্পী হোসাম রুমি দেওয়ানি লিপি উদ্ভাবন করেন। সুলতান সুলাইমানের যুগে তথা ১৫২০ থেকে ১৫৬৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উসমানীয় সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল, অধ্যাদেশ ও নির্দেশনা দেওয়ানি লিপিতে লেখা হয়। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এটা উসমানীয় সালতানাতের দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতো। সাধারণত সোনালি ও কালো কালিতে দেওয়ানি লেখা হতো। এ জন্য লিপিটিকে দেওয়ানি বলা হয়। বর্তমানে বিয়ে ও শুভেচ্ছা কার্ডে এই লিপির ব্যবহার দেখা যায়।
৩. সুলুস লিপি : উমাইয়া শাসনামলে সুলুস (এক-তৃতীয়াংশ) লিপি বা লিখনপদ্ধতির উদ্ভব ঘটে। অন্যান্য লিপির তুলনায় এর আকার এক-তৃতীয়াংশের সমান হওয়ায় একে সুলুস পদ্ধতি বলা হয়। এ পদ্ধতিটি তুলনামূলক জটিল ও কম জনপ্রিয়, তবে এর পাঠোদ্ধার সহজ। কিছুটা লতানো ও বাঁকা করে এটা লেখা হয়। কোরআনের অনুলিপি তৈরিতে সুলুস লিপির ব্যবহার খুব কম চোখে পড়ে। পরবর্তী সময়ে পাণ্ডুলিপি, গম্বুজ, শিলালিপি ও সিরামিকসে তার ব্যবহার দেখা গেছে। পবিত্র কাবার গিলাফে সুলুস লিপির ব্যবহার দেখা যায়। এ ছাড়া কাপড়ে এই লিপি ব্যবহার করে কারুকাজ করা হয়।
৪. নকশ লিপি : নকশ অর্থ অনুলিপি করা। বৃত্তাকার ও লতানো এই লিপির ব্যবহার ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে পাওয়া যায়। কোরআন, ইসলামী বই, সাহিত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক পাণ্ডুলিপি তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। ক্যালিগ্রাফির অন্যান্য লিপির তুলনায় এর বর্ণগুলো ছোট হওয়ায় শিল্পী দ্রুত অঙ্কন করতে পারে। ফলে দীর্ঘ লেখার জন্য নকশ পদ্ধতি বেশি ব্যবহৃত হয়। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টীয় নবম শতকে আব্বাসীয় হস্তলিপিশিল্পী ও মন্ত্রী ইবনে মুকলা আল-শিরাজি কুফিক লিপি থেকে এটি উদ্ভব করেন। পরবর্তী সময়ে তুর্কি ও আরব হস্তলিপিশিল্পীরা এর বিকাশে অবদান রাখেন।
৫. রায়হানি লিপি : রায়হান নামক সুগন্ধিযুক্ত উদ্ভিদ থেকে নামটি গ্রহণ করা হয়েছে। কেননা রায়হানি লিপি সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য। এটা সাধারণত কোরআনের অনুলিপি তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। আব্বাসীয় আমলে হস্তলিপিশিল্পী ইবনে সিতরি রায়হানি লিপি উদ্ভাবন করেন। তিনি কোরআনের হাফেজ ছিলেন এবং নিজ হাতে কোরআনের ৬৪টি অনুলিপি তৈরি করেছিলেন।
৬. মুহাক্কাক লিপি : আরবি ‘মুহাক্কাক’ শব্দের অর্থ সম্পাদিত বা সুস্পষ্ট। কোনো ক্যালিগ্রাফি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে চাইলে মুহাক্কাক লিপি ব্যবহার করা হতো। এটা আরবি লিপিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর বলে মনে করা হয়। মুহাক্কাক লিপিতে কোরআনের অনুলিপি তৈরি হতো। মুহাক্কাক লিপির বর্ণনা সর্বপ্রথম পাওয়া যায় ইবনে নাদিমের ‘কিতাব আল-ফিহরিস্ত’-এ। মধ্যযুগের ইসলামী শিল্প-সংস্কৃতি বিষয়ে আল-ফিহরিস্ত একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৭. রিকা লিপি : খ্রিস্টীয় উনিশ শতকে রিকা লিপির বিকাশ ঘটে। মৌলিকভাবে এতে সুলুস লিপির উপাদানগুলোই ব্যবহৃত হয়, তবে এটি আরো বেশি বৃত্তাকার ও মাত্রাগুলো ছোট। রিকা শব্দটি আরবি রুকা শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ টুকরা। পার্চমেন্টের ছোট টুকরাই লেখা হতো বলে এই নাম দেওয়া হয়। উসমানীয় শিল্পীরা এই লিখনপদ্ধতির উন্নয়ন ও বিকাশে বিশেষ অবদান রাখেন। আরবি ভাষাভাষীদের হাতের লেখার পদ্ধতি হিসেবে রিকা লিপি জনপ্রিয়। আধুনিক ক্যালিগ্রাফি শিল্পী, পত্রপত্রিকা ও বিজ্ঞাপনে তা ব্যবহার করা হয়।
তথ্যঋণ : মিডল ইস্ট আই