IQNA

পর্দার আড়ালে: নেতানিয়াহুর ‘বৃহৎ ইসরাইল’ স্বপ্ন

20:20 - August 28, 2025
সংবাদ: 3477965
ইকনা- মনে হচ্ছে, “বৃহৎ ইসরাইল” প্রকল্প কেবল একটি ভূখণ্ড সম্প্রসারণের মানচিত্র নয়, বরং এটি এক ধরনের তোরাহভিত্তিক স্বপ্ন ও আধ্যাত্মিক কাহিনিতে রূপ নিয়েছে—যার মাধ্যমে জায়নিবাদ নিজেদের আধ্যাত্মিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করছে এবং চিন্তাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে নবজাগরণ লাভ করছে।

ইকনা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আল-জাজিরা থেকে উদ্ধৃত: সালমান বোনআমান, রাজনৈতিক বিজ্ঞানে ডক্টরেটধারী এবং কাসাব্লাঙ্কার মাআরিফ স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার”-এর প্রধান, তার এক বিশ্লেষণে নেতানিয়াহুর নতুন পরিকল্পনা বৃহৎ ইসরাইলএবং এর পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এর অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:

যখন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে বললেন: আমি অনুভব করি যে আমার একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব রয়েছেআমি বৃহৎ ইসরাইলের স্বপ্নের সাথে গভীরভাবে যুক্ত, যা ফিলিস্তিন, জর্ডানের একাংশ এবং মিশরের একাংশকে অন্তর্ভুক্ত করে।এটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য বা সাময়িক মিডিয়া-সাক্ষাৎকার নয়।

এই বক্তব্য উন্মোচিত করে যে এই জায়নিস্ট প্রকল্পের ভেতরের গভীর কাঠামো কীযেখানে দ্বন্দ্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানা বা অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়; বরং এটি বিশ্বাস, পরিচয় এবং সভ্যতাগত প্রকল্পের লড়াই।

এই স্পষ্ট বাক্যটি একাই যথেষ্টদশক ধরে চলে আসা সেই সব সেক্যুলার-ভৌতবাদী ও বাস্তববাদী-যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণকে দুর্বল করার জন্য, যেগুলো জায়নিস্ট শাসককে একটি আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করেছে।

কারণ এটি স্পষ্ট করে যে আমরা এমন এক প্রধানমন্ত্রীকে দেখছি, যিনি নিজেকে কেবল একজন রাজনীতিবিদ নয়, বরং একজন ধর্মীয় নেতা ও ঐতিহাসিক-ঐশ্বরিক মিশনের অধিনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করছেনযিনি এই বৃহৎ জায়নিস্ট স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিয়োজিত।

এই জায়নিস্ট পরিকল্পনার সাংস্কৃতিক-সভ্যতাগত মাত্রাকে উপেক্ষা করা মানে হলো হয় জ্ঞানের স্তরে এই পরিকল্পনার সাথে এক ধরনের সহযোগিতা, নয়তো এর প্রকৃত সত্তা বোঝায় ব্যর্থ হওয়া। কারণ এই অবহেলা সংঘাতটিকে কেবল সীমান্ত-সংক্রান্ত সমস্যা বা নিরাপত্তা হুমকিতে নামিয়ে আনেযা সামান্য চুক্তি বা সীমিত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য মনে হতে পারে।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যগুলোকে গুরুতর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন এবং এগুলোকে একটি জটিল ভূ-সভ্যতাগতদৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার। অর্থাৎ, এই সংঘাতকে এভাবে দেখা উচিত:

·         একটি ধর্মীয়-সভ্যতাগত সংঘাত: ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক রূপান্তর, যা পবিত্র গ্রন্থ ও ধর্মীয় ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে।

·         একটি উপনিবেশবাদী বসতি স্থাপন প্রকল্প: যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনি জাতিকে ধ্বংস করা এবং রাজনৈতিক-জনসংখ্যাগত বাস্তবতাকে পাল্টে দেওয়া।

·         একটি ভূ-রাজনৈতিক বাজি: যা বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সাথে মিলিত হয় এবং অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে।

বৃহৎ ইসরাইলপরিকল্পনায় যা নীরবে অন্তর্ভুক্ত, সেটি হলোফিলিস্তিন রাষ্ট্রের চূড়ান্ত বিলুপ্তির পবিত্রকরণ এবং ফিলিস্তিন মুছে ফেলার বিকল্পের শক্তিশালীকরণতা সে ঐতিহাসিকভাবে হোক কিংবা ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতেই হোক।

এমনকি এর চেয়েও বিপজ্জনক হলোআরব সমাজে এক ধরনের মানসিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত পরিবর্তন আনা, যাতে এই শাসককে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়। এর ফলে এমন এক মানসিক অবস্থার জন্ম দেয়া হয় যেখানে দখল ও শক্তির কাছে আত্মসমর্পণকে স্বাভাবিক বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিনকে আবেগ, চিন্তা, বিশ্বাস, ভূমি ও জনগণসব দিক থেকেই অবমূল্যায়ন করা হয়।

پشت پرده رؤیای  نتانیاهو در ایجاد «اسرائیل بزرگ»
 

৭ অক্টোবরের পর এই পরিকল্পনার কৌশলগত লক্ষ্য

ইসরাইলের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কেবল সরাসরি সামরিক প্রতিরোধে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৃহৎ পরিকল্পনার আকারে প্রকাশিত হয়, যার লক্ষ্য আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার স্বার্থে কাজ করা। এর ফলে পাশ্চাত্য জায়নিবাদইহুদি জায়নিবাদ” (ধর্মীয়-জাতিগত প্রকৃতির) মধ্যে জোট আরও শক্তিশালী হয়।

এখানে মনে পড়ে ট্রাম্পের সেই বক্তব্য: ইসরাইল মানচিত্রে ছোট দেখায়, আর আমি সবসময় ভেবেছি কীভাবে একে সম্প্রসারিত করা যায়।

এই লক্ষ্যগুলোকে চার স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়:

১. নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য বাড়ানো: নজিরবিহীন তথ্যগত ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি।
۲. আঞ্চলিক হেজিমনি চাপিয়ে দেওয়া: যে কোনো স্বাধীন আরব-ইসলামি বৈজ্ঞানিক বা কৌশলগত সক্ষমতা বিকাশের প্রচেষ্টা ভেঙে ফেলা।
৩. আরব-ইসলামি সভ্যতাগত পুনর্জাগরণ নিস্তেজ করা: ধর্মীয় ও পরিচয়ভিত্তিক সংঘাত, বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাড়িয়ে।
۴. জনগণের সফট-পাওয়ার ধ্বংস করা: সম্মিলিত আরব-ইসলামি চেতনাকে দুর্বল করে, জায়নিস্ট অস্তিত্বকে স্বাভাবিকীকরণ করা এবং মুক্তির যেকোনো বিকল্প কাহিনিকে প্রান্তিক করে দেওয়া।

বৃহৎ ইসরাইল প্রকল্প ও কেন্দ্রীয় ইসরাইলধারণা

এসবই এক সর্বাত্মক কৌশলগত সচেতনতা দাবি করে, কারণ এটি এক গণহত্যা-উপনিবেশবাদী প্রকল্পযার লক্ষ্য দখল, বিভাজন, অব্যাহত গণহত্যা, উদ্বাস্তু তৈরি ও বসতি স্থাপন বৃদ্ধি করা। জায়নিস্ট সাহিত্য একে বৃহৎ ইসরাইলবা তোরাহভিত্তিক ইসরাইলনামে চিহ্নিত করে।

এটি এমন এক অবস্থার দিকে নিয়ে যায়, যাকে বলা যেতে পারে কেন্দ্রীয় ইসরাইল”—যা পুরো অঞ্চলের উপর সর্বাত্মক প্রভুত্ব ও সক্রিয় সব শক্তিকে নিজের অধীনস্থ করার চেষ্টা করবে।

জায়নিস্ট শাসক: পরম অশুভ

এই শাসক তার ধ্বংসাত্মক প্রকৃতি আড়াল করে না; এটি আসলে পরম অশুভ। কারণ এটি বন্য শক্তি ও ধর্মীয়-সভ্যতাগত প্রতিশোধের যুক্তি থেকে পরিচালিত হয় এবং এটি কোনো নৈতিক, মানবিক বা মূল্যভিত্তিক ব্যবস্থাকে স্বীকার করে নাব্যতীত জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব, উপনিবেশবাদী আধিপত্য ও নিজেকে ঈশ্বরতুল্য করার যুক্তি।

নেতানিয়াহুর বক্তৃতা, ৭ অক্টোবরের আগে ও পরে, হলো জায়নিস্ট প্রকল্পের ভিতরে প্রবেশের মূল চাবিযা কূটনৈতিক মুখোশ ও বাহ্যিক যুক্তির বাইরে প্রকৃত রূপ দেখায়।

আরব বুদ্ধিজীবীদের বোঝা উচিত, এই প্রকল্পের মোকাবিলা কেবল সামরিক লড়াই বা আলোচনার মাধ্যমে নয়; বরং এটি একটি সভ্যতাগত ও মূল্যবোধভিত্তিক সংগ্রামযার উদ্দেশ্য নিজেদের পুনর্গঠন এবং ইসলামি উম্মাহকে আধ্যাত্মিক, চিন্তাগত ও প্রতীকী নিরাপত্তা দান।

গাজা: সভ্যতাগত স্থিতির প্রতীক

একটি ধ্বংসাত্মক জায়নিস্ট পরিকল্পনার মুখেযা ফিলিস্তিনিদের অধিকার স্বীকার করে না, এমনকি তাদের অস্তিত্বই অস্বীকার করেফিলিস্তিনি প্রতিরোধ এখনো টিকে আছে। এটি জীবনের ইচ্ছার প্রকাশ, জুলুম ও ঔদ্ধত্যকে প্রত্যাখ্যান, এবং ইহুদিকরণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে অব্যাহত প্রতিরোধ।

সুতরাং জায়নিবাদকে কেবল একটি ভৌত শক্তি হিসেবে দেখা যায় না। এটি আসলে এক প্রতীকী, রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত ব্যবস্থাযা ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ ও কাহিনিগুলোকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করে।

এক্ষেত্রে গাজা পরিণত হয় দৃঢ়তার ও নৈতিক স্থিতির প্রতীকেযা ইতিহাস অস্বীকার, স্মৃতি ধ্বংস, কাহিনি বিকৃতি, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ধ্বংস এবং তাদের ভৌত ও আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টার বিপরীতে দাঁড়ায়।

যদিও গাজা একটি অবরুদ্ধ ভৌগোলিক অঞ্চল, তবুও এটি দখল, অনাহার ও গণহত্যার বিরুদ্ধে মানবতার বৈশ্বিক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

অতএব উল্লেখ করা জরুরি, জায়নিবাদ শুধু জমি দখলেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভাষা ছিনতাই, ধারণা বিকৃতি ও আত্মাকে শূন্য করে দেওয়ার মাধ্যমে এক মানসিক-আখ্যানগত যুদ্ধ চালায়। এর লক্ষ্য হলো, একদিকে ফিলিস্তিনি ও আরবদের চেতনা পাল্টে দেওয়া, আর অন্যদিকে প্রতীকী ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে বিশ্বকে জায়নিস্ট করে তোলা।

এখানে গাজা ব্যথা নিয়ে হলেও দৃঢ়ভাবে বলে ওঠে: স্থিতি কেবল ভৌত কাজ নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক-সভ্যতাগত কর্ম। ফিলিস্তিনি মানুষ কোনো আত্মসমর্পণকারী ভুক্তভোগী নয়, বরং এক প্রতিরোধকারী মানুষযিনি গণহত্যা ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেন।

তবে এই আহ্বান শুধু আরব ও মুসলমানদের উদ্দেশেই নয়। এটি পাশ্চাত্যের বিবেককেও চ্যালেঞ্জ করেযেখানে আধুনিক মানবতাকে নৈতিক পতন থেকে বাঁচাতে এবং ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার মূল্যে ফিরে যেতে হলে জায়নিবাদ থেকে মুক্ত হওয়া অপরিহার্য।

উপসংহার

আজ ফিলিস্তিন সমগ্র উম্মাহর নৈতিক ও মুক্তির দিক-নির্দেশনা পুনর্গঠন করছে। এটি প্রমাণ করছে যে ফিলিস্তিন প্রশ্ন হলোঅস্তিত্ব, মর্যাদা, পরিচয় ও বিশ্বাসের লড়াই।

অতএব, দখলদার কেবল সামরিক জয়ের চেষ্টা করছে না, বরং দখলকৃত জনগণের চেতনাকে পরিবর্তন করতে চাইছেযাতে দখলের বর্বরতায় ভয় জন্মায় এবং প্রতিরোধের জন্য অনুশোচনা তৈরি হয়।

এখানেই জায়নিস্ট কৌশলগত পরিকল্পনার প্রকৃত সত্তা প্রকাশ পায়: ফিলিস্তিনি জনগণকে সামরিকভাবে নয়, মানসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভেঙে ফেলাযাতে সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক ভীতি সৃষ্টি হয় এবং অঞ্চলের উপর আধিপত্য আরও গভীর হয়।

অতএব মনে হয়, “বৃহৎ ইসরাইলপ্রকল্প কেবল একটি ভূখণ্ড সম্প্রসারণের মানচিত্র নয়; বরং এটি এক তোরাহভিত্তিক স্বপ্ন ও ঐশ্বরিক কাহিনি, যার মাধ্যমে জায়নিবাদ আধ্যাত্মিকভাবে পুনর্জীবন লাভ করছে এবং চিন্তাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে নবজাগরণ পাচ্ছে। এই প্রকল্প তার অনুসারীদের উস্কে দিতে একটি গণহত্যামূলক এজেন্ডার অংশযার লক্ষ্য হলো অঞ্চলটিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া, ফিলিস্তিনি ও প্রতিরোধশক্তিকে ধ্বংস করা এবং ইসলামি উম্মাহর বিরুদ্ধে তা সম্প্রসারণ করা।

এই প্রকল্পের মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন সর্বাত্মক কৌশলগত সচেতনতা এবং যুদ্ধের সকল উপায়ের সদ্ব্যবহারকারণ এই লড়াই মূলত এক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সভ্যতাগত লড়াই

ইসলামি উম্মাহর জন্য প্রকৃত ভাগ্য নির্ধারণকারী লড়াই হলোএই শাসকের শক্তিকে ভাঙা নয়, বরং এই শাসকের গল্প-নির্মাণকে ভাঙা।

4301610#

captcha