IQNA

যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও গাজায় কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রের কার্যক্রম অব্যাহত

13:15 - July 12, 2026
সংবাদ: 3479454
যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও গাজায় কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রের কার্যক্রম অব্যাহত
গাজা: যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের মধ্যেও উত্তর গাজার আন-নূর কুরআন শিক্ষা কেন্দ্র তাদের শিক্ষা ও দাওয়াহমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কুরআনের কপি, পানীয় পানি, পাখা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা না গেলে ভবিষ্যতে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

ইকনার বরাতে আল-জাজিরা জানায়, কেন্দ্রটিতে বর্তমানে কুরআন হিফজ, ধর্মীয় বক্তৃতা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষামূলক কর্মসূচি, গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প, প্রবীণদের জন্য তিলাওয়াতের আসর এবং শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কুরআন পাঠ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়া কেন্দ্রটি “কুরআনি কুঁড়ি” নামে একটি বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনা করছে, যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রীদের জন্য আখলাক, আদব, ফিকহ ও ইসলামী শিক্ষার সমন্বিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়করা জানান, যুদ্ধ একটি নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। তাই সব বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুরআনের শিক্ষা ও ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রটিতে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সী ছেলে শিশু এবং ৫ থেকে ৯০ বছর বয়সী নারী শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করছে।

সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত পাঠদান

কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন সকাল ৮টায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র বা ত্রাণশিবির থেকে মসজিদে এসে পাঠ কার্যক্রমে অংশ নেয়। বিকেল ২টা পর্যন্ত চলা এ কর্মসূচিতে কুরআনের আহকাম, তাজবিদ ও হিফজের ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়।

দীর্ঘ সময়ের এই পাঠ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে শিক্ষার্থীদের জন্য হালকা নাশতা ও বিভিন্ন উৎসাহমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেন।

কুরআনের কপির সংকটে মৌখিক শিক্ষা

কুরআনের কপির তীব্র সংকটের কারণে কেন্দ্রটি বর্তমানে মৌখিক পদ্ধতিতে শিক্ষা দিচ্ছে। শিক্ষকরা মুখস্থ তিলাওয়াত করে শিক্ষার্থীদের শেখান। প্রথমে ৩০তম পারা থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে অন্যান্য অংশ পড়ানো হচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ জানায়, মসজিদে থাকা অধিকাংশ কুরআনের কপি ছিঁড়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি কিছু কপি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাদের ভাষায়, “যুদ্ধের মধ্যেও নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে কুরআনের শিক্ষা ও ইসলামী পরিচয় অটুট রাখা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”

জরুরি সহায়তার আবেদন

কেন্দ্রের পরিচালকরা দাতাদের কাছে মসজিদের জন্য পাখা, পানীয় পানি, কুরআনের কপি, ছাত্রীদের জন্য হিজাব এবং উপযুক্ত পোশাক সরবরাহের আবেদন জানিয়েছেন। কারণ প্লাস্টিকের শিট দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী মসজিদে প্রচণ্ড গরমে পাঠদান করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

একজন শিক্ষক বলেন, “মসজিদে পৌঁছানোই এখন একটি কঠিন কাজ। আমাদের কেন্দ্রটি খুব সীমিত সম্পদ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এখনো এটি একটি অস্থায়ী কাঠামো, যেখানে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও নেই।”

তিনি জানান, ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি প্রবীণ নারীরাও এখানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এছাড়া শিশুদের জন্য নামাজের পোশাক ও জায়নামাজেরও প্রয়োজন রয়েছে।

বোমাবর্ষণের মধ্যেও থেমে নেই শিক্ষা

শিক্ষকদের মতে, বোমাবর্ষণের ভয় নিয়েই শিশু ও তাদের পরিবারগুলো প্রতিদিন মসজিদে আসে। তবুও কুরআন হিফজের ক্লাস বন্ধ হয়নি।

তারা বলেন, মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও শিক্ষকরা নিজেদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

একজন শিক্ষক বলেন, “প্রতিদিনের বোমাবর্ষণ জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। তবুও কুরআন শিক্ষার গুরুত্বে বিশ্বাস রেখে আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি এবং আশা করি আরও ব্যাপক সহযোগিতা পেলে এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

শিক্ষার্থীদের আকুতি

কেন্দ্রের এক শিক্ষার্থী জানায়, কুরআন হিফজ, হাদিস শিক্ষা, তাজবিদ ও সুর শেখার জন্য মসজিদে আসাটাই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

তবে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কারণে মসজিদে পৌঁছানো এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ আরও বেশি।

তিনি বলেন, “সব কষ্টের পরও যখন আমরা হিফজের আসরে পৌঁছাতে পারি, তখন শান্তি ও আনন্দ অনুভব করি।”

বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের প্রতি নৈতিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হোক। তাদের মতে, সামান্য সহযোগিতাও যুদ্ধাহত শিশুদের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারে।

তিনি যুদ্ধের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা চাই গাজার মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক।” 4363551#

captcha